ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ভয়ভীতি দেখিয়ে নারী-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ: ভারতের মানবাধিকার সংগঠন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পুশইন করছে: জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি হবিগঞ্জে বজ্রপাতে ৩ জনের মৃত্যু, আহত ৩ নিয়মের তোয়াক্কা নেই, সড়কে বেপরোয়া ডিএসসিসির ডাম্পট্রাক চার দিনের সফরে বেইজিং গেছেন তথ্যমন্ত্রী কক্সবাজারে মানবপাচার চক্রের মূলহোতা ছৈয়দুল হক আটক ডিক্যাব ও বাংলাদেশ চীন আপন মিডিয়া ক্লাবের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই শরীয়তপুরে মব করে প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলা এনসিটিবিসহ চার শিক্ষা বোর্ডে নতুন নেতৃত্ব স্বপ্নে গান শোনা আসলে কীসের ইঙ্গিত? ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে ছিনতাই, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জেট ফুয়েলের দাম লিটারে কমল ১৫ টাকা চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চালক-এনসিপি কর্মীদের মারামারি গ্রীন চট্টগ্রাম গড়তে লাগানো হচ্ছে ১০ লাখ গাছ চসিকের সড়ক ও ফুটপাত থেকে দেড় শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ মনপুরায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখা নিয়ে উত্তেজনা জ্বালানির মজুদ সম্প্রসারণ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণসহ ১২ দফা সুপারিশ সংসদীয় কমিটির ঢামেক ও চমেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি, ৬ দফা দাবি ভোলায় মিতু হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক, ওসিকে তলব বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল কুমিল্লায়  ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে ৪৫ জন আটক; ৫ বাস-মাইক্রো জব্দ গোয়েন্দারা কেন প্রকাশ্যে আসছেন? শিশুদের নাটক ‘ডাকাত হালুম চিৎপটাং’ মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে দুরবস্থা জন্মদিনে এল লাকী আখান্দের অপ্রকাশিত গান নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ কিয়ামতের ময়দানে রাসুল (সা.)-এর পাশে থাকার উপায় সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: টিআইবি
Nagad desktop

পরের ক্ষতি চাইলে নিজের ক্ষতি নিশ্চিত

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০২ পিএম
পরের ক্ষতি চাইলে নিজের ক্ষতি নিশ্চিত
রিয়াজুল হক

মানুষের চরিত্রের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, সে প্রায়ই ভাবে, তার বুদ্ধি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। অন্যকে ফাঁদে ফেলতে, হেয় করতে, পিছন থেকে আঘাত করার জন্য, সে নিজের বুদ্ধির প্রদর্শনী ঘটাতে চায়। আজকের সমাজে এই প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। কেউ কারও অগ্রগতি দেখতে পারে না। অন্যের ব্যর্থতায় যে আনন্দ, তা যেন নিজের সফলতার চেয়েও মধুর। 

আপনি যখন কাউকে হেয় করেন, তার সুযোগ কেড়ে নেন, বা তাকে সমস্যায় ফেলতে চেষ্টায় থাকেন,  তখন আসলে আপনি নিজের ভেতরকার অন্ধকারকেই বাড়াচ্ছেন। এই অন্ধকার একসময় আপনার চিন্তা, মনোভাব আর কর্মে ঢুকে যায়। আপনি ক্রমে হীনমন্য, সন্দেহপ্রবণ ও আত্মধ্বংসী হয়ে ওঠেন। যেমন একজন কর্মচারী ভাবলো, সহকর্মীর সুনাম নষ্ট করে নিজে এগিয়ে যাবে। সে নিন্দা করল, গুজব ছড়াল। প্রথমে মনে হলো সফল হয়েছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে অফিসে কিংবা অফিসের বাইরে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। কারণ, সবাই বোঝে, যে অন্যের ক্ষতি করতে পারে, সে কারও শুভাকাঙ্ক্ষী নয়। 

জীবনের এক অদ্ভুত নিয়ম হলো, যা আমরা ছুঁড়ে দিই, তা ঘুরে আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসে। আপনি যদি কারও ভালো চান, কোনো না কোনোভাবে সেই শুভকামনা আপনার কাছেই ফিরে আসে। আর আপনি যদি কৌশলে কারও ক্ষতি করেন, সেই নেতিবাচক শক্তি একসময় আপনাকেই আঘাত করে। এ কারণেই প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘যে অন্যকে কষ্ট দেয়, সে নিজের শান্তি নষ্ট করে।’ কর্মফল হয়তো সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না, কিন্তু তা অবধারিত।


আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যেখানে প্রতিযোগিতা মানে অন্যকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া। স্কুল থেকে শুরু করে চাকরি- সবাই ‘আমি কীভাবে অন্যকে হারাব’ ভাবতে শিখছে। অথচ মানবসভ্যতার অগ্রগতি এসেছে সহযোগিতার মাধ্যমে, প্রতারণার মাধ্যমে নয়।অন্যকে নিচে নামাতে গিয়ে আমরা যে মানসিক দূষণ ছড়াচ্ছি, তা সমাজকেই দুর্বল করছে।

ইতিহাসে দেখুন। যারা অন্যকে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছে, শেষ পর্যন্ত তারাই ফেঁসে গেছে। মীর জাফর ভেবেছিল, ষড়যন্ত্র করে লাভ হবে। কিন্তু লাভ হয়নি বরং সে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। সে এতটাই ঘৃণিত যে, এখন কারো নাম মীরজাফর দেখাও যায় না।

একজন কর্মকর্তা ভাবতে পারেন, ‘আমি আজ ক্ষমতাবান, তাই যে কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে সাধ্যমতো অপদস্থ করতে পারি, খারাপ পদায়ন করতে পারি।’ কিন্তু সময় বদলালে, যখন সেই ক্ষমতা থাকে না, তখন তার চারপাশের লোকই তাকে একা করে চলে যায়। আর 'সময়' এমন এক অবিচল বিচারক, সব কিছুর হিসাব রাখে।

অন্যকে নিচে নামানো নয়, বরং তাকে উঠতে সাহায্য করা, এটাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। কারণ অন্যের সফলতা আপনার ক্ষতি নয়, বরং আপনার সমাজ, আপনার পরিসরকে আরও শক্তিশালী করে। যদি আপনি কারও জন্য সুযোগ তৈরি করেন, একদিন কেউ না কেউ আপনার জন্যও পথ তৈরি করবে। মানুষের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা যেন বীজের মতো, আপনি যা বপন করেন, ঠিক তাই-ই ফসল হিসেবে ফিরে আসে।

আপনি যতই চাতুর্য দেখান না কেন, অন্যকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে আপনি নিজের ভবিষ্যৎকেই ফাঁদে ফেলছেন। মানুষের প্রকৃতি ও সময়ের নিয়ম এমন যে, অন্যের অন্ধকারের পথ খুঁড়ে আপনি নিজের আলোর পথ বন্ধ করছেন।

সুতরাং দয়া করে থামুন। অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়ার আগে একবার ভাবুন, অন্যদের জন্য যত্ন করে আপনি যে গর্ত খুঁড়ছেন, সেখানে সামনের দিনে আপনারই অবস্থান হবে। 

লেখকঃ যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

অবৈধ অভিবাসন কিছু মানুষের কারণে কেন অপমানিত হবে ১৮ কোটি বাংলাদেশি?

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
কিছু মানুষের কারণে কেন অপমানিত হবে ১৮ কোটি বাংলাদেশি?
কাজী আসমা আজমেরী

আমি বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বের ১৬১টি দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য অর্জন করেছি। ২০১০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম বার ভিয়েতনাম গিয়েছিলাম। তখন রিটার্ন টিকিট ও হোটেল বুকিং না থাকায় আমাকে ভিয়েতনামের ইমিগ্রেশন হেফাজতে থাকতে হয়েছিল।

পরবর্তীতে একই বছরের ১ মে সাইপ্রাসে যাই। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য তখন দেশটিতে ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ ছিল। দূতাবাস থেকে আমাকে জানানো হয়েছিল, রিটার্ন টিকিট ও হোটেল বুকিং থাকলে আমি সেখানে যেতে পারব। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই ভ্রমণে যাই। কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ায় কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ছিল, আমি হয়তো ইউরোপের অন্য কোনো দেশে অবৈধভাবে থেকে যাব। সেই সন্দেহে আমাকে প্রায় ২৭ ঘণ্টা ইমিগ্রেশন হেফাজতে রাখা হয়।

সেই অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছিল। তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই বিশ্ব ভ্রমণ করব এবং প্রমাণ করব যে বাংলাদেশের নাগরিকরাও সম্মানজনকভাবে পৃথিবী ঘুরে দেখতে পারেন। গত ১৬ বছরে আমি ১৬১টি দেশ ভ্রমণ করেছি। কিন্তু ব্যক্তিগত এই অর্জনেও একটি বাস্তবতা বদলায়নি- এখনো অনেক বাংলাদেশি পর্যটক ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফেরেন না, কেউ সমুদ্রপথে ঝুঁকি নিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন, আবার কেউ অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেন। এমনকি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশ কম্বোডিয়াতেও বাংলাদেশিদের অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা রয়েছে।

দীর্ঘ ভ্রমণজীবনে অসংখ্য দেশের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, সাধারণ মানুষ ও ভ্রমণপ্রেমীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। একটি বিষয় আমাকে বারবার ব্যথিত করেছে- বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহের চোখে তাকানো হয়। এর জন্য দায়ী বাংলাদেশের কোটি কোটি সৎ নাগরিক নন; দায়ী অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করা কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড।

সমুদ্রপথে, দালালের মাধ্যমে কিংবা ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে গিয়ে আর দেশে না ফেরার প্রবণতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একটি দেশের পাসপোর্টের মর্যাদা শুধু সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না; এটি সেই দেশের নাগরিকদের আচরণ ও দায়িত্ববোধের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ভ্রমণের সময় মালাউইতে আমার একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। প্রথমে আমার অনলাইন ভিসা আবেদন বাতিল করা হয়। পরে সরাসরি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভিসা পাই। সেখানে ইমিগ্রেশন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় জানতে পারি, বহু বাংলাদেশি দেশটিকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে অন্য দেশে অবৈধভাবে চলে গেছেন। ফলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই তারা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতা ইতালি, কেনিয়া এবং আরও কয়েকটি আফ্রিকান দেশেও হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে দেখেছি।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর প্রভাব পড়ছে সেই লাখো বাংলাদেশির ওপর, যারা বৈধভাবে পৃথিবী দেখতে চান, পর্যটন করতে চান, শিক্ষা বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণ করতে চান। কয়েক হাজার মানুষের অবৈধ কর্মকাণ্ডের দায় পুরো জাতিকে বহন করতে হচ্ছে।

অবৈধ অভিবাসন কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জাতীয় সমস্যা। দালালচক্র শুধু মানুষের জীবনকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয় না, তারা দেশের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করে।

আমাদের প্রয়োজন আরও কঠোর আইন প্রয়োগ, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান এবং সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যাতে তরুণরা বুঝতে পারে যে শর্টকাটে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অপমান, প্রতারণা এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আজ বাংলাদেশে লাখো তরুণ-তরুণী আছেন, যারা বিশ্বকে জানতে চান, বৈধভাবে ভ্রমণ করতে চান এবং বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরতে চান। তাদের স্বপ্নকে সম্মান জানাতে হলে অবৈধ অভিবাসনের সংস্কৃতি বন্ধ করতেই হবে।

কারণ, একটি পাসপোর্ট শুধু ভ্রমণের দলিল নয়; এটি একটি জাতির পরিচয়, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রতীক।

লেখক: আন্তর্জাতিক পর্যটক (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ১৬১টি দেশ ভ্রমণ করেছেন)।

বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস আজ

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস আজ
ছবি: সংগৃহীত

৩ জুন ‘বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস’ বা বিশ্ব মুগুর পা দিবস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের রূপকার, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন ড. ইগনাচিও পনসেটি-এর জন্মদিনকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ড. পনসেটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন, যা কোনো ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই মুগুর পা বা ক্লাবফুট সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলতে সক্ষম। বর্তমানে সারা বিশ্বে এই পদ্ধতিটি ‘পনসেটি মেথড’ বা পনসেটি পদ্ধতি নামে সমাদৃত।

