একবিংশ পর্ব
এই তো মা। কিছুক্ষণ আগে।
ঘুম আসছে না?
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছে। আর ঘুম আসছে না।
আনোয়ারা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বললেন, কী নিয়ে ভাবছিস বল তো!
রাতে আরেফিনকে স্বপ্নে দেখলাম। তার পর থেকে আর ঘুম আসছে না।
দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে আনোয়ারা বেগম বললেন, সবই কপাল মা! কথায় আছে না, বিধিলিপিতে যা লেখা আছে তা কেউ খণ্ডাতে পারে না! তোর আর আমার বিধিলিপি হয়তো এভাবেই লেখা হয়েছে! কী আর করা! মন খারাপ করিস না মা। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। আল্লাহ হয়তো এর মধ্যেই ভালো কিছু রেখেছেন।
কী জানি। আর ভালো লাগছে না মা। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকাই অর্থহীন।
মোহিনীর এই ভাবনা আর তার নিজের ভাবনার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তিনিও কদিন ধরে এমনটিই ভাবছিলেন। তবে তার একমাত্র সান্ত্বনা হচ্ছে মোহিনী। মোহিনীর কারণেই তিনি বেঁচে আছেন। মোহিনীর পাশে থাকার জন্যই তিনি বেঁচে থাকবেন। কিন্তু আনোয়ারা বেগম সে কথা আর মোহিনীকে বলতে চান না। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন। মোহিনীও দুর্ভাবনাগুলো দূরে সরিয়ে মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আরেফিন নামক পোকা তার মাথার মধ্যে কেবল ঘুরপাক খায়।
১৫
লিয়াকত খান আয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান। নব্য ধনীদের একজন তিনি। ঢাকা শহরে বিপুল সংখ্যক উঁচু উঁচু ভবন করেছেন তিনি। শহরের প্রতিটি প্রান্তেই আয়ন বিল্ডার্সের ভবন চোখে পড়ে। নব্বইয়ের দশকে ছোট ভাই আজমল খানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আয়ন সাইন নামে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা খোলেন। খুবই অল্প পুঁজি। বেশির ভাগ কাজ করতেন হাত লোন নিয়ে। তিনি মূলত কাজ করতেন সিটি করপোরেশনের সঙ্গে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রাইম লোকেশনে সাইন বোর্ডের জায়গা কিনে রাখতেন। তার পর সেগুলো ছোট-বড় সংস্থার কাছে বিক্রি করতেন। এই করে করেই এগিয়ে চলেন তিনি। তার পর কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। ইসলামপুরে ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে কাপড় বিক্রি শুরু করেন। এভাবেই তার শুরু। তার পর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেন তিনি। ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না তিনি। সারাক্ষণ ব্যবসার পেছনে ছুটে চলা। একেবারে ধ্যানজ্ঞান যাকে বলে! টাকা বানাতে হবে। অনেক বড় ব্যবসায়ী হতে হবে। এটাই তার মূল লক্ষ্য। এর কারণও অবশ্য আছে। তিনি যখন বিজ্ঞাপনী সংস্থা খোলেন তখন তার হাতে কোনো টাকা ছিল না। তিনি ব্যাংক লোনের জন্য অনেক ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ব্যাংকই তাকে লোন দিতে রাজি হয়নি। কারণ ব্যাংক লোন নিতে হলে কাউকে না কাউকে গ্যারান্টার হতে হয়। কিন্তু ঢাকা শহরে গ্যারান্টার করার মতো কেউ ছিল না তার। কোনো জমিও নেই যে, তা মর্টগেজ দিয়ে লোন নেবেন। সঙ্গত কারণেই তাকে স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করতে হয়।
দিনে দিনে লিয়াকত খানের ব্যবসা প্রসার লাভ করে। পুঁজি বাড়তে থাকে। ব্যাংকও অতি উৎসাহী হয়ে তার কাছে এগিয়ে আসে। ব্যাংকের সহায়তায় তিনি ডেভেলপার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথমে পুরান ঢাকায় তার এক পরিচিত লোকের জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করেন। সেটা ২০০০ সালের ঘটনা। এটাই তার ভাগ্য বদলে দেয়। তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন এমন অবস্থা, বিভিন্ন ব্যাংকের এমডি-চেয়ারম্যানরা তার কাছে এসে বসে থাকে।
লোকে বলে, হাতে পয়সা এলে নাকি বুদ্ধি খোলে। লিয়াকত খানের বুদ্ধিও নানা দিকে খুলতে শুরু করে। তিনি ডেভেলপারের কাজের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন প্রান্তে জমি কিনে রাখেন। সেই জমির পরিমাণও এখন কয়েক শ একর। ব্যবসাও মাশাল্লাহ ফুলেফেপে অনেক বড় হয়েছে। এখন ব্যবসা না করলেও কয়েক পুরুষ বসে খেতে পারবে। কিন্তু বিপদ কি আর বলেকয়ে আসে? হঠাৎ তার বনানীর একটি বহুতল ভবনে আগুন লাগল। সেই ভয়াবহ আগুনে ভবনের ওপরের কয়েকটি তলার আসবাবপত্র পুড়ে ছাই। আগুনের হাত থেকে বাঁচতে কেউ কেউ লাফিয়ে পরে মারা গেল। আগুনে পুড়ে এবং ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা গেল আরও কয়েকজন মানুষ। সেই আগুন নিয়ে গণমাধ্যমে শুরু হলো একের পর এক রিপোর্ট। তাতে বলা হলো, যে যেভাবে পারছে রিপোর্ট করছে।
লিয়াকত খান পাগলের মতো ছোটাছুটি করছেন। পত্রিকার সম্পাদকদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ সহায়তা করলেও পুরো গণমাধ্যম যেন নিয়ন্ত্রণহীন। ভয়ংকর এক পরিস্থিতির মধ্যে তিনি রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। সেই সময় তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ান আসিফ আহমেদ। তিনি তার পত্রিকায় গঠনমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তিনি স্রোতে গা ভাসাননি। তার পত্রিকার রিপোর্টগুলোতে কোনোরকম বাড়াবাড়ি ছিল না। ইচ্ছাকৃত কোনো চমকও ছিল না। তিনি সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে আগুনের বিষয়ে সত্যনিষ্ঠ রিপোর্ট করাতে লিয়াকত খানের বিপদ কিছুটা কাটে। তার ধারণা হয়, আসিফ আহমেদ বিপদে তার পাশে ছিলেন।
বিপদে না পড়লে লিয়াকত খান বুঝতেই পারতেন না কে বন্ধু, আর কে শত্রু। তাছাড়া তিনি এটাও বুঝতে পারলেন, শুধু টাকা থাকলেই হবে না। এই জমানায় টিকে থাকতে হলে মিডিয়া খুব দরকার। তিনি একবার আসিফ আহমেদকে চায়ের নিমন্ত্রণ করলেন। চা খেতে খেতে তারা নানা বিষয় নিয়ে কথা বললেন। একপর্যায়ে লিয়াকত খান তার কাছে পত্রিকা করার বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন। আসিফ আহমেদ পত্রিকার ভালো-মন্দ নানা দিক ব্যাখ্যা করলেন। কীভাবে কী করতে হবে সে বিষয়েও বিস্তারিত জানালেন। সবকিছু শোনার পর তিনি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই সময় তার পত্রিকা করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। বুড়িগঙ্গায় গড়িয়েছে অনেক জল। আরও কিছু উটকো বিপদ লিয়াকত খানের ঘাড়ে চেপেছে। সেই সব বিপদ থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করেন তার এক ব্যবসায়িক বড় ভাই। সেই বড় ভাইয়ের কথা তিনি মান্য করেন।
একদিন লিয়াকত খান তার সেই বড় ভাই জানে আলমের বাসায় গেলেন। তার কাছে তার পত্রিকা করার আকাঙ্ক্ষার কথা জানালেন। তিনিও লিয়াকত খানের সঙ্গে একমত হলেন। তিনি বললেন, সত্যি বলেছ। এখনকার জমানায় পত্রিকা হাতে না থাকলে টিকে থাকা যাবে না। তোমার টাকা আছে। তুমি পত্রিকা করো। আর শোন, আমার পরিচিত একজন সাম্বাদিক আছে। সে খুব বড় মাপের সাম্বাদিক।
জানে আলম সাংবাদিক বলতে পারেন না। তিনি সব সময়ই সাম্বাদিক বলেন। তিনি একজন সাংবাদিকেই চেনেন। তার নাম হাবিবুর রহমান। তিনি নাকি জানে আলমকে একবার সহায়তা করেছিলেন। সেই সহায়তায় তার খুব কাজ হয়েছিল। সেই থেকেই তিনি হাবিবুর রহমানকে বেশ গুরুত্ব দেন। হাবিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বেকার। তার চাকরির খুব দরকার। তিনি জানে আলমের কাছে চাকরি চেয়েছেন। জানে আলম তাকে আশ্বাস দিয়েছেন। সময় সুযোগমতো তার জন্য ব্যবস্থা করবেন। লিয়াকত খান পত্রিকার কথা বলতেই তার হাবিবুর রহমানের কথা মনে পড়ল। তাকে তিনি ডেকে পাঠালেন। লিয়াকত খানের সঙ্গে পরিচয় করালেন। তার পর বললেন, হাবিব সাহেব খুব বড় সাম্বাদিক। তাকে সম্পাদক বানাও। দেখবে, সে অনেক ভালো করবে।
লিয়াকত খান বড় ভাইয়ের কথামতো পত্রিকা করলেন। পত্রিকার নাম আজকের বার্তা। অনেক প্রচার-প্রচারণা চালালেন। কিন্তু পত্রিকাটা বাজার ধরতে পারল না। পত্রিকার পেছনে তার বিপুল খরচ। অথচ কোনো আয় নেই। বাজার পায়নি বলে কেউ বিজ্ঞাপনও দেয় না। এর মধ্যে লিয়াকত খান প্রেসসহ আরেকটি বাংলা পত্রিকা কিনেছেন। তার নাম খবর প্রতিদিন। এই পত্রিকাটি তিনি করতে চান। তিনি আসিফ আহমেদকে বলে রেখেছেন। পত্রিকা করলে তাকে দিয়েই করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু করোনার কারণে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারছেন না।
হঠাৎ একদিন লিয়াকত খান আসিফ আহমেদের মোবাইলে ফোন দিলেন। বললেন, ভাইজান কেমন আছেন?
চলবে...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০