বাইকটা থেমে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি রিজার্ভে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, চল ভাই, আরেকটু সহ্য করো। তেল পেলে তোমাকেই আগে খাওয়াব।
দেশে তেলের সংকট চলছে কয়েকদিন ধরে, এই খবর আগে কাগজে পড়তাম। এখন নিজের জীবনে লাইভ টেলিকাস্ট দেখছি। আমি গ্রামে থাকি। আমাদের বেলেশ্বর বাজার যেন একসময় তেলের স্বর্গরাজ্য ছিল। ৮-১০টা দোকান, সবাই পেট্রল, অকটেন বিক্রি করত। আজ গেলাম, দেখি সব দোকানদার এমন মুখ করে বসে আছেন যেন কেউ তাদের কাছ থেকে ধার চাইতে এসেছে।
এক দোকানে গিয়ে বললাম, ভাই একটু তেল হবে?
দোকানদার আমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে মাথা নাড়ল, যেন আমি চাঁদ চেয়েছি।
পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে বলল, তেল আছে, দিচ্ছে না। ডাবল দাম নিচ্ছে।
আমি মনে মনে বললাম, ডাবল কেন, ট্রিপল নিলেও চলবে! শুধু এক লিটার দাও! কিন্তু মুখে কিছু বললাম না। কারণ আমার সচেতন নাগরিক ইমেজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বন্ধুরা তো আগেই সাবধান করেছে, তুই বেশি সৎ মানুষ, তোকে দেবে না। ভয় পায় তুই আবার আন্দোলন করে বসিস যদি!
আমি ভাবলাম, বাহ! আমি না হয় তেল পাই না, কিন্তু সমাজে আমার একটা সম্মান তো আছে!
বাধ্য হয়ে গেলাম গাজনা বাজারে, অফিসের কাছেই। ভাবলাম, এখানে নিশ্চয়ই পাব। গিয়ে দেখি একই দৃশ্য। সব দোকান যেন তেল নেই নাটকের মহড়া দিচ্ছে। এক দোকানদার তো এমন অভিনয় করল, মনে হলো আমাকে তিনি চেনেনই না।
শেষমেশ মন খারাপ করে স্কুলে গেলাম। সারা দিন ক্লাস নিলাম, কিন্তু মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—বাইকটা কি বাড়ি পর্যন্ত যাবে?
বিকেলে ঠিক করলাম, উপজেলা শহরে যাই। সেখানে চারটা পাম্প আছে, একটা না একটায় তেল পাবই। আশা নিয়ে গেলাম, আর গিয়ে দেখি চারটা পাম্পেই বড় বড় করে লেখা, পেট্রল নাই, অকটেন নাই।
মনে হলো যেন আমার জন্যই লিখে রেখেছে। আর প্রত্যেকটা পাম্পে কয়েক শ রাইডার বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কখন পেট্রল আসবে, কখন পেট্রল পাবেন সেই অপেক্ষায়। মনে হয় দেশটা স্থবির হয়ে গেছে। আর কয় দিন এমন হলে কী হবে ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। মনে হয় তেলের জন্য যুদ্ধ না লাগে। যাক সেসব কথা। আবার পাম্পের কথায় আসি।
একটা পাম্পে আমার ছাত্র ম্যানেজার। মনে একটু আশার আলো জ্বলল। গোপনে ডাক দিয়ে বললাম, দেখ বাবা, কোনোভাবে এক লিটার তেল ম্যানেজ করা যায়?
ছাত্রটা এমনভাবে তাকাল, যেন আমি তাকে পরীক্ষায় নকল করতে বলেছি। বলল, স্যার, লজ্জা দেবেন না। তেল থাকলে আপনাকে কি ফিরাতাম?
আমি মনে মনে বললাম, বাহ! ছাত্রও এখন নৈতিকতার ক্লাস নিচ্ছে!
হাল ছেড়ে দিয়ে বাইক স্টার্ট দিলাম। ভাবলাম, যতদূর যায় যাক। উপজেলা থেকে আমার বাড়ি আট কিলোমিটার। দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর বাইকটা হঠাৎ থেমে গেল ঠিক সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের মতো।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারপাশ অন্ধকার। আমি আর আমার বাইক, দুজনেই দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু বাইক আর এক ইঞ্চিও নড়বে না।
শেষমেশ বাইক ঠেলতে শুরু করলাম। তখন বুঝলাম, বাইক চালানো আর বাইক ঠেলা, দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ের ওপর পিএইচডি করা দরকার। ঘাম এমনভাবে পড়ছে, মনে হচ্ছে আমি কোনো জিমে ট্রেনিং নিচ্ছি।
মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে, এই কথাটা আগে শুধু প্রবাদ হিসেবে জানতাম, আজ বাস্তবে প্রমাণ পেলাম। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, বাইকটা যদি কথা বলতে পারত, বলত, তুই এতদিন আমাকে চালিয়েছিস, আজ একটু তুই চল!