যাদের আগে একটি সন্তান সিজারের মাধ্যমে হয়েছে, তারা পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক প্রসব করার জন্য সক্ষম থাকেন। ছবি এআই
অনেকেরই ধারণা, একবার সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারি হলে পরবর্তী প্রতিবার গর্ভধারণ করলে সিজার করার দরকার হয়। আমেরিকান প্রেগন্যান্সি অ্যাসোসিয়েশনের রিপোর্ট অনুযায়ী সিজারিয়ান ডেলিভারির পরও ৯০ শতাংশ মা পরবর্তী সময়ে নরমাল বা স্বাভাবিক প্রসব করতে পারেন। এদের মধ্যে ৬০-৮০ শতাংশ মায়ের কোনো সমস্যা ছাড়াই সফলভাবে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সিজারিয়ানের পর স্বাভাবিক প্রসব কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আগে কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হবে। যেমন- যাদের আগে একটি সন্তান সিজারের মাধ্যমে হয়েছে, তারা পরবর্তী সময়ে ঝুঁকি ছাড়াই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব করার জন্য সক্ষম থাকেন। সিজার এমন কোনো কারণে হয়েছিল, যা পরবর্তী গর্ভে হয়নি। যেমন- গর্ভে বাচ্চার অস্বাভাবিক অবস্থান। বর্তমান গর্ভে এই অবস্থান যদি ঠিক থাকে, তবে স্বাভাবিক প্রসব হতে পারে। আগের সিজারিয়ানের স্থান কতখানি ঠিক আছে তার ওপর, যেমন- জরায়ুর নিচের অংশে যদি সেলাই দেওয়া হয়, তা হলে পরবর্তী সন্তান প্রসব স্বাভাবিক হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা ০.৫ থেকে ১.৫ শতাংশ মাত্র। আর যদি সেলাই অন্যত্র দেওয়া হয়, তা হলে এই ঝুঁকির হার ৪ থেকে ৯ শতাংশ। যদি সিজারিয়ান করার অন্তত দুই বছর পর পরবর্তী সন্তান নেওয়া হয় এবং আগের সিজারিয়ানের সেলাই ঠিক অবস্থানে থাকে এবং সিজারিয়ান-সংক্রান্ত জটিলতা না থাকে, তবে স্বাভাবিক প্রসব হতে পারে। আগের গর্ভে প্লাসেন্টা প্রিভিয়ার ইতিহাস থাকলে, সিজারিয়ানের পর ইনফেকশন হলে সেলাইয়ের স্থান দুর্বল হয় বলে পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক প্রসব নাও করা যেতে পারে। আগের গর্ভের সময় যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস থাকে, তবে পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করা যায় না। গর্ভের শিশুর ওজন যদি চার কেজির কম থাকে, প্রসবের রাস্তা প্রশস্ত থাকে, তবে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব। সবকিছু ঠিক থাকলে স্বাভাবিক প্রসবের সুবিধা-অসুবিধা মা এবং অভিভাবকদের অবহিত করতে হবে। ডেলিভারি এমন হাসপাতালে করার ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে প্রয়োজনে সিজারিয়ার সেকশন করার ব্যবস্থা করা যায়। হাসপাতালে বাচ্চা ও মায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষ থাকতে হবে। ২০ থেকে ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি সিজারের দরকার হয়। এই ডেলিভারির সময় সঠিক মনিটরিং না হলে মা ও বাচ্চার জটিলতার হার বেড়ে যায়। অপরদিকে সফল স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে শরীরে বাড়তি অস্ত্রোপচার এড়ানো যায়। শরীরে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিস্যু অ্যাডহেসন এবং টিস্যু ইনজুরির ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এই প্র্যাকটিস সাধারণত করা হয় না। এর কারণ দক্ষ লোকবলের অভাব, মা ও বাচ্চার মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং স্বাভাবিক প্রসবে অনেকের অনীহা ও ভীতি।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গাইনি-অবস ডেলটা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
ডায়াবেটিক রোগী অসুস্থ হলে (যেমন- জ্বর, সর্দি, বমি, ডায়রিয়া ইত্যাদি) রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে বা কমে যেতে পারে। তাই এ সময় বিশেষ যত্ন নেওয়া জরুরি।
১। ইনসুলিন ও অন্যান্য ডায়াবেটিসের ওষুধসমূহ চালিয়ে যাওয়া বমি বা পাতলা পায়খানা হলে ইনসুলিন এবং সালফোনাইলইউরিয়া গ্লিটিনাইড গ্রুপের ওষুধ সেবনকারী রোগীদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই এসব ওষুধের মাত্রা কমিয়ে গ্রহণ করতে হবে এবং মেটফরমিন নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
২। ঘন ঘন রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ও প্রস্রাবে কিটোনের উপস্থিতি পরীক্ষা চার ঘণ্টা পরপর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত। তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা যদি <৪ মিলিমোল/লি অথবা কিটোনের উপস্থিতি থাকে, তবে ২ ঘণ্টা পরপর বা আরও ঘন ঘন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে
৩। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে ডায়াবেটিস রোগীর পরিচর্যাকারীর অসুস্থতার দিনের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে এবং রোগীকে কখন চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে সে ব্যাপারে জানতে হবে।
৪। পর্যাপ্ত পানি ও শর্করা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে পানিশূন্যতা রোধে প্রতি ঘণ্টায় ১২৫-১৫০ মিলি পানি পান করতে হবে। শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে কারণ এটা হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধ করে এবং রোগীকে শক্তি জোগায়।
৫। অসুস্থতা দিনের ব্যবস্থাপনার যথাযথ নির্দেশনা প্রদান ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে ডায়াবেটিস রোগীকে এবং রোগীর সহায়তাকারীকে অবশ্যই অসুস্থতার দিনের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে হবে এবং ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি রাখতে হবে।
৬। মূল অসুস্থতার যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
৭। হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধ যথাযথ নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
যদি ৬ ঘণ্টার বেশি বমি বা পাতলা পায়খানা ভালো না হয়। ২ দিন ধরে অসুস্থ থাকেন এবং ভালো না হন। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১৫ মিলি মোল/লির বেশি হয়। চিকিৎসার পরও প্রস্রাবের সঙ্গে কিটোন যাওয়া বন্ধ না হয়। কিটোএসিডোসিস, অতিরিক্ত দ্রুত ও গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস (হাইপারভেন্টিলেশন), পেটে ব্যথা, তন্দ্রাচ্ছন্নতা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে। রোগী যদি শিশু বা বৃদ্ধ হয় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায় (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) ডায়াবেটিসের সঙ্গে আরও অন্য অসুখ (Co-morbidity) থাকে। যদি অসুস্থতার কারণে রোগী খাবার ও পানি গ্রহণে অসমর্থ হন।
লেখিকা: ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন বিশেষজ্ঞ, চেম্বার: আলোক হাসপাতাল লিমিটেড, মিরপুর-৬, ঢাকা
ব্রেইন টিউমার হলো মস্তিষ্কের ভেতরে বা আশপাশের কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা স্বাভাবিক মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত করে।
বিশ্ব ব্রেইন টিউমার দিবস প্রতি বছর ৮ জুন পালিত হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্রেইন টিউমার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক লক্ষণ চেনানো এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝানো। ব্রেইন টিউমার একটি জটিল স্নায়বিক রোগ, যা মস্তিষ্কের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থেকে সৃষ্টি হয়। এটি নারী, পুরুষ ও শিশু–সব বয়সের মানুষের হতে পারে। দেরিতে শনাক্ত হলে এটি প্রাণঘাতী জটিলতায় রূপ নিতে পারে।
ব্রেইন টিউমার কী?
ব্রেইন টিউমার হলো মস্তিষ্কের ভেতরে বা আশপাশের কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা স্বাভাবিক মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত করে। এটি দুই ধরনের হতে পারে– বিনাইন: এটি ক্যানসার নয়, তবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে ম্যালিগন্যান্ট: এটি ক্যানসারজনিত এবং দ্রুত ছড়াতে পারে
পরিসংখ্যান
বিশ্ব পরিসংখ্যান: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বিশ্বে ৪ লাখ ৫০ হাজার ব্রেইন ও স্নায়ুতন্ত্র টিউমার রোগী শনাক্ত হয়। গড়ে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৪-৬ জন আক্রান্ত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ ক্যানসার রোগ ব্রেইন টিউমার। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান: বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট জাতীয় রেজিস্ট্রি সীমিত হলেও হাসপাতালভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার মানুষ ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়। বছরে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার সার্জারি করা হয়। অনেক টিউমার দেরিতে শনাক্ত হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। পুরুষ ও নারীর আক্রান্তের হার প্রায় সমান, তবে নারীদের মধ্যে মেনিনজিওমা বেশি। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে গ্লিওব্লাস্টোমা বেশি। শিশুদের মধ্যে মেডুলোব্লাস্টোমা বেশি দেখা যায়।
কারণ
ব্রেইন টিউমারের নির্দিষ্ট কারণ নেই, তবে কিছু কাজ ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন– বংশগত বা জেনেটিক সমস্যা অতিরিক্ত রেডিয়েশন দীর্ঘদিন রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল বয়স বৃদ্ধি (বিশেষ করে ৫০ বছরের পর ঝুঁকি বেশি) কোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন
লক্ষণ
ব্রেইন টিউমারের লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা দেয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সহজে বোঝা যায় না। টিউমারের অবস্থান ও আকারভেদে উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো– দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা (বিশেষ করে সকালে বেশি) বমি বা বমি বমি ভাব দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া বা ডাবল দেখা খিঁচুনি স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া হাঁটাচলায় ভারসাম্য হারানো বা মাথা ঘোরা আচরণ ও ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব বা ক্লান্তি শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া বা কানে শব্দ শোনা মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া হাত-পায়ের সমন্বয়হীনতা এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রকারভেদ
গ্লিওমা: সবচেয়ে সাধারণ মেনিনজিওমা: ধীরে বৃদ্ধি পায় পিটুইটারি টিউমার: হরমোন সমস্যা সৃষ্টি করে মেডুলোব্লাস্টোমা: শিশুদের বেশি হয় অ্যাকোস্টিক নিউরোমা: শ্রবণশক্তিতে প্রভাব ফেলে
জটিলতা
চিকিৎসা না নিলে হতে পারে– স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি স্মৃতিভ্রংশ অন্ধত্ব বা শ্রবণশক্তি হ্রাস পক্ষাঘাত মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন মৃত্যুঝুঁকি
রোগ নির্ণয়
আধুনিক চিকিৎসায় দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। যেসব পরীক্ষা করা হয়, তার মধ্যে আছে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, বায়োপসি বা টিস্যু পরীক্ষা এবং স্নায়বিক পরীক্ষা
সচেতনতা ও করণীয়
দীর্ঘদিন মাথাব্যথা অবহেলা করা যাবে না খিঁচুনি হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে শিশুদের আচরণগত পরিবর্তন খেয়াল করতে হবে সময়মতো এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করানো জরুরি ভুয়া চিকিৎসা বা গুজব এড়িয়ে চলতে হবে
পরিশেষে বলতে চাই, ব্রেইন টিউমার একটি জটিল রোগ। তবে সময়মতো শনাক্ত করলে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হলেও সচেতনতার অভাবে অনেকেই দেরিতে চিকিৎসা নেন। তাই পরিবার, সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্মিলিত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। সুস্থ মস্তিষ্কই সুস্থ জীবনের ভিত্তি। সচেতন থাকুন, সময়মতো চিকিৎসা নিন।
পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া একটি আঘাতজনিত সমস্যা হলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।
লিগামেন্ট হলো শরীরের জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি হাঁটু, গোড়ালি, কাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে থাকে। বিশেষ করে হাঁটুতে সামনের ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট, পেছনের ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট, মধ্যবর্তী পার্শ্বীয় লিগামেন্ট ও পার্শ্বীয় লিগামেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো ছিঁড়ে গেলে জয়েন্ট দুর্বল ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার কারণ
লিগামেন্ট ইনজুরির পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে– ◉ খেলাধুলাজনিত আঘাত: ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল বা দৌড়ানোর সময় হঠাৎ দিক পরিবর্তন, লাফ বা মোচড় লাগলে লিগামেন্ট ছিঁড়ে যেতে পারে। ◉ দুর্ঘটনা: সড়ক দুর্ঘটনা, উচ্চ স্থান থেকে পড়ে যাওয়া বা ভারী আঘাত সরাসরি লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ◉ ভুলভাবে পা ফেলা: অসমতল বা পিচ্ছিল জায়গায় পা পড়লে বা হঠাৎ পা বেঁকে গেলে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ◉ অতিরিক্ত শরীরের ওজন: শরীরের অতিরিক্ত ওজন জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, ফলে লিগামেন্ট দুর্বল হয়ে যায়। ◉ বয়সজনিত পরিবর্তন: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিগামেন্টের স্থিতিস্থাপকতা ও শক্তি কমে যায়। ◉ পূর্বের আঘাত: একবার লিগামেন্টে আঘাত লাগলে একই জায়গায় পুনরায় আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
লক্ষণ
সাধারণ লক্ষণ: ◉ হঠাৎ তীব্র ব্যথা ◉ পা ফুলে যাওয়া ◉ হাঁটতে কষ্ট হওয়া ◉ জয়েন্টে অস্থিরতা অনুভূত হওয়া ◉ নড়াচড়ার সময় ‘পপ’ শব্দ হওয়া ◉ পায়ের শক্তি কমে যাওয়া। গুরুতর লক্ষণ: ◉ হাঁটতে সম্পূর্ণ অক্ষমতা ◉ পা ভাঁজ করতে সমস্যা ◉ অতিরিক্ত ফোলা ও নীলচে দাগ ◉ জয়েন্ট ঢিলা বা আলগা অনুভূতি।
জটিলতা
চিকিৎসা না নিলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন– ◉ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ◉ জয়েন্ট অস্থিতিশীলতা ◉ হাঁটু বা গোড়ালির ক্ষয়জনিত রোগ ◉ পেশির দুর্বলতা ◉ চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা ◉ পুনরায় আঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
রোগ নির্ণয়
লিগামেন্ট ইনজুরি নিশ্চিত করতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন– ◉ শারীরিক পরীক্ষা: ডাক্তার জয়েন্টের নড়াচড়া, ব্যথা ও স্থিতিশীলতা পরীক্ষা করেন। ◉ এক্স-রে পরীক্ষা: হাড় ভাঙা বা অন্য কোনো হাড়ের সমস্যা আছে কি না দেখা হয়। ◉ চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্রায়ণ: লিগামেন্টের ক্ষতির সঠিক অবস্থা জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা। ◉ আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা: কিছু ক্ষেত্রে নরম টিস্যুর ক্ষতি নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয়।
ঘরোয়া পরামর্শ
বিশ্রাম: আঘাতপ্রাপ্ত পা সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। বরফ সেক: প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বরফ ব্যবহার করলে ফোলা ও ব্যথা কমে। চাপ দেওয়া: ইলাস্টিক কাপড় বা ব্যান্ডেজ দিয়ে হালকা চাপ দেওয়া যায়। উঁচু করে রাখা: পা হৃৎপিণ্ডের চেয়ে উঁচুতে রাখলে ফোলা কমে। ভারী কাজ: ভারী কাজ থেকে বিরত থাকা উত্তম। খাবার: এ সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে হবে। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করা করতে হবে। ব্যথার ওষুধ: ব্যথার ওষুধ নিজে থেকে না খাওয়া।
প্রতিরোধের উপায়
◉ খেলাধুলার আগে ভালোভাবে শরীর গরম করা ◉ সঠিক জুতা ব্যবহার করা ◉ নিয়মিত পেশি শক্ত করার ব্যায়াম করা ◉ শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ◉ ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এড়িয়ে চলা ◉ পূর্বে আঘাত থাকলে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা
পরিশেষে বলতে চাই, পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া একটি আঘাতজনিত সমস্যা হলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। হালকা ইনজুরিতে বিশ্রাম ও প্রাথমিক যত্ন যথেষ্ট হলেও গুরুতর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পথ।
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এর কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না।
আমাদের শরীরের ধমনীগুলোতে রক্তপ্রবাহের চাপ যখন স্বাভাবিকের চেয়ে সব সময় বেশি থাকে, তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়। এই সমস্যায় হৃৎপিণ্ডকে শরীরজুড়ে রক্ত পাম্প করতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। সাধারণত রক্তচাপ পরিমাপ করা হয় মিলিমিটার অব মার্কারি (mm Hg) এককে। যদি কোনো ব্যক্তির রক্তচাপের রিডিং ১৩০/৮০ mm Hg বা তার বেশি হয়, তবে ধরে নেওয়া হয় তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
রক্তচাপের বিভিন্ন ধাপ
আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন রক্তচাপকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করেছে: ◉ স্বাভাবিক: রক্তচাপ যখন ১২০/৮০ mm Hg-এর নিচে থাকে। ◉ উচ্চতর: ওপরের নম্বরটি (সিস্টোলিক) ১২০ থেকে ১২৯ mm Hg এবং নিচের নম্বরটি (ডায়াস্টোলিক) ৮০-এর নিচে থাকে। ◉ প্রথম ধাপের উচ্চ রক্তচাপ: ওপরের নম্বরটি ১৩০ থেকে ১৩৯ mm Hg অথবা নিচের নম্বরটি ৮০ থেকে ৮৯ mm Hg হয়। ◉ দ্বিতীয় ধাপের উচ্চ রক্তচাপ (Stage 2): ওপরের নম্বরটি ১৪০ mm Hg বা তার বেশি অথবা নিচের নম্বরটি ৯০ mm Hg বা তার বেশি হয়।
জরুরি সতর্কবার্তা: রক্তচাপ যদি ১৮০/১২০ mm Hg-এর বেশি হয়ে যায়, তবে তাকে ‘হাইপারটেনসিভ ক্রাইসিস’ বা জরুরি চিকিৎসা অবস্থা বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
কেন একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এর কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। বহু বছর ধরে কোনো উপসর্গ ছাড়াই এই রোগ শরীরে বাসা বেঁধে থাকতে পারে। তবে মাত্রাতিরিক্ত রক্তচাপ বাড়লে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে: ◉ তীব্র মাথাব্যথা ◉ শ্বাসকষ্ট ◉ নাক দিয়ে রক্ত পড়া তবে এই লক্ষণগুলো সুনির্দিষ্ট নয় এবং সাধারণত রোগটি যখন মারাত্মক বা জীবনঘাতী পর্যায়ে পৌঁছায়, তখনই কেবল এগুলো দেখা দেয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ এর ঝুঁকি বাড়ে।
উচ্চ রক্তচাপের কারণ ও প্রকারভেদ
