টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলায় তামাক চাষ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফসলি জমির ওপর এই চাষে কৃষকরা লাভবান হলেও এটি তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তামাক চাষের জন্য কৃষকরা সরকারি অনুমতি না নিয়ে এই চাষে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে ‘কারগিল’ নামে সার ব্যবহারের কারণে কৃষক পরিবারের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হচ্ছে। তা ছাড়া ফসলি জমির উর্বরতা কমছে। এটি আগামীতে খাদ্য উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করবে।
জেলায় তামাক চাষের বিষয়টি নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উদাসীন। তারা জানাচ্ছে, তামাক চাষের সম্পর্কে তাদের কোনো তথ্য নেই। টাঙ্গাইলের বেশ কিছু অঞ্চল যেমন ভূঞাপুর, কালিহাতী, নাগরপুর, টাঙ্গাইল সদর, দেলদুয়ার ও অন্যান্য এলাকায় ব্যাপকভাবে তামাক চাষ হচ্ছে। বিশেষত ভূঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর ও নাগরপুর উপজেলায় তামাক চাষের পরিমাণ বেশি।
বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি, যেমন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি এবং জাপান টোব্যাকো কোম্পানি কৃষকদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করছে। তারা কৃষকদের বীজ, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করছে। তামাকচাষি আমির আলী, হারেছ মিয়া, শুকুর মামুদসহ অনেক কৃষক জানান, কোম্পানি প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ করে এবং উৎপাদিত তামাক পাতা তারা কিনে নেয়।
এ ছাড়া এক কৃষক জব্বার মিয়া জানান, তিনি ৮ বছর তামাক চাষ করছেন। এতে অন্যান্য ফসলের তুলনায় দ্বিগুণ লাভ হচ্ছে। তবে তামাক চাষের মাধ্যমে শরীর ও পরিবেশের ক্ষতি হলেও লাভের পরিমাণ বেশি হওয়ায় তিনি তামাক চাষ অব্যাহত রেখেছেন। কোম্পানি দাম নির্ধারণ করে, আর বাইরের কেউ তামাক কিনে না।
টাঙ্গাইলের তামাক চাষে সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তারা দাবি করেছেন, তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন।
পরিবেশ উন্নয়নকর্মী সোমনাথ লাহিড়ী জানান, তামাক চাষে যুক্ত কৃষক পরিবারের সদস্যরা মারাত্মক নিউরো-টক্সিক প্রভাবের শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় এর প্রভাব শরীরে থেকে যায়। তা ছাড়া তামাক চাষে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে তামাক চাষের অনুমতি নেওয়ার বিধান থাকলেও টাঙ্গাইলে তামাক চাষে কোনো অনুমতি নেওয়া হয় না।
এ ছাড়া ক্রয়কারী কোম্পানিগুলো কৃষকদের দাদন (অগ্রিম টাকা) দিয়ে তাদের তামাক চাষে উৎসাহিত করে। ফলে কৃষকরা না বুঝে তাদের জমি ও জীবনের চরম ক্ষতি করছেন। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে কৃষকদের মধ্যে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং তামাকজাত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা জরুরি।
ডা. জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন তামাক চাষে যুক্ত থাকলে ক্যানসার, পেটের সমস্যা, ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা, চর্ম সমস্যা, বুক ও ঘাড়ে ব্যথা ইত্যাদি নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তামাকচাষিদের সন্তানদের মধ্যে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিন্ড্রোম’ নামে এক জটিল রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আশেক পারভেজ বলেন, সরকারিভাবে তামাক চাষের কোনো নির্দেশনা না থাকায় তারা এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেন না। তবে তিনি মনে করেন, তামাক চাষের বিরোধিতা করতে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে টাঙ্গাইলে তামাক চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক হলেও এটি তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য সরকারের তৎপরতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন।