ঢাকা ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, রোববার, ২৬ মে ২০২৪

আপনার ঘরে কি মসজিদ আছে?

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপনার ঘরে কি মসজিদ আছে?
কুল শরিফ জামে মসজিদ, কাজান, রাশিয়া। ইন্টারনেট

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর তৈরি করে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৫০)

ঘরোয়া মসজিদ সম্পূর্ণ ঘর থেকে আলাদা হতে হবে অথবা সম্পূর্ণ পৃথক একটি কক্ষ তার জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে এমনটি জরুরি নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো ঘরের একটি জায়গা নামাজের জন্য নির্দিষ্ট রাখা। নানা আয়োজনে সেই জায়গা মসজিদের রূপ দেওয়া। এই সুন্নতের কথা একাধিক হাদিসে এসেছে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে ঘরে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা সুগন্ধিযুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বলেছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৫৫)

সামুরা (রা.) নিজের ছেলেকে লেখেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের ঘরে ঘরে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা ঠিকভাবে তৈরি করে পরিষ্কার রাখারও নির্দেশ দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৫৬)

হাদিসের ব্যাখ্যায় কিছু আলেম বলেছেন, বসতবাড়িতে নয়; বরং এখানে প্রতিটি গোত্র বা এলাকায় মসজিদ নির্মাণ করা উদ্দেশ্য। তবে অন্য আলেমরা বলেন, এখানে ব্যক্তিগত ঘরে মসজিদ তৈরি উদ্দেশ্য। যেখানে পরিবারের সদস্যরা নফল এবং তাহাজ্জুদ নামাজ পড়বে। বিশেষভাবে নারীরা সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করবে। এমনকি পুরুষরা কখনো মসজিদে যেতে অপারগ হলে, তারাও সেখানে নামাজ আদায় করবে।

ইতবান ইবনে মালেক আনসারি (রা.) বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে বললাম, আমার দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে এবং আমার বাড়ি থেকে স্বগোত্রেীয় মসজিদ পর্যন্ত যেতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জলাবদ্ধতা। আমার একান্ত ইচ্ছা আপনি আমার বাড়িতে এসে এক জায়গায় নামাজ আদায় করবেন, যেন আমি সে জায়গাটুকু নামাজ আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে পারি।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমি তা করব।’ পরদিন রোদের প্রখরতা বাড়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং আবু বকর (রা.) আমার বাড়িতে এলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রবেশের অনুমতি চাইলে আমি তাঁকে অনুমতি দিলাম। তিনি না বসেই বললেন, ‘আমার নামাজ আদায়ের জন্য তুমি তোমার ঘরের কোন স্থানটি পছন্দ করো?’ তিনি পছন্দমতো একটি জায়গা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নামাজ আদায়ের জন্য ইশারা করে দেখালেন। তারপর তিনি দাঁড়ালেন। আমরাও তাঁর পেছনে কাতারবন্দি হলাম। অবশেষে তিনি সালাম ফেরালেন, আমরাও তাঁর সালামের সময় সালাম ফেরালাম।” (বুখারি, হাদিস: ৮০৪) 

ঘরে নামাজের জায়গা থাকা মুসলমানদের জন্য আবশ্যকীয় একটি কাজ। এতে মুসল্লির হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব হয়। বাচ্চারা নামাজ শেখে। তারা সেখানে নামাজ পড়ে। কোরআন তেলাওয়াত করে। পরিবারের সবাই নামাজের প্রতি আগ্রহী হয়। বেনামাজিদের ওপর প্রভাব পড়ে। 

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

 

বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ০৯:০০ এএম
বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত বদনজরের প্রতীকী ছবি

বদনজর মানে কুদৃষ্টি। মানুষের কুদৃষ্টি প্রভাব ফেলে। কুদৃষ্টির কারণে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা (বদনজর থেকে) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও, কেননা বদনজর সত্য ও বাস্তব।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৫০৮)

বদনজর থেকে বাঁচার আমল
নিজেকে এবং নিজের সন্তান-সন্ততি ও সম্পদকে মন্দ লোকের কুদৃষ্টির আড়ালে রাখার চেষ্টা করতে হবে। সকাল-সন্ধ্যা মহান আল্লাহর কাছে মন্দ লোকের কুদৃষ্টি থেকে আশ্রয় চাইতে হবে। বদনজর থেকে বাঁচতে হাদিসে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তিন কুল তথা সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস তিনবার করে পড়ার কথা বলা হয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৭৫) 

বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া 

বদনজর থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া শিখিয়েছেন। দোয়াটি হলো—

বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লা হিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি, ওয়ালা ফিস সামায়ি, ওয়া হুওয়াস সামিউল আলিম। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৫)

বাংলা অর্থ: আল্লাহর নামে (আশ্রয় নিচ্ছি) যার নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো বস্তুই ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী।’

শিশুর নিরাপত্তা ও সুস্থতা কামনা করেন প্রত্যেক মা-বাবা। মা-বাবা চান সন্তান সব ধরনের বিপদ থেকে মুক্ত থাকুক। শিশুদের নিরাপত্তার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া পড়তে বলেছেন। শিশুদের সুরক্ষার জন্য মাঝেমধ্যেই দোয়া পড়ে তাদের গায়ে ফুঁ দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসান ও হুসাইনের গায়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়া পড়ে হাসান-হুসাইন (রা.)-কে ফুঁ দিয়ে দিতেন—

বাংলা উচ্চারণ: আউজু বিকালিমা তিল্লাহিত তাম্মাহ, মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।

বাংলা অর্থ: আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের মাধ্যমে শয়তানের সব আক্রমণ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। বিষধর প্রাণীর ও বদনজরের অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। (বুখারি, হাদিস: ৩১৯১)

লেখক: আলেম ও মাদরাসা শিক্ষক

প্রসিদ্ধ চার আসমানি কিতাব

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
প্রসিদ্ধ চার আসমানি কিতাব
প্রসিদ্ধ চার আসমানি কিতাবের ছবি

মানবজাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। হেদায়েতের গাইড হিসেবে অনেক নবি-রাসুলকে আল্লাহতায়ালা আসমানি কিতাবও দিয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধ বা বড় চারটি কিতাব রয়েছে। যথা—তাওরাত, জাবুর, ইনজিল ও কোরআন। এগুলোকে মানুষ চার আসমানি কিতাব হিসেবে জানে। প্রসিদ্ধ চারটি আসমানি কিতাব সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরা হলো—


কোরআন: কেয়ামত পর্যন্ত আগত মানুষ ও জিন জাতির হেদায়েতের জন্য সর্বশেষ নাজিলকৃত কিতাব কোরআন। সর্বশেষ নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর তা আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘এটা ওই (মহান) কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ। যারা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২-৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরআন আল্লাহর রশি, বিশালকায় আলো, অব্যর্থ মহা ঔষধ। যে আঁকড়ে ধরবে, তার জন্য শক্ত বন্ধন। আর যে অনুসরণ করবে, তার জন্য মহামুক্তির সনদ।’ (সুনানে দারেমি, ৩৩৫৮) 


ইনজিল: বনি ইসরায়েলের হেদায়েতের জন্য ইসা (সা.)-কে ইনজিল দেন আল্লাহতায়ালা। সুরিয়ানি বা হিব্রু ভাষায় নাজিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এ কিতাব। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাদের পর তাওরাতের সত্যায়নকারীরূপে ইসা বিন মরিয়ম (আ.)-কে প্রেরণ করেছি। মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশরূপে তাকে ইনজিল প্রদান করেছি, তার আগে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যায়নকারীরূপে, যাতে ছিল উপদেশ ও আলো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪৬)


জাবুর: দাউদ (আ.)-এর ওপর জাবুর কিতাব নাজিল করা হয়েছিল। জাবুর হিব্রু ভাষায় নাজিল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবি,) আমি তোমার কাছে ওহি প্রেরণ করেছি, যেভাবে নুহ ও তার পরবর্তী নবিদের কাছে প্রেরণ করেছিলাম; ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধর; ইসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সোলায়মানের প্রতি ওহি প্রেরণ করেছিলাম এবং দাউদকে জাবুর দিয়েছিলাম।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৬৩)

তাওরাত: মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত কিতাব নাজিল করা হয়েছে। এটি হিব্রু ভাষায় নাজিল করা হয়। তাওরাতের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে এরশাদ রয়েছে, ‘আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম, তাতে ছিল সঠিক পথের দিশা ও আলো। অনুগত নবিরা এর দ্বারা ইহুদিদের ফায়সালা দিত। দরবেশ ও আলেমরাও (তাই করত)। কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল আর তারা ছিল এর সাক্ষী। কাজেই মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো, আর আমার আয়াতকে নগণ্য মূল্যে বিক্রি করো না। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা বিচার-ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪৪)

