বই-পুস্তকের কথা সব সময় ধরতে হয় না রে ছুডু মিয়াঁ- অনেক আগে আমাদের গ্রামের রইস চাচা একদিন বলেছিলেন। আমি ভাবতাম উনি মূর্খ মানুষ, পড়ালেখা করেননি। এমনিতেই এসব বলছেন। পরে আমি প্রায়ই উনার কথার সত্যতা খুঁজে পেয়েছি।
তখন স্কুলে পড়তাম। আমার এক চাচা বলেছিলেন, উনি নাকি বইয়ে পেয়েছেন, কেউ যদি এক গালে থাপ্পড় মারে, তাহলে আরেক গাল পেতে দিবি। দেখবি সে লোক লজ্জা পেয়ে যাবে। আর মারবে না তোকে, বরং অনুতপ্ত হবে।
কিন্তু সেই উপদেশ পালনের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছিল একবার। আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে রাগী হলেন শিকদার স্যার। একবার কী এক কারণে আমার গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেন। আমি আমার সেই চাচার কথা ধরে আরেকটা গাল পেতে দিয়ে বলি, স্যার এই গালেও একটা মারেন!
শিকদার স্যার রেগে ফেটে পড়ে আমার পেতে দেওয়া গালে তুমুল শব্দে বিপুল সমারোহে চড় বসিয়ে দেন। আমি সেই গালে শিকদারের স্যারের পাঁচ আঙুলের ছাপ নিয়ে কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছিলাম।
এর পর আমাদের ক্লাসে পড়ানো হয়, স্বাস্থ্যই সব সুখের মূল। আরাফাত নামে আমাদের এক বন্ধুর স্বাস্থ্য ছিল দেখার মতো। সে ক্লাস এইটে থাকতেই সকালে ৩০টা বুকডাউন দিয়ে, দুটা কাঁচা ডিম খেয়ে, দাঁত ব্রাশ না করে স্কুলে এসে পড়ত। একদিন স্কুলে এক নড়বড়ে বেঞ্চে আমার পাশে সে বসতে গেলে পুরো বেঞ্চ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। সঙ্গে আমরা দুজন। এর ফলে আমার প্যান্ট ছিঁড়ে যায়, হাত ছিলে যায় আর ক্লাস টিচার পাটোয়ারি স্যার ক্লাসে এসে ভাঙা বেঞ্চ দেখে- ‘পড়ালেখা না করে জব্বরের বলি খেলা হচ্ছে, না?’ এই বলে আমাদের দুজনকে জালি বেত দিয়ে ধোলাই দেন। বলাই বাহুল্য, আরাফাতের বিশাল স্বাস্থ্যের জন্য সেদিন এই বিপদে পড়তে হয়েছিল।
ক্লাস টেনে উঠে স্কুল পালিয়ে বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। সিনেমার নাম ছিল, কুসুম কুসুম প্রেম।
পরদিনই আমাদের ডাক পড়ে হেড স্যারের রুমে। দপ্তরি কালিপদকে আমরা জিজ্ঞেস করি, কী ব্যাপার দাদা?
কালিপদ’দা আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে বললেন, ব্যাপারের কি আর শেষ আছে!
শুনে আমাদের মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়। হেড স্যারের রুমে যেতেই স্যার জলদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, কাল ক্লাস পালিয়ে কই গিয়েছিলি?
আমাদের প্ল্যান ছিল আমরা বলব, পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়তে গিয়েছিলাম। বই নিয়ে স্যারের আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল, আমরা জানতাম। তাছাড়া মিথ্যা বলা মহাপাপ- এটা ছোটকাল থেকেই পড়ে আসছি। তাই আমি ফস করে সত্য বলে বসলাম, স্যার সিনেমা দেখতে। সিনেমার নাম কুসুম কুসুম প্রেম!
আমার জবাব শুনে হেড স্যার যত না চমকালেন, তার চেয়ে বেশি চমকালো আমার বন্ধুরা। বলাই বাহুল্য, সেদিন হেড স্যারের দার্জিলিং থেকে আনা বেতের প্রদর্শনী দেখেছিলাম আমরা। স্যারের রুম থেকে বের হয়ে বন্ধুদের হাতে আরেক প্রস্থ মার খেতে হয়েছিল আমার।
এহ সত্যবাদী যুধিষ্ঠির আসছে!- পশ্চাৎদেশে লাথি হাঁকানোর আগে বিপুল বলেছিল।
এই বিপদ কলেজ ভার্সিটি সব জায়গাতেই চলতে থাকে।
পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না, পরের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করিও- এই বাক্য পড়েছি। তার পর কী হলো দেখুন।
ভার্সিটির পুষ্প নামের এক মেয়েকে একটা কাগজে লিখে নীল খামে ভরে হাতে গুজে দিয়েছিলাম। সঙ্গে একটা হার্টের চিহ্ন, যার ভেতর দিয়ে একটা তির চলে গেছে। পরদিন পুষ্পের বড় ভাই তার দলবল নিয়ে এসে ভার্সিটির সবার সামনে আমাকে কেলিয়ে ভর্তা বানিয়ে ফেলে। আরেকটু হলেই নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম।
সাত দিন বাসায় বেড রেস্টে ছিলাম। এর পরও আমার শিক্ষা হলো না। এর কয়দিন আগে এক বিদেশি লেখকের বইয়ে পড়ি, আপনার সামনে কোনো বিপদ এলে, সেই বিপদের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিন। বিপদ পালিয়ে যাবে।
অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটা ফাইলে মারাত্মক একটা ভুল করে রাখায় ডাক পড়ে বসের রুমে। ফাইলটা আমার দিকে ছুড়ে দিয়ে বস বললেন, কী করেছেন এটা? বলি কী করেছেন? আপনাকে কি এই ফাইলের গুরুত্ব কতটুকু বলা হয়নি?
আমি হ্যাঁও বললাম না, নাও বললাম না। স্যারের দিকে তাকিয়ে আমার হলুদ দাঁতগুলো বের করে একটা মিষ্টি হসি দিলাম।
বলাই বাহুল্য, আজ চার মাস ধরে আমি বেকার।