অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার বা ওসিডি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেখানে একজন ব্যক্তি বারবার অবাঞ্ছিত চিন্তা (অবসেশন) এবং তা দূর করতে বাধ্যতামূলক আচরণ (কম্পালশন) করে থাকেন। এই অবস্থা একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কাজকর্ম ও সামাজিক মেলামেশায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে যথাযথ চিকিৎসা পেলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ওসিডি কী?
ওসিডি এমন এক মানসিক সমস্যা যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি বারবার অবাঞ্ছিত ভাবনা, ভয় বা সন্দেহে ভোগেন এবং সেই চাপ থেকে মুক্তি পেতে কিছু নির্দিষ্ট কাজ বারবার করেন। যেমন বারবার হাত ধোয়া, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, তালা ঠিক আছে কিনা তা বারবার পরীক্ষা করা ইত্যাদি। এই সমস্যা সাধারণভাবে দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) হলেও সময়ের সাথে এর লক্ষণ কখনো বাড়ে, কখনো কমে যায়।
অনেকেই মাঝে মাঝে কিছু বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন বা কিছু বিষয় পুনরায় যাচাই করেন — যেমন চুলা বন্ধ করেছেন কিনা। কিন্তু ওসিডি একধরনের চরম অবস্থা, যেখানে এই দুশ্চিন্তা ও আচরণ দিনের অনেকটা সময় নিয়ে নেয় এবং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে বিঘ্ন ঘটায়।
ওসিডির লক্ষণ
ওসিডির দুটি প্রধান উপসর্গ হলো —
১. অবসেশন বা অবাঞ্ছিত চিন্তা
এসব চিন্তা অযাচিত, বিরক্তিকর এবং দুশ্চিন্তাজনক। আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারেন এগুলো অস্বাভাবিক, কিন্তু তা সত্ত্বেও থামাতে পারেন না। উদাহরণ —
• জীবাণু বা ময়লা নিয়ে অতিরিক্ত ভয়
• নিজে বা অন্য কাউকে ক্ষতি করার ভয়
• ধর্মীয় বা যৌন বিষয়ে অবাঞ্ছিত চিন্তা
• নিখুঁতভাবে সব কিছু সাজিয়ে রাখার প্রবনতা
• বারবার সন্দেহ করা বা ভুল হবে মনে হওয়া
২. কম্পালশন বা বাধ্যতামূলক আচরণ
এই চিন্তাগুলো থেকে মুক্তি পেতে আক্রান্ত ব্যক্তি কিছু কাজ বারবার করে থাকেন। যদিও এসব কাজ তারা করতে চান না, তবুও মনে হয় না করলেই অশুভ কিছু ঘটবে। উদাহরণ —
• বারবার হাত ধোয়া বা পরিষ্কার করা
• তালা, সুইচ বা দরজা বারবার পরীক্ষা করা
• জিনিস নির্দিষ্টভাবে সাজানো
• নির্দিষ্ট সংখ্যা গোনা, কিছু নির্দিষ্ট শব্দ বা দোয়া বারবার বলা
• অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে রাখা (হোর্ডিং)
• জীবাণু আছে এমন জায়গা এড়িয়ে চলা, যেমন: দরজার হাতল
ওসিডির কারণ কী?
ওসিডি কেন হয় তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে গবেষণায় কিছু কারণ উঠে এসেছে —
• জেনেটিক বা বংশগত প্রভাব: পরিবারের কারও যদি ওসিডি থাকে, তবে অন্য সদস্যেরও ঝুঁকি বাড়ে।
• মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপ্রণালী: ওসিডি আক্রান্তদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশে পার্থক্য দেখা যায়।
• শৈশবের ট্রমা: শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এই রোগের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।
• স্ট্রেপ ইনফেকশন (PANDAS): কিছু শিশুদের ক্ষেত্রে গলা ব্যথা বা স্কারলেট জ্বরের পর হঠাৎ ওসিডি-এর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ওসিডি কিভাবে শনাক্ত করা হয়?
ওসিডি নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা বা স্ক্যান নেই। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও মানসিক ইতিহাস বিবেচনা করে এই রোগ নির্ধারণ করেন। আমেরিকার “ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডার (DSM-5)” অনুসারে —
• অবসেশন বা কম্পালশন থাকতে হবে
• এই উপসর্গ দিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টা সময় নেয়
• দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন ঘটায়
• উপসর্গ অন্য রোগ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়
• উপসর্গ অন্য মানসিক রোগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না
ওসিডির চিকিৎসা
ওসিডির সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো মনের চিকিৎসা (সাইকোথেরাপি) এবং ওষুধ। কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (TMS) ব্যবহার করা হয়।
১. সাইকোথেরাপি
কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি (CBT): নেতিবাচক চিন্তা ও অভ্যাস চিহ্নিত করে তা পরিবর্তনে সহায়তা করে।
এক্সপোজার অ্যান্ড রেসপন্স প্রিভেনশন (ERP): ভয় বা দুশ্চিন্তার উৎসের মুখোমুখি করে আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়।
অ্যাকসেপটেন্স অ্যান্ড কমিটমেন্ট থেরাপি (ACT): চিন্তাগুলোকে মেনে নিয়ে তা নিয়ে না লড়াই করে জীবনে অগ্রসর হতে শেখায়।
২. ওষুধ
ওসিডির চিকিৎসায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসএসআরআই (SSRI) জাতীয় ওষুধ ব্যবহৃত হয়। এসব ওষুধ দুশ্চিন্তা ও অবসেশন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে আছে ফ্লুউক্সেটিন, ফ্লুভক্সামিন, পারোক্সেটিন, সেরট্রালিন ইত্যাদি। এসব ওষুধের কার্যকারিতা দেখা যেতে ৮–১২ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
উপসংহার
ওসিডি একটি গুরুতর কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যা। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু করলে আক্রান্ত ব্যক্তি একটি স্বাভাবিক ও অর্থবহ জীবন যাপন করতে পারেন। পরিবার ও সমাজের সচেতনতা ও সহানুভূতিই একজন ওসিডি রোগীর মানসিক সুস্থতার জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক