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া কাশেফুল উলুম মাদরাসা, মধুপুর

হাটে-বাজারে অবস্থানকালীন সুন্নত

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ০৯:০০ এএম
হাটে-বাজারে অবস্থানকালীন সুন্নত
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ঢাকার কারওয়ান বাজারের ছবি

একে অপরকে সালাম দেওয়া: সাহাবায়ে কেরামের কেউ কেউ শুধু সালামের সাওয়াব লাভের উদ্দেশ্যেই বাজারে যেতেন। তোফায়েল ইবনে উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর কাছে আসতেন এবং সকালে তার সঙ্গে বাজারে যেতেন। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা সকালে বাজারে যেতাম, তখন তিনি প্রত্যেক খুচরা বিক্রেতা, স্থায়ী ব্যবসায়ী, মিসকিনসহ যেকোনো ব্যক্তির কাছ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাকে সালাম দিতেন। এরপর তোফায়েল বলেন, আমি একদিন (অভ্যাসমতো) আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর কাছে গেলাম। তিনি আমাকে তার সঙ্গে বাজারে যেতে বললেন। আমি বললাম, আপনি বাজারে গিয়ে কী করবেন? আপনি তো বেচাকেনার জন্য কোথাও থামেন না, কোনো পণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেসও করেন না, দরদাম জানতে চান না এবং বাজারের কোনো মজলিসেও বসেন না। তিনি বললেন, ‘হে ভুঁড়িমোটা, (তোফায়েলের ভুঁড়ি মোটা ছিল) আমরা সকালবেলা বাজারে একমাত্র সালাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাই। যার সঙ্গেই সাক্ষাৎ হয়, আমরা তাকেই সালাম দিই।’ (মুয়াত্তায়ে মালেক, ৮৫০)


ক্রয়-বিক্রয়ে সত্য কথা বলা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বিক্রেতা ও ক্রেতা যদি ব্যবসার সময় সত্য কথা বলে, তা হলে আল্লাহতায়ালা তাদের ব্যবসায় বরকত দেবেন। আর যদি তাদের কোনো একজনও কিছু গোপন করে, তা হলে আল্লাহতায়ালা বরকত নষ্ট করে দেবেন।’ (বুখারি, ২০৮২)


বাজারে কঠোর, রূঢ় ও নির্দয় না হওয়া: আতা ইবনে ইয়াসার (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.)-কে বললাম, আপনি তাওরাতে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর গুণাবলি বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, আচ্ছা। আল্লাহর কসম! কোরআনে বর্ণিত তাঁর কিছু গুণের কথা তাওরাতেও উল্লেখ করা হয়েছে, হে নবি, আমি আপনাকে সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং উম্মিদের রক্ষক হিসেবেও। আপনি আমার বান্দা ও আমার রাসুল। আমি আপনার নাম মুতাওয়াক্কিল (আল্লাহর ওপর ভরসাকারী) রেখেছি। এরপর তিনি বললেন, তিনি বাজারে কঠোর, রূঢ় ও নির্দয় স্বভাবের ছিলেন না।’ (বুখারি, ২১২৫) 


প্রয়োজন শেষে দ্রুত বাজার ত্যাগ করা: অযথা অতিরিক্ত সময় বাজারে না কাটানো। কারণ বাজার হচ্ছে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দের জায়গা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হলো মসজিদ আর সবচেয়ে অপছন্দের জায়গা হলো বাজার।’ (মুসলিম, ৬৭১)

লেখিকা: অনুবাদক ও গবেষক

মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করবেন যেভাবে

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করবেন যেভাবে
মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করার ছবি

মুসাফাহা আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো করমর্দন বা হাতে হাত মেলানো। কারও সঙ্গে সাক্ষাৎকালের প্রথম কাজ হলো সালাম আদান-প্রদান করা। এরপর দুই হাত মিলিয়ে মুসাফাহা করার মাধ্যমে সালামকে পরিপূর্ণ করা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সালামের পরিপূর্ণতা হলো মুসাফাহা।’ (তিরমিজি, ২৭৩০) আতা ইবনে আবি মুসলিম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে (একে অপরের সাথে) মুসাফাহা করো, এর দ্বারা তোমাদের প্রতিহিংসা দূর হয়ে যাবে।’ (মুয়াত্তা মালেক, ১৬১৭) 

মুসাফাহা করার দ্বারা গুনাহ মাফ হয়। বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেছেন, ‘পরস্পর সাক্ষাতে দুই মুসলমান যখন মুসাফাহা করে, পৃথক হওয়ার আগেই তাদের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (তিরমিজি, ২৭২৭)

মুসাফাহা করার সুন্নাহ পদ্ধতি: উভয় হাত দিয়ে মুসাফাহা করা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘(মুসাফাহার সময়) আমার হাতটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই হাতের মধ্যে ছিল।’ (বুখারি, ৫/২৩১১)

অপর ব্যক্তি হাত না ছাড়া পর্যন্ত হাত না ছাড়া: ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)  যখন কাউকে বিদায় দিতেন, তখন তার হাত ধরে মুসাফাহা করতেন এবং ওই ব্যক্তি হাত সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত তিনি (নবিজি) নিজের হাত সরিয়ে নিতেন না।’ (তিরমিজি, ৩৪৪২)

আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদসহ মাগফিরাতের দোয়া পাঠ করা: বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেছেন, ‘যখন দুইজন মুসলিমের সাক্ষাৎ হয় এবং তারা একে অপরের সঙ্গে মুসাফাহা করার সময় আল্লাহতায়ালার প্রশংসা করে এবং আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করে—আল্লাহতায়ালা উভয়কে মাগফিরাত দান করেন।’ (আবু দাউদ, ৫১৬৯) সুতরাং মুসাফাহা করার সময় প্রশংসা ও দরুদ পাঠের পাশাপাশি ক্ষমা দোয়া কামনা করা উচিত। এই দোয়াটি পাঠ করা যেতে পারে—বাংলা উচ্চারণ: ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম। বাংলা অর্থ: আল্লাহতায়ালা আমাদের সকলকে ক্ষমা করুন।

মুসাফাহার সময় ক্ষমার দোয়া করার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। উল্লিখিত যে দোয়াটি পাঠের প্রচলন রয়েছে, হুবহু সেটা রাসুলুল্লাহ (সা.)  পাঠ করতেন—এমনটা প্রমাণিত নয়। তবে এই দোয়াটি যেহেতু হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ক্ষমা কামনায় প্রতিনিধিত্ব করে, সুতরাং এই দোয়াটি মুসাফাহা করার সময় পাঠ করায় কোনো অসুবিধা নেই। তবে মুসাফাহা করার সময় হাতে ঝাঁকি দেওয়া এবং মুসাফাহা শেষে বুকের সঙ্গে হাত মেলানোর প্রয়োজন নেই।

নারীদের সঙ্গে মুসাফাহা না করা: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তবে তিনি কথার মাধ্যমে নারীদের বাইয়াত গ্রহণ করতেন।’ (বুখারি, ৬৭৮৮; মুসলিম, ১৮৬৬)

আনাজা গোত্রের এক ব্যক্তি আবু জর (রা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আপনাদের দেখা হলে তিনি কি আপনাদের সঙ্গে মুসাফাহা করতেন? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, যখনই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আমার দেখা হতো; তিনি আমার সঙ্গে মুসাফাহা করতেন। একদিন তিনি আমার কাছে লোক পাঠালেন। আমি তখন বাড়িতে ছিলাম না। আমি ফিরে এলে জানানো হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)  আমার কাছে লোক পাঠিয়েছেন। এরপর আমি যখন তাঁর কাছে হাজির হলাম। তখন তিনি গদির ওপর ছিলেন। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তা ছিল খুবই উত্তম ও মনোরম।’ (আবু দাউদ, ৫২১৪) 
মুয়ানাকাও আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো কোলাকুলি করা। অপরের গর্দানের সঙ্গে গর্দান লাগিয়ে জড়িয়ে ধরা। গর্দানের সঙ্গে গর্দান লাগিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরাকে ইসলামি পরিভাষায় মুয়ানাকা বলা হয়। (লিসানুল আরাব, ১০/২৭২)
দীর্ঘদিন পর একে অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে পরস্পরে মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করা সুন্নত। দীর্ঘদিন পর কেউ সফর থেকে এলে দেখা-সাক্ষাতে সাহাবারা মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) যখন মদিনায় এলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)  তখন আমার ঘরে ছিলেন। জায়েদ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আমার ঘরে এলেন এবং দরজায় টোকা দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)  তার পরিধেয় কাপড় ঠিক করতে করতে উঠে গিয়ে জায়েদের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন এবং আদর করে চুমু খেলেন। (তিরমিজি, ২৭৩২)

