মেহেরপুরে জ্বালানি তেলের সংকটে বন্ধ গম কাটা হারভেস্টার মেশিন। মাঠের পাকা গম কেটে ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা। ফিলিং স্টেশনে তেলের সরবরাহ না থাকায় ডিজেলের অভাবে হারভেস্টার নামছে না জমিতে। যার ফলে কৃষি খাতে কার্যত স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
ঝড়-বৃষ্টিতে নুয়ে পড়া পাকা গম ঘরে তুলতে না পেরে কৃষকদের চোখে এখন শুধুই ক্ষতির হিসাব। জেলার মোট ১৭টি ফিলিং স্টেশন থেকে মিলছে না পর্যাপ্ত তেল। দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে ফিলিং স্টেশনগুলো। ডিজেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে কনটেইনার ও ড্রাম হাতে দীর্ঘক্ষণ লাইনে অপেক্ষা করছেন কৃষকরা। তবুও মিলছে না তেল।
কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন তেল দিলেও তা হারভেস্টার মেশিন চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। গম কাটতে না পারার পাশাপাশি জ্বালানি তেল সংকটের প্রভাব পড়েছে ধানের জমিতে সেচ কাজের ওপরে। সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় জমিতে পানির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
ফিলিং স্টেশন ও ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, একদিকে ডিপো থেকে তেল পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বিপাকে পাম্পমালিকরা। বর্তমানে ডিপো থেকে প্রতিটি পাম্পে সর্বোচ্চ ৩ হাজার লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়েই প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫ হাজার লিটার। অন্যদিকে ডিজেল না থাকায় অধিকাংশ হারভেস্টার মেশিন বন্ধ রয়েছে। তবে কালোবাজারি পথে কিছু কিছু হারভেস্টার মেশিন মালিক তেল কিনে মাঠে নামছে। তারা স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে গম কাটতে। বিঘাপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে, যেখানে গত বছর এই খরচ ছিল ২ হাজার টাকা।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মেহেরপুরে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার হেক্টর জমিতে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ হাজার ৫৬৬ টন, যেখানে প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন ধরা হয়েছে ৪.১ টন।
সদর উপজেলার কুলবাড়ীয়া মাঠের কৃষক আহসানুল হক বলেন, ঈদের আগেই আমার গম কাটার উপযোগী হয়েছিল। কিন্তু মেশিন না পাওয়ায় কাটতে পারিনি। এখন মেশিন না পেলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসবে। গম কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় না। এখন সবাই হারভেস্টার মেশিনের ওপর নির্ভরশীল।
গাংনী উপজেলার হাড়াভাঙ্গা মাঠের কৃষক জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক ঘোরাঘুরির পর হারভেস্টার মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বেশি টাকা নিয়ে গম কেটে দিয়েছে। ডিজেল না থাকায় মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না দাবি করে হারভেস্টার মেশিন মালিক বিঘাপ্রতি এক হাজার টাকা বেশি নিচ্ছে।
একই মাঠের আরেক কৃষক জাকির হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করছি। এমন পরিস্থিতিতে কোনো দিন পড়তে হয়নি। মাঠে পাকা ফসল পড়ে রয়েছে ঘরে তুলতে পারছি না। রাতে দুশ্চিন্তায় ঠিকমতো ঘুম আসে না।
হারভেস্টার মেশিন মালিক সাহাদত হোসেন বলেন, তেল না থাকলে মেশিন চালানো সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে বেশি দামে মজুতদারদের কাছ থেকে তেল কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বেশি খরচের কারণে কৃষকদের কাছ থেকেও বেশি টাকা নিতে হচ্ছে, যা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ছেন তারা।
আরেকজন হারভেস্টার মেশিন মালিক রজব আলী বলেন, তেল পাম্প থেকে ডিজেল না পাওয়ায় দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে আমার হারভেস্টার মেশিন। কনটেইনার হাতে করে পাম্পে যাই আর ঘুরে আসি। তেল মিলছে না।
মেসার্স কিবরিয়া ফিলিং স্টেশনের পরিচালক কিবরিয়া হোসেন বলেন, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছি না। যেটুকু বরাদ্দকৃত ডিজেল আসছে সেগুলো প্রশাসনের সহযোগিতায় কৃষকদের দিয়ে দিচ্ছি। চাহিদার তুলনায় যোগান কম থাকায় অনেক কৃষক পাচ্ছে না।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সঞ্জীব মৃধা বলেন, তেলসংকটে চলমান পরিস্থিতি কৃষকদের সমস্যার মধ্যে ফেলেছে। মাঠজুড়ে পাকা গম নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা চেষ্টা করছি যতটুকু তেল আসছে সেগুলো যাতে কৃষকরা পায়। কালোবাজারি না হলে আশা করছি এই সমস্যার সমাধান হবে।