আনিস সাহেবের নাকের ডাক কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এটি একাধারে কামানের গর্জন, মালবাহী ট্রেনের ব্রেক কষার আওয়াজ এবং মেঘের ডাকের এক অপূর্ব ককটেল। বিয়ের আগে আনিস সাহেবের মা বলেছিলেন, ‘আমার ছেলেটা একটু নাক ডাকে বাবা, তবে মনটা বড় ভালো।’
বিয়ের প্রথম রাতেই আনিস সাহেবের স্ত্রী সুফিয়া বুঝতে পেরেছিলেন, ওই ‘একটু’ শব্দের গভীরতা কতখানি। বিয়ের পর প্রথম তিন মাস সুফিয়ার কেটেছিল সম্পূর্ণ ঘুমহীন অবস্থায়। আনিস সাহেবের নাক ডাকা শুরু হলেই সুফিয়ার মনে হতো, ঘরের ছাদ বুঝি এইমাত্র ভেঙে মাথায় পড়ল। বালিশচাপা দিয়ে, কানে তুলো গুঁজে, এমনকি বারান্দায় গিয়েও সেই শব্দের হাত থেকে রেহাই মেলেনি।
অতিষ্ঠ হয়ে সুফিয়া একদিন আনিস সাহেবকে বললেন, ‘তোমার এই নাকের ট্রেনের হর্ন বন্ধ না হলে আমি বাপের বাড়ি চলে যাব।’
আনিস সাহেব পড়লেন মহাফাঁপরে। তিনি পরিচিত ডাক্তার মন্টু বিশ্বাসের কাছে গেলেন।
মন্টু বাবু চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, ‘মিয়া ভাই, নাক ডাকা বন্ধের ওষুধ তো নেই। তবে একটা থেরাপি আছে। আজ থেকে ভাবিকে বলবেন, আপনি ঘুমানোর পর উনি যেন আপনার নাকের ডাক রেকর্ডিং করে শোনেন। সাইকোলজি বলে, নিজের স্বামীর আওয়াজ শুনলে নাকি স্ত্রীদের মন শান্ত হয়।’
আনিস সাহেব বাড়ি ফিরে সুফিয়াকে বুঝিয়ে রাজি করালেন। প্রথম রাতে সুফিয়া মোবাইলে আনিস সাহেবের সেই বিকট নাক ডাকা রেকর্ড করলেন। শব্দের তীব্রতায় মোবাইল ফোনটাই যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
পরদিন দুপুরে আনিস সাহেব যখন অফিসে, তখন সুফিয়ার ভীষণ ক্লান্তি লাগল। ভাবলেন একটু ঘুমাবেন, কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ তার আনিস সাহেবের সেই রেকর্ডিংটার কথা মনে পড়ল। রসিকতা করেই তিনি রেকর্ডিংটা চালু করলেন।
ঘরজুড়ে বেজে উঠল–ঘঁড়ড়ড়...ঘঁড়ড়ড়...ফুসসস!
কী অদ্ভুত কাণ্ড! তিন মাস ধরে যে শব্দ সুফিয়ার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, সেই শব্দ শোনার ঠিক দুই মিনিটের মাথায় তার চোখজোড়া ভারী হয়ে এল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সুফিয়া একদম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন!
আসলে গত কয়েক মাসে সুফিয়ার কান এই শব্দের সঙ্গে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে, এখন এই শব্দটাই তার জন্য ঘুমপাড়ানি গান হয়ে উঠেছে! এটা না শুনলে তার মস্তিষ্ক সিগন্যালই পাচ্ছিল না যে এখন ঘুমানোর সময় হয়েছে।
বিকেলে আনিস সাহেব অফিস থেকে ফিরে দেখলেন সুফিয়া পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন, আর পাশে মোবাইলে তখনও বাজছে–ঘঁড়ড়ড়...ফুঁসসস...
আনিস সাহেব অবাক হয়ে সুফিয়াকে ডেকে তুললেন। সুফিয়া চোখ ডলতে ডলতে বললেন, ‘ওগো, ডাক্তার বাবু ঠিকই বলেছেন! তোমার নাক ডাকার আওয়াজটা আসলে একটা মিউজিক। এটা শুনলে আমার এত চমৎকার ঘুম আসে যা কোনোদিন আসেনি!’
এর পর থেকে আনিস সাহেবের সংসারে শান্তি ফিরে এল। আনিস সাহেব যখনই অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে যান, সুফিয়া তখন ঘুমানোর জন্য কানে হেডফোন গোঁজেন। হেডফোনে তখন উচ্চশব্দে বাজতে থাকে আনিস সাহেবের সেই সিগনেচার টিউন– ঘঁড়ড়ড়...ঘঁড়ড়ড়...ফুঁসসস!
আর সুফিয়া মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।