কিছু কিছু দিন এমন আসে, সবকিছু নিজের পক্ষে চলতে থাকে। বোলারের স্ট্যাম্পে ঢুকে পড়া বলও ব্যাটের কানায় লেগে চার হয়ে যায়। আমার এক বন্ধু এই ধরনের দিনকে বলে ঝাকানাকা দিন।
আজও এমন একটা দিন। কোনো কারণ ছাড়াই অফিস এক ঘণ্টা আগে ছুটি হয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিতে দিতে খেলা আর মুভি দেখা যাবে। কফি আসছে আবার সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে। বড় মামা পাঠাইছে। এমনিতে উনি প্রচণ্ড কিপটে। আমি চেয়েছিলাম ল্যাপটপ। আমি জানতাম ল্যাপটপ উনি জীবনেও দেবে না। ল্যাপটপ চাইলে দিতে পারে স্মার্টফোন। আর স্মার্টফোন না হলেও অন্তত আইপড, নইলে হেডফোন। নিয়ে এলো কফি। আমি কফি দেখে নীল আসমান থেকে পড়লাম।
— কফি ক্যান মামা? চাইছিলাম ল্যাপটপ।
— আমি তো ভাবছি এতদিনে তুই ল্যাপটপ নিয়ে ফেলছিস। কফি খেয়ে খেয়ে ল্যাপটপ চালাবি, সেই চিন্তা থেকেই কফি আনা।
কথা আসলেই সত্যি। আমি ল্যাপটপ নিয়ে নিছি অনেক আগে। মামার ল্যাপটপের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে ল্যাপটপ উঠে যাবে।
যাই হোক, বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে বসতেই দেখি কলিং বেল। দরজা খুলে দিতেই দেখি সীমা আন্টি, সঙ্গে তার বাচ্চা। সীমা আন্টি আসছে সমস্যা নাই। হাতে দেখি আইসক্রিমের বক্স, এটাও একটা আশার কথা। ভয় লাগছে বাচ্চাটাকে দেখে। বাচ্চা দেখলে আমার এমনিতেই ভয় লাগে। আমার সঙ্গে সব সময় বিপজ্জনক-টাইপ বাচ্চাগুলোই পড়ে। একবার একটা সুপারশপে খুব কিউট দেখতে একটা বাচ্চাকে গাল টেনে আদর করে জিজ্ঞাসা করছিলাম, বাবু তোমার নাম কী?
উত্তরে সে বলেছিল, যা কুটতা!
পাশে আরেকটা মেয়ে বলেছিল, দেখেছিস কী কিউট করে কুত্তা ডাকছে!
আরেকবার একটা বিয়েতে এক বাচ্চা আমার কোলে গরম খাসির রেজালা ফেলে দিয়েছিল। সেই ঘটনা থেকে বিয়েতে খাসির রেজালা দেখলেই ভয় লাগে।
আর কীভাবে জানি আমাদের বাসায় সব লেজবিশিষ্ট বাচ্চারা এসে হাজির হয়। শেষ সবচেয়ে যে ভদ্র বাচ্চাটা এসেছিল, আমার ঘাড়ে সে থাবড়া দিয়ে বলেছিল, দোস্ত নাকি?
আজকের এই বর্ণালি ঝাকানাকা দিনটা কেমন যাবে কে জানে!
সীমা আন্টি আর তার বাচ্চা ড্রয়িংরুমে বসাতে আমি আমার রুমে গিয়ে টিভি ছেড়ে দিলাম। একটু পর দেখি বাচ্চাটা গুটি গুটি পায়ে এসে হাজির। আমি কিছুক্ষণ তাকে আন্দাজ করলাম। দেখে শান্তই মনে হচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম, নাম কী তোমার?
সে চুপ করে রইল। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম। কী নাম বাবু তোমার?
সে বলল, খবরদার। চুপ!
আমি আসলেই চুপ হয়ে গেলাম। এ কেমন শিশু?
আমি একদম চুপচাপ রইলাম। সে নিজেও চুপ হয়ে গেল।
দুজনেই চুপচাপ। একটু পর সে চলে গেল। ফিরে এলো একটা কেক নিয়ে। কেক দিয়েছে নিশ্চয় আম্মা। সে অল্প একটু খেলো, বাকিটা আমার বিছানায় ফেলল। আমি আপত্তি জানাতেই সে আবার সেই ডায়ালগ শুনিয়ে দিল, খবরদার। চুপ!
একটু পর বাংলাদেশের অবস্থা দেখে আমি টিভি অফ করে ল্যাপটপ ছেড়ে বসলাম। স্পাইডারম্যানকে ঘরে নিয়ে আসি। সে বাচ্চা আমার পাশে বসে কিবোর্ড গুঁতাগুঁতি করতে লাগল। আমি যতই তারে ঠেলি, সে যায় না। আবার কিছু বলতেও পারছি না। ভ্যাঁ করে কেঁদে দেবে।
‘যাও কেক নিয়ে আসো আরেকটা।’ তাকে শান্তি প্রস্তাব দিলাম।
ভাবলাম কেক আনতে গিয়ে ড্রয়িংরুমে আটকা পড়লে বাঁচা যেত।
— কেক খাই না। তুমি যাও কেক নিয়ে আসো।
আমি মনে মনে বললাম, কাম সারছে!
একটু পর বাচ্চা আমার কোলে উঠে বসতে চাইল। ভাবলাম একটু কড়া হই।
— যাও নামো। আমার কাজ আছে।
‘কী কাজ?’ সে খুব অবাক।
— আমি মুভি দেখব।
‘আমিও তোমার সঙ্গে দেখব।’ পাক্কা বুড়ি একটা।
‘না, এটা বড়দের সিনেমা!’ আমি তখনো জানি না কী ভুলটা করছি।
সে একটু পর চলে গেল। ড্রয়িংরুমে গিয়ে সে সীমা আন্টিকে বলে বসল, ওই ভাইয়াটা আমাকে বসতে দিচ্ছে না। ও নাকি বড়দের সিনেমা দেখছে!
সীমা আন্টি যাওয়ার পর আম্মা আমার রুমে এসে হাজির।
— দেখি, ল্যাপটপে কী দেখতেছিস।
আমি আম্মার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। বলে কী? জীবনেও এসে এ কথা বলে নাই।
— কী দেখতেছি মানে?
— তুই নাকি বড়দের মুভি দেখতেছিস। সীমার মেয়ে বলল।
আমার লাল হয়ে গেল কান দুটো।
— আরে স্পাইডারম্যান দেখতেছি।
— তা হলে ওই মেয়ে ওটা বলল কেন?
আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল, আরে আমি কী জানি? ওগুলো এডিট করা যায়।
‘আজেবাজে জিনিস দেখা ছাড়!’ আম্মা রুম থেকে চলে গেল।
পরদিন ভার্সিটি যাওয়ার সময় গেটের সামনে গিয়ে দেখি একটা সাইনবোর্ড লাগানো।
— অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন।
আমি আমাদের দারোয়ানকে ডাকলাম।
— এটা কে লাগিয়েছে সিরাজ ভাই?
— বাড়িওয়ালা লাগাইছে।
বাড়িওয়ালাকে বলবেন আরেকটা বোর্ড লাগাইতে। অতিথির বাচ্চা বাইরে রাখুন।
সিরাজ ভাই আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। যেভাবে আমাদের বোলাররা বিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের দিকে তাকিয়ে থাকে।