এ দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো— ক্লাবফুট সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ভ্রান্ত ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিটি আক্রান্ত শিশুর জন্য সঠিক ও সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

২০২৬ সালের বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসের বৈশ্বিক চেতনার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদেরও মূল লক্ষ্য হলো— কোনো শিশু যেন চিকিৎসার অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ না করে এবং কোনো মাকে যেন এই জন্মগত ত্রুটির কারণে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা।

দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে, বিশেষ করে ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে সমাজের অনেক গভীর ও করুণ বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। জন্মগত মুগুর পা বা ক্লাবফুট নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম দেশে বহুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারকে বাস্তব জীবনে যে ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা আজও অত্যন্ত করুণ এবং হতাশার।

আমি আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি— ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুটির পরিবারের আর্থিক অবস্থা যদি বেশ সচ্ছল ও বিত্তশালী হয়, তবে এই শারীরিক ত্রুটিটি তাদের জীবনে তেমন কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। কারণ, তারা দ্রুত উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুটিকে সুস্থ করে তোলেন। কিন্তু এর বিপরীতে, পরিবারটি যদি আর্থিকভাবে অনটন আর অভাবের দুষ্টচক্র দ্বারা আবর্তিত থাকে, তবে তাদের কষ্ট আর বঞ্চনার কোনো সীমা থাকে না। দারিদ্র্যের কশাঘাতের সঙ্গে যখন সামাজিক কুসংস্কার যুক্ত হয়, তখন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।

সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের এবং ব্যথিত হওয়ার বিষয় হলো— আমাদের সমাজে শুধুমাত্র ক্লাবফুট আক্রান্ত বাচ্চা প্রসব করার অপরাধে (!) দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ নেমে আসে। একটি জন্মগত ত্রুটির জন্য সম্পূর্ণভাবে মাকে দোষারোপ করা হয় এবং তাকে কলঙ্কিত করা হয়।

আমরা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের কথা বলছি; আমরা মনে করি এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, ইন্টারনেটের যুগ। মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনেক প্রশ্নের সমাধান এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক ক্লিকেই জুটে যায়। অথচ, এত কিছুর পরও আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ অনেক কুসংস্কার আর বদ্ধমূল ধারণার দাস হয়ে আছে। এই তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগেও আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বুকের ভেতরের চাপা কান্নাগুলো যেন অনেকাংশেই অব্যক্ত থেকে যায়। পেশাগত কারণে যখন আমি তাদের মনের কষ্টের কথাগুলো জানতে চাই, তখন অনেকেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তারা জানান, সমাজের মানুষ, এমনকি তাদের নিজ পরিবারের সদস্যরাও আজও মনে করেন— এটি মায়ের কোনো পাপ বা বাবার কোনো খারাপ কাজের ফল!

মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় আমরা যখন ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বিভিন্ন চিকিৎসাতথ্য ও ইতিহাস সংগ্রহ করি, তখন এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে।

দেখা যায়, একজন মা তার গর্ভকালীন সময়ে অত্যন্ত নিয়ম মেনে চলেছেন। তিনি গর্ভকালীন পরিচর্যার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছেন, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেয়েছেন এবং তার গর্ভাবস্থায় কোনো ধরনের বড় জটিলতাও ছিল না। তারপরও তার গর্ভের সন্তানটি ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। আবার এমন ঘটনাও দেখেছি যে, একজন মায়ের তিনটি সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানটি ক্লাবফুট আক্রান্ত হয়ে জন্মেছে, দ্বিতীয় সন্তানটি সম্পূর্ণ সুস্থভাবে জন্মেছে, কিন্তু তৃতীয়বার যখন তিনি আবার সন্তান প্রসব করেছেন, তখন সেই সন্তানটিও আবার ক্লাবফুটে আক্রান্ত হয়েছে।

এ ঘটনাগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানাটা আমাদের সবার জন্যই জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ বলছে, মুগুর পা বা ক্লাবফুট মূলত একটি জন্মগত কাঠামোগত ত্রুটি (কনজেনিটাল ডিফরমিটি)। বিশ্বব্যাপী প্রতি এক হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে গড়ে এক থেকে দুজন শিশু এই ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর কয়েক হাজার শিশু এই সমস্যা নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখে। এর সুনির্দিষ্ট কোনো একক কারণ আজও বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ইডিওপ্যাথিক’।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত এবং গর্ভকালীন পরিবেশগত কিছু অজানা কারণের সংমিশ্রণে এ সমস্যাটি তৈরি হয়। পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে এটি হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। তাই প্রথম ও তৃতীয় সন্তানের ক্লাবফুট হওয়া এবং মাঝের সন্তানের সুস্থ থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ জিনগত বিন্যাসের একটি স্বাভাবিক গাণিতিক সম্ভাবনা মাত্র। এর সঙ্গে মায়ের খাদ্যাভ্যাস, তার কোনো কাজ বা কল্পিত কোনো ‘পাপ’-এর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু আমাদের সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা এই অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণাগুলোর সঙ্গে যখন পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপড়েন যুক্ত হয়, তখন ওই মা ও শিশুর দুর্দশার যেন কোনো শেষ থাকে না। এ অন্ধকার দূর করার লক্ষ্যেই আমরা ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে আধুনিক চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। 

শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করছি। সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে বদ্ধমূল ধারণা ও কুসংস্কারগুলো রয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে আমরা তথ্যভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ প্রদান করছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষের ভেতরের এই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিয়ে একটি সহানুভূতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।

তবে আজও আমাদের খুব আক্ষেপের সঙ্গে লক্ষ করতে হয় যে, ক্লাবফুটকে এখনও গ্রামাঞ্চলে একটি ‘অভিশাপ’ হিসেবেই দেখা হয়। আমরা নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি, একটি মাকে অকারণে কলঙ্কিত করার এই যে নিষ্ঠুর সামাজিক রীতি— তা যেন চিরতরে বদলে যায়। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই যে— ক্লাবফুট কোনো অভিশাপ নয়, এটি কেবলই একটি নিরাময়যোগ্য জন্মগত ত্রুটি।

এই ত্রুটি নিরাময়ে বর্তমানে ‘পনসেটি পদ্ধতি’ ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এটি একটি অত্যন্ত সহজ, নিরাপদ এবং শতভাগ কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে কোনো বড় সার্জারির প্রয়োজন হয় না; বরং ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি প্লাস্টার (কাস্টিং) এবং পরবর্তীতে একটি বিশেষ জুতো বা ব্রেস ব্যবহারের মাধ্যমে বাঁকা পা সম্পূর্ণ সোজা ও স্বাভাবিক করে তোলা যায়। তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি যেটি প্রয়োজন, সেটি হলো— সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা। জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব (সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে) শিশুকে নিকটস্থ ক্লাবফুট ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে ফলাফল সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়।

আর এ দ্রুত চিকিৎসার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা। সেই সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে যারা কাজ করছেন, সেসব স্বাস্থ্যকর্মীদের (যেমন: পরিবার কল্যাণ সহকারী, স্বাস্থ্য সহকারী ও কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোভাইডার) একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি। তারা যেহেতু সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের সঙ্গে কাজ করেন, তাই জন্মের পরপরই যদি তারা কোনো শিশুর পায়ের পাতায় সন্দেহজনক বাঁকাভাব বা ক্লাবফুটের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন, তবে যেন কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাকে সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করেন।

একটি সুস্থ, সুন্দর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আসুন, ৩ জুন বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসে আমরা এই শপথ নিই— বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের প্রসার ঘটিয়ে আমরা সমাজের সব কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে দেব। কোনো মা যেন আর অকারণে চোখের জল না ফেলেন এবং প্রতিটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু যেন সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনের অধিকারী হতে পারে, তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখক: সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক। ই-মেইল: [email protected]

শিশু পালনে জ্ঞানের পাশাপাশি কৌশলও দরকার

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
শিশু পালনে জ্ঞানের পাশাপাশি কৌশলও দরকার
ছবি: সংগৃহীত

নতুন শিশু একটি পরিবারে নিয়ে আসে আনন্দের স্রোত। ছোটমণিকে ঘিরে উৎসবের কমতি থাকে না। শিশু জন্মের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উচ্ছ্বাস ভাগাভাগি করতে দেখেও আমরা আনন্দ পাই। ঘুমিয়ে থাকা শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা-মা হয়তো স্বপ্ন দেখেন রঙিন ভবিষ্যতের।

যদিও স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অনেক বন্ধুর। আর সময়সাপেক্ষও বটে। কারণ একজন শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হতে প্রয়োজন দীর্ঘ সময় ও প্রস্তুতির। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই আসে শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা, তার লালন পালনের কথা। লালন-পালনও যে চাট্টিখানি  কথা নয় এ কথা আমরা সকলেই কমবেশি জানি। এই যেমন খাওয়ানোর ব্যপারেই ধরুন। ছোটবেলায় দুপুরে একটি একটি করে ছোট মাছ পাতে তুলে দিয়ে খেতে শেখানোর জন্য বাবা-মায়ের সে কি থাকে  নিদারুণ চেষ্টা, সে কথা কে না জানে। তবু দুই বছর বয়স পর্যন্ত একজন শিশুর সঠিক যত্ন কিভাবে নিতে হয় সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের  কাছ থেকে  জেনে নেয়াটা সবার জন্যই  দরকারি।

শিশুর ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিভাবে মেটাবেন:
শিশু জন্মের ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের  বুকের দুধই যথেষ্ট। ক্ষুধা মিটছে না ভেবে বাজারে পাওয়া কৌটার দুধ (ফর্মুলা মিল্ক) কিংবা গরুর দুধ  দেওয়ার মতো ভুল একদম করা যাবে না। এগুলো  শিশুর জন্য 
ক্ষতিকর। 

ঢাকা মেডিকেল  কলেজ ও হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. তাহসিনুল আমিন  জানালেন, ২৪ ঘন্টায় ৮-১০ বার দুধ পান করালে অন্তত ছয়বার শিশু  প্রস্রাব করলে, নিয়মিত ওজন বৃদ্ধি পেলে বুঝবেন শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ইফফাত আরা শামসাদ জানালেন, শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হলে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার দিন। একটু একটু  খাবারের পরিমাণ বাড়ান। শিশুকে সবার সাথে ঘরে তৈরি করা শক্ত(সেমি সলিড) খাবার দিতে পারেন। ভাত, মাছ, ডাল,শাকসবজি সব মাখিয়ে মজা করে খাইয়ে দিন ওকে। মুঠো ফোন বা টেলিভিশন দেখিয়ে নয়। শিশুকে খাওয়াতে  জোরাজুরি  করবেন না। সব কিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিয়ে ওকে বসিয়ে খাওয়ান। চাইলে আলাদা খাবার রান্না করতে পারেন, তবে অতিরিক্ত পাতলা করে নয়। প্রতিদিন ডিম ও ফল খেতে দিন। ডিম অবশ্যই তেলে ভালভাবে ভেজে নিন(রান্না করলে যেন পর্যাপ্ত সময় রান্না করা হয়)। না হলে জীবানু সংক্রমণ হতে পারে। দুই বেলা ভাত বা খিচুড়ি এবং সকালের নাস্তার পাশাপাশি আরো দুই বেলা পুষ্টিকর নাাস্তা দেওয়া ভাল(মোট পাঁচবার খাবার)। ছয় মাস বয়সের পর শিশুকে গ্লাসে করে পানি খেতে দিন, কোন মামপট বা ফিডারে নয়। কোমল পানীয়, চিপস, চানাচুরের অভ্যাস করাবেন না।