মুয়ানাকা করার সুন্নাহ পদ্ধতি: একবার মুয়ানাকা করা; তিনবার নয়। মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করার সুন্নত পদ্ধতি হলো, একে অপরের ডান দিকের ঘাড়ের সঙ্গে ঘাড় মেলানো এবং বুকের সঙ্গে বুক মিলানো। মুয়ানাকা শুধু একবার করতে হয়। তিনবার করার কোনো বর্ণনা হাদিস বা ফিকহের কোনো কিতাবে উল্লেখ নেই। (আহসানুল ফাতাওয়া, ৯/৭৭) 

মুয়ানাকার দোয়া পড়া: মুয়ানাকা করার সময় নিচের দোয়াটি পড়া সুন্নত। বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা জিদ মুহাব্বাতি লিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি।  বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আল্লাহ এবং রাসুলের খাতিরে আমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করে দিন। (জামেউস সুনান, ১৫৯)
মুয়ানাকা বা কোলাকুলি শেষে আদর বা স্নেহ করে চুমু খাওয়া: কপালে চুমু খাওয়ার কথা এসেছে। যেমনটা জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) কথা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন। তবে  এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো, কপালে বা গালে অথবা হাতে চুমু খাওয়া ওই ব্যক্তির জন্য জায়েজ, যিনি মনের কামনা-বাসনার আশঙ্কা থেকে পবিত্র। যাকে চুমু খাবেন বা আদর করবেন, তিনিও এমন আশঙ্কা না থাকবেন। (রদ্দুল মুহতার, ৯/৫৪৬; মাবসুত, ১০/ ১৪৯)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

কবুল হজে মেলে জান্নাত

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০৯:০০ এএম
কবুল হজে মেলে জান্নাত
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত কাবা শরিফের ছবি

হজ অর্থ ইচ্ছা করা। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্ধারিত কিছু বিধান পালন করা হলো হজ। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম হজ। এটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। এর জন্য প্রয়োজন সক্ষমতা; বিশেষ করে আর্থিক সক্ষমতা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর জন্য এই ঘরের হজ করা লোকদের ওপর আবশ্যক, যার সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য আছে। যে অস্বীকার করবে, (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের মুখাপেক্ষী নন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭) 


উল্লিখিত আয়াতে ‘যার সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য আছে’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বাইতুল্লাহ যাতায়াতে অর্থ ও পাথেয় যার কাছে আছে। একইভাবে রাস্তা ও জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা এবং শারীরিক সুস্থতা ইত্যাদিও সামর্থ্যের অন্তর্ভুক্ত। নারীদের জন্য মাহরাম (স্বামী অথবা যার সঙ্গে তার বিয়ে চিরতরে হারাম এমন কোনো পুরুষ) থাকা জরুরি। (ফাতহুল কাদির)


কোরআনের আরেক আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইবরাহিম (আ.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দিন। তারা আপনার কাছে আসবে হেঁটে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটসমূহের পিঠে (আরোহণ করে), তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৭)
মক্কা নগরীর পাহাড়ের চূড়া থেকে উচ্চারিত সেই আহ্বান আজ পৃথিবীর কোণায় কোণায় পৌঁছে গেছে। প্রত্যেক হজ ও উমরা সম্পাদনকারী হজ ও উমরার সময় সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আল্লাহর কাছে ‘লাব্বাইক’ (আমি উপস্থিত) বলেন। 


ইসলামে অনেক আমল আছে সর্বোত্তম। এর মধ্যে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হজ অন্যতম। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞাসা করা হলো, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে (শত্রুর মোকাবিলায়) জিহাদ করা। জিজ্ঞাসা করা হলো, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, কবুল হজ।’ (বুখারি, ১৫১৯)


গ্রহণযোগ্য হজের প্রতিদানে মেলে জান্নাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক উমরার পর আরেকটি উমরা পালন করা, উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা স্বরূপ। কবুল হজের প্রতিদান হলো জান্নাত।’ (বুখারি, ১৭৭৩) 


আরবি জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ মোট ৫ দিনে হজ সম্পন্ন করতে হয়। এ বছর চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৬ জুন হজ অনুষ্ঠিত হবে। 

লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর