বাবা মালাইভোগ খুব পছন্দ করতেন। তারই আলোকে ছেলের নাম রেখেছিলেন মালাই-উর-রেহমান। একটু আনকমন নাম, কিন্তু প্রতিবেশীরা ব্যাপারটি মেনে নিয়েছিলেন। মালাইয়ের বন্ধুরাও মানবতার খাতিরে আপত্তি করেননি। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল প্রেম করতে গিয়ে। ক্লাসমেট রিমঝিমকে পছন্দ করলেন, কিন্তু রিমঝিমের এক কথা, ‘মালাই খাওয়ার জিনিস, প্রেম করার জিনিস না। এই নামের কোনো মানুষের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা হতে পারে না। আগে নাম চেঞ্জ করেন, তার পর এ ব্যাপারে ভাবব।’
সেদিনই মালাই-উর-রেহমান দৃপ্ত শপথ নিলেন, ‘মালাইভোগ খাইয়ে রিমঝিমকে বোঝাব মালাই কী জিনিস! মালাই ভালো লাগলে মালাই-উর-রেহমানকেও ভালো লাগবে। তার পর নিশ্চয়ই সে প্রেমের জালে ধরা দেবে।’
যেমন ভাবা তেমন কাজ। প্রাথমিক পরিকল্পনা করার জন্য মালাই-উর-রেহমান তার বন্ধুবর হিমেলের বাসায় তশরিফ আনলেন। ঘটনা শুনে হিমেল অবাক, “এই আক্রার বাজারে রিমঝিমকে মালাইভোগ কীভাবে খাওয়াবি? যে দাম রে বাবা! তার চেয়ে চল ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ এনে খাওয়াই। স্বাদে দারুণ, আবার খরচও কম।”
মালাই-উর-রেহমান এবার বিরক্ত না হয়ে পারলেন না, “ধুর ব্যাটা, রিমঝিম তো পোলা না যে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ খাবে? ওকে মালাইভোগই খাওয়াব।”
অগত্যা কী আর করা, দুই বন্ধু মালাইভোগ জোগাড় করার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। এই দোকান, সেই দোকান ঘুরে কোথাও মালাইভোগ না পেয়ে যখন মালাই-উর-রেহমান দিশাহারা, ঠিক তখনই মোবাইল বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করে বললেন, ‘হ্যালো, মালাই হেয়ার।’
ওপাশ থেকে জবাব এলো, ‘ভাই, আপনে কি মালাইভোগ খুঁজবার লাগছেন?’
মালাই-উর-রেহমানের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল, ‘জি ভাই। আপনার কাছে মালাইভোগ আছে নাকি?’
‘জি না, নাই। তবে আপনে চাইলে মালাইভোগ বানানোর রেসিপি আর সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারি।’–অপর পাশ থেকে জবাব এল।
মালাই-উর-রেহমান এমনই একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। দেরি না করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অবশ্যই সরবরাহ করবেন। কোথায় আসতে হবে বলেন?’
ঘণ্টা দুই পরের কথা। মালাই-উর-রেহমান মালাইভোগ বানানোর রেসিপি হাতে তার কিচেনে বসে আছেন। রেসিপিতে লেখা–
আইটেম : মালাইভোগ
উপকরণ : ছানা ১ কাপ, দুধ ২ লিটার, সুজি ১ চা চামচ, ময়দা ১ টেবিল চামচ, বাটার অয়েল আধা চা চামচ, বেকিং পাউডার এক চিমটি, চিনি ৩ কাপ, পানি ৬ কাপ, মালাই সিকি কাপ, ক্ষীরশা সিকি কাপ, এলাচ গুঁড়া সামান্য।
প্রণালি : মালাই, ক্ষীরশা, এলাচ গুঁড়া একসঙ্গে ব্লেন্ডারে অথবা মিক্সিতে মিক্স করে রাখতে হবে। ময়দা, বাটার অয়েল, বেকিং পাউডার একসঙ্গে ঘোঁটা দিয়ে সুজি ও দুধ ছেড়ে দিতে হবে। তার পর জাল দিয়ে দুধ টানিয়ে নিতে হবে। দুধ টানানো শেষ হলে ছানা দিয়ে আবার মাখতে হবে। মিশ্রিত ছানা ১২ ভাগ বা ইচ্ছামতো ভাগ করে গোল্লা বানিয়ে হাত দিয়ে চ্যাপ্টা করে শিরায় ছাড়তে হবে। ২০ থেকে ২২ মিনিট ঢাকনা দিয়ে ঢেকে জ্বাল দিতে হবে। চুলা বন্ধ করে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট ঢেকে রাখতে হবে। মিষ্টিগুলো চার-পাঁচ ঘণ্টা সিরায় ভিজিয়ে রেখে সিরা থেকে উঠিয়ে টিস্যু পেপারের ওপর কিছুক্ষণ রেখে মাঝখানে চিরে দুই ভাগ করে মালাই ক্ষীরশার মিশ্রণের প্রলেপ দিয়ে ওপরে কিশমিশ সাজিয়ে পরিবেশন করতে হবে।
মালাই-উর-রেহমান দেরি না করে কাজে হাত দিলেন। রেসিপি দেখে মালাইভোগ বানাতে খুব একটা সময় লাগল না। এবার রিমঝিমের সামনে পরিবেশনের পালা।
পরের দিন ক্লাসে এসে মালাইভোগ পেশ করতেই রিমঝিম খুশি মনে টপাটপ গলাধঃকরণ করলেন। তার পর এল আবার প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পালা। প্রস্তাব শুনে রিমঝিম বললেন, ‘এত চমৎকার খাবারের সঙ্গে আপনার নামের এত্ত মিল! আমি অভিভূত। আপনার প্রস্তাব আমি মানব কি মানব না, তা রাতে জানাব। মিসকল দিলে ব্যাক করবেন কেমন?’
সময় যেন আর কাটে না। মালাই-উর-রেহমান বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পায়চারি করে কাটালেন। তার পর এল রাত। কিন্তু মিসকল তো আসে না। ১টা বাজল, ২টা বাজল, ৩টার সময় মালাই-উর-রেহমান আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। রিমঝিমের মোবাইলে ফোন করলেন। তিন রিং হতেই ফোন রিসিভ হলো। মালাই বললেন, ‘হ্যালো রিমঝিম, মিসকল দেওয়ার...।’
কথা শেষ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বললেন, ‘আমি রিমঝিমের মামা বলছি। রিমঝিম তো হাসপাতালে। কে যেন ওকে মাখনের পানি আর ফরমালিন দিয়ে বানানো নকল দুধের খাবার খাইয়েছে। সেই থেকে চলছে ডায়রিয়া। আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। একটু সুস্থ হোক, তার পর যে ব্যাটা খাইয়েছে তার ১২টা বাজাব।’
মামার কথা শুনে মালাই-উর-রেহমান অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন।