গ্রামের নাম ছিল চকচকিয়া। ছোট্ট শান্ত গ্রাম। তবে সেখানে এক অদ্ভুত মানুষ থাকতেন। নাম তার মোকছেদ কারিগর। তিনি কাঠ দিয়ে নানারকম পুতুল বানাতেন। পুতুলগুলোর কারও হাতে বাঁশি, কারও মাথায় টুপি, আবার কেউ যেন হুবহু গ্রামের মাতবরের মতো দেখতে!
মোকছেদ কারিগরের দোকানের সামনে সব সময় ভিড় লেগেই থাকত। শিশুরা আসত পুতুল কিনতে, বড়রা আসত হাসাহাসি করতে। কারণ, মোকছেদ চাচার পুতুলগুলো শুধু পুতুল ছিল না–মনে হতো যেন গ্রামের মানুষেরই ছোট সংস্করণ।
একদিন তিনি বানালেন এক বিশেষ পুতুল। নাম দিলেন–‘জনাব জব্বার আলি’। পুতুলটার মাথা বড়, গোঁফ বাঁকা, আর মুখে সবসময় হাসি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পুতুলটার পেটে একটা ছোট বোতাম ছিল। বোতাম চাপলেই সে কথা বলত।
–আমি গ্রামের সবচেয়ে জ্ঞানী লোক!
–আমার কথা ছাড়া এক পা-ও চলবে না!
–আমি না থাকলে সূর্যও উঠতে ভয় পায়!
এই কথা শুনে গ্রামের সবাই হো হো করে হাসত। কিন্তু আসল মজা শুরু হলো রবিবার হাটের দিন ।
সেদিন গ্রামের মাতবর জব্বার আলি নিজেই ডেমরা হাটে এলেন। তিনি ছিলেন দাম্ভিক মানুষ। সবসময় বুক ফুলিয়ে হাঁটতেন আর সুযোগ পেলেই বলতেন, আমার মতো বুদ্ধিমান এই গ্রামে আর কেউ নেই!
হাটে ঢুকতেই তিনি শুনলেন, আমি গ্রামের সবচেয়ে জ্ঞানী লোক!
জব্বার আলি থমকে গেলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, একটা কাঠের পুতুল একই কথা বলে যাচ্ছে। লোকজন আবার হাসছে।
তিনি রাগে লাল হয়ে বললেন, এই পুতুল কে বানিয়েছে?
মোকছেদ কারিগর মাথা নিচু করে বললেন,
–আমি বানিয়েছি, মাতবর সাহেব।
–এটা কি আমাকে নিয়ে বিদ্রূপ?
মোকছেদ চাচা মুচকি হেসে বললেন, না না, এটা তো শুধু কাঠের পুতুল। কাঠ কি কখনো মানুষের মতো কথা বলতে পারে নাকি?
চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেল। জব্বার আলি আরও রেগে গেলেন। তিনি পুতুলটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। হঠাৎ ভুল করে পেটের বোতামে চাপ পড়ে গেল।
পুতুল বলে উঠল, আমি ভুল করলেও কখনো ভুল স্বীকার করি না!
এবার তো সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। কেউ হাঁটুতে হাত চাপড়ায়, কেউ চোখের পানি মোছে।
জব্বার আলি মুখ গোমরা করে বললেন, এই পুতুল আমি কিনে নিলাম!
তিনি অনেক টাকা দিয়ে পুতুলটা কিনে বাড়ি নিয়ে গেলেন। ভাবলেন, রাতে চুপিচুপি পুড়িয়ে ফেলবেন। কিন্তু রাতে ঘটল অন্য ঘটনা।
ঘরের মধ্যে হঠাৎ আওয়াজ–
–আমি সবচেয়ে বড় নেতা!
–আমার কথাই শেষ কথা!
জব্বার আলি ভয় পেলেন। তাকিয়ে দেখেন, তার ছোট ছেলে বোতাম টিপে টিপে হাসছে।
ছেলেটা বলল, আব্বা, এই পুতুলটা তো তোমার মতো কথা বলে!
জব্বার আলি হতাশ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তা হলে কি আমি সত্যিই এমন হয়ে গেছি?
পরদিন সকালে তিনি আবার মোকছেদ কারিগরের দোকানে গেলেন। সবাই ভাবল, এবার বুঝি ঝামেলা হবে। কিন্তু না, জব্বার আলি শান্ত গলায় বললেন, মোকছেদ, তোমার পুতুল আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছে। মানুষ যখন নিজের কথা ছাড়া কিছুই শুনতে চায় না, তখন সে কাঠের পুতুলের মতোই হয়ে যায়।
মোকছেদ চাচা হেসে বললেন, কাঠের পুতুলের সমস্যা কি জানেন? ওরা নিজেরা নড়ে না, অন্যের সুতোয় নড়ে।
সেদিনের পর থেকে জব্বার আলি বদলে গেলেন। আগের মতো আর অহংকার করতেন না। গ্রামের মানুষের কথা মন দিয়ে শুনতেন।
আর মোকছেদ কারিগরের দোকানের সামনে নতুন একটা সাইনবোর্ড ঝুলল–‘এখানে কাঠের পুতুল বিক্রি হয়,
কিন্তু মানুষ যেন পুতুল না হয়!’