শাকপালা গ্রামের মানুষজন এমনিতেই একটু রসিক প্রকৃতির। এখানে কারও হাঁস ডিম কম দিলেও সেটা নিয়ে তিন দিন আলোচনা চলে। আর কোরবানির ঈদ এলে তো পুরো গ্রামটাই যেন হাসি-আনন্দের মেলায় পরিণত হয়!
গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত মানুষ সোনাই চাচা। গোলগাল চেহারা, মাথাভর্তি সাদা চুল আর বিশাল গোঁফ—দেখলেই মনে হয় তিনি গ্রামের চেয়ারম্যান না হলেও অন্তত হাসির মন্ত্রী। তবে নিজের বিষয়ে তার ধারণা আরও বড়। তিনি প্রায়ই বলেন,
–এই গ্রামে আমার মতো অভিজ্ঞ মানুষ আর দুইটা নাই!
এবার ঈদে সোনাই চাচা এক বিশাল বোম্বাই ষাঁড় কোরবানি দিলেন। গরুটা এত বড় ছিল যে, পাশের বাড়ির রফিক মিয়া বলল–চাচা, এই গরু তো দেখে মনে হয় হাইস্কুলের হেডমাস্টার!
কোরবানি শেষ হতে না হতেই শুরু হলো চামড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। সোনাই চাচা চামড়ার দিকে এমন নজরে তাকিয়ে আছেন, যেন ওটা সোনার খনি।
তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, চামড়া সাবধানে ধরো। গত বছর জব্বাররা ভাঁজ কইরা এমন অবস্থা করছে, মনে হইছিল পুরান বালিশের কভার!
পাশ থেকে রঞ্জু হেসে বলল–চাচা, চামড়া কি ইস্ত্রি কইরা রাখুম?
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
এদিকে গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা এল—চামড়া এতিমখানায় দিলে ভালো হয়। তখনই গ্রামের সবাই হঠাৎ দানবীর হয়ে গেল।
জব্বার বলল, আমি আমার চামড়া মাদ্রাসায় দিমু।
রঞ্জু বলল, আমি এতিমখানায়।
সোনাই চাচা গোঁফে হাত বুলিয়ে বললেন, আমি দুই জায়গাতেই দিতে চাই, কিন্তু গরু তো একটা!
আবারও হাসির ঝড় উঠল উঠানে।
এদিকে গ্রামের তিন দুরন্ত ছেলে লিটু, মিঠু আর সেন্টু—চুপিচুপি অন্য ফন্দি আঁটছিল। তারা ঠিক করল, চামড়া দিয়ে একটা ভূত বানাবে। সন্ধ্যার পর মানুষকে ভয় দেখানো হবে।
রাত নামতেই তারা বাঁশঝাড়ের পাশে চামড়াটা খুঁটির সঙ্গে টাঙিয়ে দিল। দূর থেকে দেখে সত্যিই মনে হচ্ছিল, কোনো আজব প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক তখন সোনাই চাচা টর্চ হাতে সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ টর্চের আলো চামড়ার ওপর পড়তেই তিনি থমকে গেলেন। চামড়ার ভেতর থেকে সেন্টু চাপা গলায় বলল, আমি চামড়ার আত্মা!
সোনাই চাচার মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ইন্নালিল্লাহ… চামড়ারও আবার আত্মা আছে নাকি!
তার পর এমন দৌড় দিলেন যে, স্যান্ডেল একদিকে আর লুঙ্গির গিঁট অন্যদিকে চলে গেল।
পরদিন সকালে পুরো শাকপালা গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল—সোনাই চাচা নাকি চামড়ার ভেতর ভূত দেখেছেন!
চায়ের দোকানে সবাই মজা নিচ্ছে।
রঞ্জু বলল–চাচা, ভূত কি চামড়ার দাম চাইছিল?
সোনাই চাচা এবারও গম্ভীর মুখে বললেন, ভূতটা খুব ভদ্র আছিল। আগে সালাম দিছে!
এই কথা শুনে দোকানের লোকজন এমন হেসে উঠল যে, এক লোকের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল!
শেষ পর্যন্ত লিটু, মিঠু আর সেন্টুর দুষ্টুমি ধরা পড়ে গেল। সোনাই চাচা প্রথমে রাগ দেখালেও পরে নিজেই হেসে বললেন, ঠিক আছে, তোদের জন্যই গ্রামের মানুষ দুই দিন হাসছে। এই হাসিরও কম দাম না!
তার পর চামড়াটা দান করে তিনি বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন। পশ্চিম আকাশে তখন নরম লাল আলো। গ্রামের রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ঈদের আনন্দ, আর মানুষের মুখে মুখে ভাসছে সেই বিখ্যাত কথা, চামড়ার ভেতরেও নাকি আত্মা আছে!