ভাবতে হবে  পোশাক নিয়ে।  বজায়  রাখতে হবে পরিচ্ছন্নতা। শীতকালে শিশুকে পরিচ্ছন্ন শীত পোশাকতো দেবেনই, অবশ্যই মাথা ঢেকে রাখুন। জন্মের অন্তত তিন দিন পার হলে গোসল করান। গোসল একদিন অন্তর করান (শীতের সময়)।  বয়স এক মাস পার হলে প্রতিদিন গোসল করান। কুসুম গরম পানি দিয়ে শিশুকে গোসল করাবেন। আর্দ্রতার জন্য গোসলের আগে তেল মালিশ করলে সমস্যা নেই। আর সর্ষের তেল ঝাঁঝালো, তাই মুখে ও মাথায় তা দেওয়ার দরকার নেই। যে কোন তেল অতিরিক্ত দেওয়া হলে মাথার ত্বকে প্রলেপ পড়তে পারে। শিশুর ত্বকের উপযোগী  কম ক্ষারের সাবান ব্যবহার করতে পারেন প্রতিদিন। সোনামণির চুলের উপযোগী শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। সপ্তাহে দুই দিনই যথেষ্ট শ্যাম্পুর করার জন্যে। গোসলের পর বেবি লোশন দিতে পারেন। তবে বয়স ১৫ দিনের আগে তেল, লোশন কিছুই দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শীতে ছোট শিশুর চুল না ফেলাই ভালো। নবজাতকের প্রথম চুল ফেলতে দেড়-দুই মাস অপেক্ষা করুন।

নিরাপদ ঘুমের  ব্যবস্থা করতে হবে
প্রচলিত নিয়মে  বিছানায় নবজাতকের মাথা রাখতে পাগড়ির মতো গোল করে কিছু তৈরি করা হয়, যার কোন প্রয়োজন নেই। নবজাতকের জন্য  এক ইঞ্চি উচ্চতার নরম ও পাতলা বালিশ ভালো, খেয়াল রাখুন যেন ঘাড়ে ভাঁজ না পড়ে। চাইলে  শিশুর জন্য চারকোণা কাপড় প্যাঁচানো ছাড়া ভাঁজ করে এক ইঞ্চি উচ্চতা করে নিতে পারেন। ছয় মাসের পর বয়স অনুযায়ী বালিশের উচ্চতা বাড়ানো যায়। দুই বছর বয়সে এই উচ্চতা দুই ইঞ্চি করতে পারেন। শিশু মায়ের কাছেই ঘুমাবে। তবে খেয়াল রাখুন, কম্বল, কাঁথা,  বিছানার চাদর, বালিশ এমনকি মায়ের শরীরের কোন না কোন অংশে যেন শিশুর নাক, মুখ চেপে না যায় কিংবা শিশু বিছানা থেেেক পড়ে না যায়।

যত্নবান হতে হবে শিশুর বেড়ে ওঠার বিষয়ে
প্রতিদিন শিশুকে অন্তত ৩০ মিনিট রোদ্দুরে রাখুন। সকাল নয়টার আগে কিংবা বিকেল চারটার পর রোদে রাখা ভাল। সঙ্গে থাকুন মা-ও। দু’জনের শরীরেই  ভিটামিন ডি তৈরি হবে।

তিন মাস পর্যন্ত খুবই সাবধানে কোলে নিন, যেন ঘাড়ের পেছনে শক্তভাবে ধরা থাকে। অর্থাৎ  কোনভাবেই  যেন শিশুর মাথা ঝুলে না পড়ে। হাত ধরে টেনে শিশুকে  কোলে নেওয়া উচিত নয়। কাঁধের  জয়েন্ট বা জোড়া আলগা হয়ে হাত ঝুলে পড়তে পারে।

হাঁটা শেখাতে ওয়াকার দেওয়া নিষেধ। প্রাকৃতিক নিয়মে  শিশু একেক ধাপে একেক কাজ শেখে। নিয়মের বাইরে গেলে উল্টো ফল হতে পারে(হাঁটা শিখতে দেরি হতে পারে)।

অনেক সময় মায়ের অফিসে শিশুকে নিয়ে দুধ পান করিয়ে আনার সুযোগ থাকে, শিশুকে রাখার ব্যবস্থাও থাকে। প্রয়োজনে শিশুকে বাইরে নিতে ক্ষতি নেই।

বুকের সামনে শিশুকে ঝুলিয়ে বহন করলেও ক্ষতি নেই। শুধু  সে যেন পুরোপুরি ‘সাপোর্ট’ পায়, মানে ওর শরীর যেন পুরোপুরিভাবে সমর্থিত থাকে।

সুপর্ণা দাশ গুপ্তা: লেখক

কেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব চাই?

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
আপডেট: ০২ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
কেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব চাই?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

খারাপ বা অন্যায় কাজ মুছে দিতে ভালো কিছু প্রয়োজন। এ জন্য ভালোর দিকে যেতে হবে। যে ভালো সমাজে পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটাবে। নতুনের ছায়াতলে আসবে মানুষ। আলোর পথ ধরে এগিয়ে যাবে সবাই।

দেশে সমাজ, সভ্যতায় যে পচন ধরেছে তা থেকে উত্তোরণের জন্য ভালো কিছু প্রয়োজন। পৃথিবীর যত দেশ সংকটের মুখে পড়েছে তাদের অনেকেই বিকল্প পরিবর্তনে উত্তোরণের উপায় খুজেছে। ভালো কিছুর চিন্তা করেছে, সেই ভালোটা আসলে কী? আমাদের সামাজিক অবক্ষয় এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে পচা শামুকে পা কাটার মতো। প্রথমে পচা শামুকে পা কাটল, তারপর সেফটি। যন্ত্রণায় ডাক্তার দেখানোর পর পায়ের কিছু অংশ কাটা হলো। রোগ সারেনি। এরপর একে একে পুরো পা কাটা হলো। তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এবার মৃত্যুর পথে জীবন!

সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে, এখন পুরো সমাজ সংকটাপন্ন। অবহেলায় পচা শামুখে পা কাটার গল্পের মতো। রাজনীতি নিজের মতো করে চলছে। নিজস্ব স্টাইলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক সংকট সমাধানে কোনো দলের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। গত ২৫ বছরে দেশের কোনো নেতা সামাজিক সংকট সমাধানে বিকল্প কোনো চিন্তার কথা বলেছেন বা ভেবেছেন বলে মনে পড়ে না।

সামাজিক সুরক্ষার জন্য রাজনীতির সংস্কৃতির বাইরে বিকল্প আর কী হতে পারে? সেই ভালো হলো সংস্কৃতির জাগরণ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এই ভাবনা রাষ্ট্রের মগজ থেকেও কেউ ভাবতে চান না! রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে বাস্তবতা আমরা দেখেছি তা হলো– কোন কোন ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অপকর্ম করে পার পাচ্ছে। কিংবা রাজনৈতিক শক্তির সাহস নিয়ে অনেকেই অপরাধ করছেন। রাজনীতিকে অনেকেই অপরাধ থেকে পার পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। বা অপরাধের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্রকে অনেক সময় ম্যানেজ করা যায়।

এই সুযোগে সংস্কৃতির বলয় থেকে আমরা দূরে সরে যাওয়ায় সমাজে অপরাধ দিন দিন ভয়ংকর রূপে মাথাচড়া দিচ্ছে। সংকট মহা-আয়োজনে ঘনীভূত হয়েছে। আমরা একটি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। অপরাধ কিংবা অপরাধীর এই মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের জন্য চলমান সমাজ ব্যবস্থার কী পরিবর্তন সম্ভব? যদি কার্যকর পথে হাঁটা যায় তবেই সম্ভব এই ক্ষত সারানো বা উপড়ে ফেলার।

বিশ্বে শান্তির দেশের তালিকায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অবস্থান কত? অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই)-২০২৫ শান্তি সূচকে ৩৩ ধাপ পিছিয়ে ১৬৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১২৩। সত্যিই এ খবর উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার।

বাংলাদেশ ছাড়াও শান্তির সূচকে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো হলো– ইউক্রেন, রাশিয়া, মায়ানমার, কঙ্গো। এসব দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা সবার জানা। এই ইনডেক্স চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, আমরা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছি। এর বড় প্রমাণ হলো সামাজিক বাস্তবতা। এই সূচকের কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে–এ নিয়ে কারও ভাবনা আছে?

শান্তির দেশের তালিকা তৈরির জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় দেখা হয়, সেগুলোর অন্যতম হলো– অপরাধের হার ও সহিংসতার মাত্রা, সমাজে অস্থিরতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, হত্যা ও অপরাধজনিত কারণে মৃত্যুর হার। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এবং তাদের কার্যকারিতা। কারাবন্দির সংখ্যা এবং শরণার্থীদের অবস্থা। এ সবকটি মানদণ্ডে আমরা পিছিয়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সামাজিক অপরাধ রাষ্ট্রের বড় মাথা ব্যথার কারণ কিনা জানিনা। বাস্তবতা হলো পুলিশ-প্রশাসন সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না, বা করছে না। দেশে মবের সংস্কৃতি চলছে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বদনাম। আইন ও সালিশকেন্দ্রের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে, ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবকটিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ২০৩ জন শিশু নিহত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট উদাহরণ। বাবা-মা সন্তানকে হত্যা করছে। সম্পতির বিরোধে ও বয়স্ক পিতা-মাতাকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে সন্তান। সামান্য ইস্যুতে দেশে খুনোখুনি হচ্ছে। বাড়ছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর বিরোধ। সব মিলিয়ে সমাজ রীতিমতো অশান্ত। আমরা অশান্ত সমাজের দাবানলে পুড়ছি।

নির্বিচারে শিশুদের ওপর পাশবিকতা, হত্যা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে শিশুদের বলাৎকারের মতো অসংখ্য ঘটনার পরও আমরা বলব সমাজ পরিবর্তনের জন্য ভাবনা ভাবা উচিত নয়? এই রোগের চিকিৎসার দরকার নেই। যে দেশে শিশুদের ওপর বর্বরতা চলে, সে জাতি-রাষ্ট্র অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। আমরা শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছি না। রামিসার মতো হয়ত আরও অনেক শিশু নীরবে ভয়ংকর পরিণতির শিকার হচ্ছে। সবকিছু গণমাধ্যমে আসছে না, লোক-লজ্জার কারণে অনেক পরিবার তা প্রকাশও করতে চান না। সমাজের এই অস্বাভাবিকতার চিকিৎসা অনিবার্য।

যে নিয়ম স্বাভাবিক পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারে না, তখন বোঝা উচিত এই অস্ত্র ভোতা হয়ে গেছে। বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। অর্থাৎ যে জাতি সংস্কৃতিতে যতটা সমৃদ্ধ, সে জাতি ততটা সভ্য ও উন্নত। সংস্কৃতি মানুষকে সভ্য করে তোলে। মনের মধ্যে থাকা দানবকে নিভৃত করে। খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। সুস্থ ধারার সংস্কৃতিকে সমাজ বদলের হাতিয়ার বলা হয়। তাই সময় এসেছে সংস্কৃতির বিকাশ, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও জাগরণের। যা রাজনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। সমাজ পরিবর্তন ও মানুষের মনোজগত বদলাতে সংস্কৃতির দিকে সবাইকে ধাবিত হতে হবে, এটা একটা বিরাট বড় ও কার্যকর ওষুধ।

৫০ বছরের বেশি সময় দেশে সংস্কৃতির স্থবিরতা চলছে। গোটা সাংস্কৃতির জগৎ অন্ধকার। একমুখী রাজনীতি আর মোবাইল সংস্কৃতির গ্রাসে আমরা সবাই। সংস্কৃতি এমন একটি উপাদান যা সমাজ চিন্তা, মানসিকতা ও সভ্যতা বদলানোর ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, অথচ তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। একে একে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা নামে মাত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক আয়োজন থামতে শুরু করেছে। গ্রামীণ যাত্রাপালা, নাটক, বিভিন্ন পালা গানের আয়োজন, কবিগান, খেলা, জারি-সারি, গানের আসর, গীত, ধামাইল সবকিছু এখন যেন কাগজের পাতায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন। শিশুদের খেলার মাঠ নেই, প্রয়োজনীয় পার্ক নেই। কমছে সুস্থ ধারার বিনোদন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট দিন দিন এককেন্দ্রিক ও কম হচ্ছে। বড় বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অর্থের অভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তাহলে মানুষের উন্নত মনোজগৎ ও মানসিকতার বদল কেমনে ঘটবে? অথচ এই উপমহাদেশ ছিল একসময় শিক্ষা সংস্কৃতির উর্বরকেন্দ্র। সংস্কৃতি বিমুখতা আমাদের মন ও চিন্তাকে শক্ত ও অমানবিক করে তুলছে। যেকোনো অপকর্ম করতে মন বাধা দেয় না। তাই অপরাধ বাড়ছে। নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা। 

সংস্কৃতির বিপ্লব নতুন কিছু নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পুরোনো প্রথা ভেঙে নতুন সমাজ বদলে সংস্কৃতির পথ ধরে হেঁটেছে। ৯০ দশকে বেলজিয়ামে সামাজিক অপরাধ ঠেকাতে পুরো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যে আলোড়ন তৈরি করেছিল, তার মূলকথা ছিল বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির আশ্রয়, ভাবের বিপরীতে বস্তুর প্রাধান্য। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় যে জাগরণ ঘটে, যার প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। ধর্ম-সংস্কৃতি-সাহিত্য-রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় আদর্শ-সব ক্ষেত্রেই নবীন ভারতে যে রূপান্তর ঘটল তার মূলে এক বড় শক্তিরূপে কাজ করেছে এই রেনেসাঁ। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের স্বদেশি আন্দোলনে এই জাগরণ নিজেকে জানান দেয় এক অসাধারণ বিক্রমে।

তাই সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত ও সভ্য সমাজের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সংস্কৃতির পথে হাঁটতে হবে। সাংস্কৃতিক বিল্পব পারে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে। সবাইকে নতুন পথ দেখাতে, নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে আরও বেশি সুরক্ষিত করতে। সেই সঙ্গে বিশ্বের কাছে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। সমাজের ক্ষত সারাতে সাংস্কৃতির বিপ্লব চাই-ই-চাই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]

শিশুরদের স্মার্টফোন আসক্তি কতটা ভয়ংকর

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১১:১২ পিএম
শিশুরদের স্মার্টফোন আসক্তি কতটা ভয়ংকর
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার বাসিন্দা রুবেল (ছদ্মনাম)। পেশায় আয়কর আইনজীবী। প্রথম সন্তানের বয়স আট। পরেরজনের বয়স তিন। প্রথম সন্তান সবকিছু স্বাভাবিকভাবে করছে- পড়াশোনা, ড্রইং, খেলাধুলা সবই নিয়ম মেনে করে। কখনো কখনো আবার দুষ্টুমি করে মায়ের বকাও শোনে। সংকট হলো পরেরজনকে নিয়ে। তিন বছরের মেয়েটি কথা বলে খুব কম। প্রথমদিকে তারা একে সহজভাবে নিলেও ধীরে ধীরে তাদের দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই এটা নিয়ে ভাবেন, আলোচনা করেন, সমাধান খোঁজেন।

শেষে নিজেরা সমাধান খুঁজে না পেয়ে শরণাপন্ন হন চিকিৎসকের। চিকিৎসক সব দেখে-শুনে তাকে একজন থেরাপিস্ট এবং চাইল্ড স্পেশালিস্টের সঙ্গে আলাপ করতে বলেন। চাইল্ড স্পেশালিস্ট অনেকক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, শিশুর দেরিতে কথা বলা বা স্পিচ ডিলে আছে। এই কারণে শিশু খুব কম কথা বলে। সারাক্ষণ মোবাইল দেখে।

রুবেল যেভাবে সন্তানের সমস্যা বুঝতে পেরেছেন, বাকি অভিভাবকেরা কি তা পারছেন? বেশিরভাগই পারছেন না, কারণ তাদের জানার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আপনার সন্তান কি স্মার্টফোনে আসক্ত? প্রশ্নটা অবশ্য এভাবে না করে করা উচিত- আপনার সন্তান কেন স্মার্টফোনে আসক্ত?
স্মার্টফোনে আসক্তির বিষয়টি শুরুর দিকে আতঙ্কের পর্যায়ে থাকলেও এখন অনেকেই তা মেনে নিয়েছেন।

সুস্পষ্ট করে বললে, অভিভাবকেরা মানতে বাধ্য হয়েছেন। তার কারণ অবশ্য অঢেল।

প্রথমে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি: স্মার্টফোন এখন জীবনযাপনের অংশ। তা হুট করে সরানোর কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু সেই স্মার্টফোন আপনার গোটা সময় কেড়ে নেবে, এটা স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তা অস্বাভাবিক।

করোনার আগে শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের পরিসর ছিল ক্ষুদ্র, করোনার পর তা বেড়েছে। প্রয়োজনে বেড়েছে। এখন সেই প্রয়োজনই সহজ-স্বাভাবিক আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। এই সহজ-স্বাভাবিক রূপের আড়ালে রয়েছে ভয়াবহতা। এর প্রতিকার অবশ্য আছে। প্রতিকার সম্ভবও। তা নির্ভর করছে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও আগ্রহের ওপর। প্রশ্ন হলো, অভিভাবকেরা কি আসলে আগ্রহী?

২০২৪ সালে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। এদের মধ্যে ২৯ শতাংশের মারাত্মক স্মার্টফোন আসক্তি রয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। আরও দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন মায়ের ৪ জনই সন্তানের স্মার্টফোন আসক্তি সম্পর্কে অবগত নন।

জানতে চেয়েছিলাম, আপনার সন্তান কেন স্মার্টফোনে আসক্ত? এর উত্তর গবেষণার মধ্যেই আছে। গবেষণা বলছে, ১৪ শতাংশ শিশু অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এই ১৪ শতাংশ শিশু বা তাদের অভিভাবকেরা পেরেছেন স্মার্টফোনকে শুধুমাত্র অধ্যয়ন বাদে অন্য কাজে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে।

তারা স্মার্টফোন ব্যবহারকে আসক্তির পর্যায়ে নিতে দেননি। নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন।

আবার যে ২৯ শতাংশ শিশুর স্মার্টফোনে আসক্তি মারাত্মক, তারা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তারা ধীরে ধীরে বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে এই আসক্তি দূর করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন শিশুদের মনোযোগ অন্যত্র স্থানান্তর করা। এটা সহজ কাজ নয়। কিন্তু সম্ভব। তা সময়, শ্রম ও ধৈর্যসাপেক্ষ।

প্রসঙ্গ হলো, এখনকার অভিভাবকেরা অনেক বেশি কর্মমুখর। যৌথ পরিবারের ধারণা ভেঙে একক পরিবার বেড়েছে। ফলে অভিভাবকদের বাড়তি কোনো লোক থাকছে না। অল্প মানুষ দিয়ে স্বল্প সময়ে তাদের অনেক কিছু করতে হয়। ইচ্ছা থাকলেও সবসময় তারা পেরে ওঠেন না। তখন শিশু বাধ্য হয়ে স্মার্টফোনকে আপন ভেবে নেয়।

এরপরের বিষয় হলো, অনিরাপদ পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। মোটাদাগে বলতে গেলে, শিশুরা অনিরাপদ। তারা পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, এমনকি দূরের আত্মীয় কারও কাছে নিরাপদ নয়। প্রতিদিনের গণমাধ্যমের অসংখ্য প্রতিবেদন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এর ফলে শিশু একাকী সময় কাটানোর জন্য স্মার্টফোনকে আপন ভাবছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খেলার পরিবেশ ক্ষীণ হওয়া এবং পার্ক ও খেলার মাঠের স্বল্পতা। নগরায়ন বা দ্রুত বর্ধনশীল আবাসনে খেলার মাঠ বা পার্ক অবহেলিত এক প্রকল্পের নাম। যারা নগরায়ন তৈরি করে, তাদের চোখে পার্ক বা মাঠ হলো অলাভজনক বিষয়। আবার পুরোনো যেসব মাঠ বা পার্ক আছে, তাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর করতলে। ফলে শিশুরা মাঠ বা পার্ক না পেয়ে স্মার্টফোনে আসক্ত হচ্ছে।

এই সংকটগুলোর সমাধান সম্ভব, যদি রাষ্ট্র চায়। এখন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাল আর চিন্তার মধ্যে তো আর শিশুদের ফেলে রাখা যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য বিভিন্ন কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি চালু রাখতে হবে।

শিশু যখন তার মনোযোগ অন্য কোনো কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটির মধ্যে দেবে, তখন স্মার্টফোন আসক্তি ধীরে ধীরে কমে আসবে। এখন প্রশ্ন হলো, কী ধরনের কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি তার সঙ্গে করা হবে, বা কী ধরনের কার্যকলাপের মধ্যে শিশুকে ব্যস্ত রাখা হবে?

শিশুর বয়স নির্ধারণ করে, সেই বয়স অনুযায়ী তার কার্যকলাপ বা অ্যাক্টিভিটি নির্ধারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ড্রইং, খেলাধুলা, গান, নাচ, আবৃত্তি, যন্ত্রসংগীত, অভিনয়, সাইক্লিং, সুইমিং, আর্টওয়ার্ক, ভাষা শেখানো, মার্শাল আর্ট শেখা, পরিচয়পর্ব (গাছ, ফুল, পাখি, সবজি, ফলমূল চেনানো), মাটি বা ক্লে বা ডো দিয়ে বিভিন্ন কিছু তৈরি করা, শিশুপার্কে নিয়ে যাওয়া, চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া, গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটানোসহ অসংখ্য বিষয়ের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটানো সম্ভব।

এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তারা শত ব্যস্ততার মধ্যেও শিশুদের নিয়ে এইসব কাজ করাতে পারেন।

এছাড়া শহর বা নগরে বিভিন্ন ধরনের প্রি-স্কুল, কেয়ার সেন্টার চালু আছে। তা অবশ্য ব্যয়সাপেক্ষ। এসব প্রি-স্কুল বা কেয়ার সেন্টারে শিশুদের ব্যস্ত রাখতে অনেক ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অভিভাবকেরা প্রি-স্কুল বা কেয়ার সেন্টার যাচাই-বাছাই করে শিশুদের যুক্ত করতে পারেন।

সবার সামর্থ্য সমান নয়। যাদের সামর্থ্য স্বল্প, সেসব অভিভাবকেরা শিশুদের সময় দিয়ে তাদের বন্ধু হতে পারেন। তারা কী চায়, তা বুঝে সেই অনুযায়ী কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা সাজাতে পারেন।

এক্ষেত্রে প্যারেন্টিংয়ের গাইডলাইন ভালো সহযোগী হবে।

এর ফলে যা হবে, তা হলো স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুদের তাৎক্ষণিকভাবে আসক্তি থেকে দূরে সরানো সম্ভব নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে তা দূর করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে সর্বক্ষণ যুক্ত থাকতে হবে। এতে করে শিশুরা অনেক বেশি কর্মমুখর বা প্লেফুল হয়ে উঠবে।

লেখা শেষ করছি একটা চলচ্চিত্রের ঘটনা বলে।

ভারতের বাংলা ভাষার একটি চলচ্চিত্র ‘হাবিজাবি’। এটি মুক্তি পায়২০২২ সালে। গল্পটা এরকম—স্বামী-স্ত্রী দুজনই ব্যস্ত। ছেলেকে সময় দেওয়ার সময় তারা পান না। ছেলে নিজের একাকীত্ব কাটানোর জন্য স্মার্টফোনকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। ধীরে ধীরে তার আসক্তি বাড়তে থাকে। সেই আসক্তি প্রবল আকার ধারণ করে। অনলাইনে গেম খেলতে খেলতে সে এমনভাবে নেশায় ডুবে যায় যে, সবসময় স্মার্টফোন হাতে বসে থাকে। তার হাত থেকে স্মার্টফোন সরানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

স্মার্টফোন হাত থেকে সরানো নিয়ে বাবার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধলে ছেলে অনলাইন গেমে বাবাকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে থাকে। একসময় স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারে, তাদের সন্তান আসলে অনেক বেশি মাত্রায় স্মার্টফোনে আসক্ত। এ থেকে তারা তাদের সন্তানকে বের করতে পারছে না। এভাবে স্মার্টফোন আসক্তির ভয়াবহ কুফল দেখানো হয়, দেখানো হয় সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন কতটা জরুরি।

চলচ্চিত্রে অনেক ছোট ছোট বিষয় দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এই বার্তা দেওয়া হয়েছে- শিশুদের পারিবারিক বন্ধন থেকে আলাদা করার সুযোগ নেই। এই বন্ধন আলগা হলেই শিশুর যেকোনো ক্ষতিকর বিষয়ের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি এবং খেয়াল রাখা জরুরি, যাতে করে তাদের শিশু অন্যত্র বা অন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয়ে আসক্ত না হয়।

বিনয় দত্ত: লেখক