অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভিত্তিই হলো নিরাপত্তা। তাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষ প্রশাসন, প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতা- সবকিছুর সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন।...

কয়েকদিন থেকে দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু খবর সামনে আসছে। এমনকি একটি পত্রিকার খবরে দেখলাম, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে পদে পদে বাধা পাচ্ছে পুলিশ। এমনকি পুলিশ অভিযানে গিয়ে হামলার শিকারও হচ্ছে। গত চার মাসে এ ধরনের হামলার ঘটনায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ পেয়েছে। এমন একটি খবর রীতিমতো সবারই আতঙ্কিত হওয়ার মতো। যেখানে একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেরা হামলার শিকার হচ্ছে, সেখানে এজকজন সাধারণ মানুষ কীভাবে তার জীবনকে নিরাপদ মনে করবে।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্রকে পরিমাপ করতে হলে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়। যখন একটি দেশে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদককারবার, সাইবার অপরাধ কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটে, তখন মানুষের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আর সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন আক্রমণের শিকার হয় তখন দেশের অপরাধের মাত্রা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ না করে উপায় থাকে না। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ বাহিনীর বিকল্প নেই। তবে পুলিশ যদি জনগণের সঙ্গে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, তাহলে পুলিশের দায়িত্ব পালনের পথ অনেকটা সহজ এবং সুগম হয়ে যায়।’ এমনকি তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, অপরাধ দমন এবং জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গে পুলিশের উন্নয়ন নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এ কারণে পুলিশের উন্নয়নে বিনিয়োগকে সরকার জননিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।’ কিন্তু পুলিশের যদি নিরাপত্তা না থাকে, পুলিশ যদি তার দায়িত্ব পালনে নিরাপদ বোধ না করে, পুলিশ যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এর ফলাফল তাৎক্ষণিত এবং ভবিষ্যতে কী হবে বা হতে পারে সেই আশঙ্কায় থাকে তাহলে দায়িত্ব পালন কোনোভাবেই যথাযথ হবে না।
গত ৯ মে ভোরে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা রাউৎকোনা এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এমন নৃশংস ঘটনা কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতিরই প্রতিচ্ছবি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এ অবনতি শুধু সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকেই ব্যাহত করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ, এই তিন মাসেই সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি। মার্চ মাসেই খুনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৭; ঢাকায় ২৪ জন এবং চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৬১ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে গণপিটুনি বা তথাকথিত মব জাস্টিস। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ৪৯টি ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন, মার্চে ছিল ১৯ জন; আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯, যা মার্চে ছিল ৩১। এই প্রবণতা দেখায়, মানুষ ধীরে ধীরে আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেলে কিংবা অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে গেলে সমাজে স্বেচ্ছাবিচারের প্রবণতা বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলাকে আরও ভেঙে দেয়।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেলে পেশাদার অপরাধী গোষ্ঠী দ্রুতই শক্তিশালী হয়ে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অপরাধ ও অসৎ রাজনৈতিক স্বার্থের এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতা অনেক সময় দেখা যায়, যা অপরাধ দমনকে আরও কঠিন করে তোলে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পেশাদার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় অপরাধী চক্রের যোগসাজশ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, চাঁদাবাজির অর্থনীতি ও সংগঠিত অপরাধচক্র ভাঙতে না পারলে সহিংসতার এই ধারা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারবে, নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে এবং রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রথম শর্ত হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। যদি রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা প্রভাবের কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও সম্প্রতি ‘দলীয় আনুগত্য নয়, আইন অনুযায়ী পুলিশ চলবে’- এমন বক্তব্য এসেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। বাস্তবে এই নীতির কার্যকর প্রয়োগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যে অপরাধ বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা হয়। চীনের অনেক শহরে স্মার্ট ক্যামেরা ও ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি অপরাধ শনাক্তে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে ডিজিটাল নজরদারি, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক এবং সাইবার মনিটরিং বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতে নতুন থানা ও ফাঁড়ি স্থাপন এবং নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগও ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে প্রযুক্তি শুধু স্থাপন করলেই হবে না; সেগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ মানবসম্পদও প্রয়োজন।
কমিউনিটি পুলিশিংও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর পদ্ধতি। যখন জনগণ ও পুলিশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন মানুষ সহজেই তথ্য দেয় এবং অপরাধ প্রতিরোধ সহজ হয়। সম্প্রতি সরকারও জনগণের সঙ্গে পুলিশের ‘মানবিক সম্পর্ক’ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বাস্তবে জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না।
একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার গতি বাড়ানোও জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মধ্যে সাহস তৈরি করে। অনেক উন্নত দেশে দ্রুত তদন্ত ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার কারণে অপরাধীরা দ্রুত শাস্তির মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশে মামলার জট কমানো, বৈজ্ঞানিক তদন্ত বাড়ানো এবং ফরেনসিক সক্ষমতা উন্নয়ন সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভিত্তিই হলো নিরাপত্তা। তাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষ প্রশাসন, প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতা- সবকিছুর সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। অন্যথায় উন্নয়নের বড় বড় অর্জনও মানুষের জীবনে প্রকৃত শান্তি এনে দিতে পারবে না।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
