ডেমরা গ্রামের এক অদ্ভুত ছেলে–নগেন। তবে অদ্ভুত বললে যেন কম বলা হয়! পুরো গ্রামে সে ‘পেটুক নগেন’ নামেই বেশি পরিচিত। ছোটবেলা থেকেই তার খাওয়ার প্রতি এমন এক অদ্ভুত টান ছিল যে, কেউ তাকে কখনো পেট ভরে খেতে দেখেনি–কারণ তার পেট যেন কখনোই ভরে না! গ্রামের লোকজন হাসতে হাসতে বলে, ‘নগেনের পেটটা বুঝি আলাদা কোনো গুদামঘর!’
নগেনের মা রোজই তার খাওয়ার জন্য হিমশিম খান। ভোরে উঠেই রান্নাঘরে ঢোকেন, আর নগেনও তার পেছনে পেছনে। ‘মা, আজ কী রান্না?’ এই প্রশ্ন দিয়ে তার দিন শুরু।
মা যখন বলেন, ‘ভাত, ডাল আর ডিম ভাজি,’ তখন নগেনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সমস্যা হলো, এক প্লেট খাওয়ার পরই সে বলে, ‘মা, আরেকটু দাও না!’ তারপর আবার, আবার–শেষ পর্যন্ত হাঁড়ি প্রায় খালি হয়ে যায়।
একদিন নগেনের বাবা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এই ছেলে, তুই কি মানুষ, না খাওয়ার মেশিন?’
নগেন তখন মাথা চুলকে হেসে বলল, ‘বাবা, খাওয়া আমার শখ না–এটা আমার প্রতিভা!’ তার এই উত্তর শুনে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল।
ডেমরা গ্রামে বছরে একবার বড় মেলা বসে। সেই মেলা মানেই খাওয়া-দাওয়ার ধুম–পান্তা-ইলিশ, খাসির মাংস, খিচুড়ি, জিলাপি, পায়েস–কী নেই সেখানে! মেলার খবর শুনেই নগেনের চোখ চকচক করে উঠল। সে ঠিক করল, এবারের মেলায় সে এমন খাওয়া খাবে, যেন সবাই তাকিয়ে থাকে।
মেলার দিন নগেন সকালে খুব কম খেয়ে বের হলো–কারণ সে জানে, সামনে বড় যুদ্ধ! মেলায় গিয়ে প্রথমেই সে ঢুকে পড়ল খাবারের সারিতে। এক প্লেট খিচুড়ি, তারপর আরেক প্লেট, তারপর গরম গরম ইলিশ মাছ–একটার পর একটা গিলতে লাগল। লোকজন থেমে থেমে তার খাওয়া দেখছে।
কেউ বলছে, ‘এটা তো ছেলে নয়, যেন একেবারে ঝড়!’ কেউ আবার মজা করে বলছে, ‘নগেনকে দিয়ে যদি ধান কাটানো যেত, তবে ফসলও শেষ হয়ে যেত!’
মেলার মাঝখানে ঘোষণা এল–খাওয়ার প্রতিযোগিতা হবে! যে সবচেয়ে বেশি খেতে পারবে, তাকে দেওয়া হবে বিশেষ পুরস্কার। নগেন তো শুনেই খুশিতে লাফিয়ে উঠল। সে নাম লেখাল প্রতিযোগিতায়।
প্রতিযোগিতা শুরু হলো। সামনে সাজানো নানা ধরনের খাবার। অন্য প্রতিযোগীরা দুই-তিন প্লেট খেয়েই হাঁপিয়ে উঠছে। কিন্তু নগেন যেন তখনো শুরুই করেনি! সে একের পর এক প্লেট শেষ করে যাচ্ছে–খিচুড়ি, খাসির মাংস, পায়েস, মিষ্টি–কিছুই বাদ নেই। বিচারকরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন।
শেষে যখন আর কেউ খেতে পারল না, নগেন তখনো খাচ্ছে। বাধ্য হয়ে বিচারকরা ঘোষণা দিলেন, ‘এই প্রতিযোগিতার বিজয়ী–পেটুক নগেন!’
চারদিকে হাততালি পড়ে গেল। নগেন পেল এক বিশাল মাটির হাঁড়ি ভর্তি রসগোল্লা।
নগেন খুশিতে আত্মহারা। হাঁড়ি বগলে নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছে। কিন্তু কিছু দূর যেতেই তার পেট গড়গড় করতে শুরু করল। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে রাস্তার পাশে বসে পড়ল। বন্ধুরা দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হলো?’
নগেন কষ্ট করে বলল, ‘মনে হয়… একটু বেশি হয়ে গেছে!’
বন্ধুরা হাসতে হাসতে বলল, ‘এই তো হলো, বেশি খাওয়ার ফল!’
কেউ তাকে পানি দিল, কেউ পাখা করতে লাগল। অনেকক্ষণ পরে নগেন একটু সুস্থ হলো।
সেদিনের পর থেকে নগেন একটু সাবধান হয়েছে। এখনো সে খেতে ভালোবাসে, কিন্তু আগের মতো এতটা নয়। মাঝে মাঝে কেউ মজা করে বললে সে হেসে বলে, ‘খাওয়ারও একটা সীমা আছে, সেটা বুঝতে হয়!’
তবে ডেমরা গ্রামের মানুষ এখনো গল্প করে–‘একসময় ছিল পেটুক নগেন, যার পেট ছিল যেন এক রহস্যময় গুদামঘর!’
সে এখনো মাঝে মাঝে মিষ্টির হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে হাসে–কিন্তু আর আগের মতো বেপরোয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে না।
তবু তার নামটা বদলায়নি–সে এখনো সবার প্রিয় ‘পেটুক নগেন’ হিসেবেই পরিচিত!