হৃৎপিণ্ড কী পরিমাণ রক্ত পাম্প করছে এবং ধমনীর মধ্য দিয়ে রক্ত চলাচলে কতটা বাধা পাচ্ছে–এর ওপর রক্তচাপ নির্ভর করে। ধমনী যত সরু হবে, রক্তচাপ তত বাড়বে। উচ্চ রক্তচাপ প্রধানত দুই প্রকার: ১. প্রাইমারি বা এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন: বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে শরীরে গড়ে ওঠে। ধমনীতে চর্বি বা প্লাক জমা হওয়া (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস) এর অন্যতম কারণ। ২. সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন: এটি শরীরের অন্য কোনো অন্তর্নিহিত রোগের কারণে হঠাৎ দেখা দেয় এবং এর তীব্রতা বেশি হয়। এর অন্যতম কারণগুলো হলো কিডনির রোগ এবং থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির টিউমার বা জন্মগত হৃদরোগ এবং কিছু ওষুধ (যেমন- ঠাণ্ডার ওষুধ, ব্যথানাশক, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল)। এ ছাড়া মাদক গ্রহণ (যেমন- কোকেন বা অ্যামফিটামিন), অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে দম আটকে যাওয়া) থেকেও সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন হতে পারে। (নোট: চিকিৎসকের চেম্বারে গেলে সাময়িক ভয়ের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়াকে ‘হোয়াইট কোট হাইপারটেনশন’ বলে।)
ঝুঁকিতে আছেন কারা
◉ বয়স ও বংশগত কারণ: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণত ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষদের এবং ৬৫ বছরের পর নারীদের এই রোগ বেশি হয়। এ ছাড়া পরিবারে বাবা-মা বা ভাই-বোনের এই রোগ থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। ◉ ওজন বৃদ্ধি ও অলস জীবনযাপন: অতিরিক্ত ওজনের কারণে রক্তনালি ও কিডনিতে পরিবর্তন আসে, যা রক্তচাপ বাড়ায়। শারীরিক পরিশ্রম না করলে ওজন ও হৃৎস্পন্দন দুই-ই বাড়ে। ◉ তামাক ও ধূমপান: ধূমপান বা ভেপিং সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়ায় এবং ধমনী শক্ত করে ফেলে। ◉ খাদ্যাভ্যাস: খাবারে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম) খেলে শরীরে জলীয় অংশ জমে রক্তচাপ বাড়ে। আবার খাবারে পটাশিয়ামের অভাব হলেও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ◉ অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও অ্যালকোহল: মানসিক চাপ সাময়িক রক্তচাপ বাড়ায় এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। ◉ শিশুদের ঝুঁকি: ইদানীং অস্বাস্থ্যকর খাবার ও অলসতার কারণে শিশুদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিচ্ছে।
বিপজ্জনক জটিলতাসমূহ
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে– ◉ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক: ধমনী শক্ত ও মোটা হয়ে যাওয়ার কারণে এই ঝুঁকি বাড়ে। ◉ অ্যানিউরিজম: রক্তনালি দুর্বল হয়ে ফুলে যেতে পারে, যা ফেটে গেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ◉ হার্ট ফেইলিওর: হৃৎপিণ্ডের দেয়াল মোটা হয়ে এক সময় তা শরীরকে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ◉ কিডনি ও চোখের ক্ষতি: কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে এবং চোখের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি কমতে পারে। ◉ মেটাবলিক সিনড্রোম ও ডিমেনশিয়া: এটি ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া বা ‘ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া’ হতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
১৮ বছর বয়সের পর থেকে প্রত্যেকের অন্তত প্রতি দুই বছরে একবার রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। ধূমপান বর্জন, নিয়মিত ব্যায়াম, খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমে সুস্থ থাকা সম্ভব। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে।
সামান্য সচেতনতাই পারে এই লিভারকে হেপাটাইটিসের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হেপাটাইটিস হলো আমাদের লিভার বা যকৃতের প্রদাহ (Inflammation)। কোনো সংক্রমণ বা আঘাতের বিপরীতে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই হলো প্রদাহ। যখন কোনো কারণে আমাদের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্রমিত হয়, তখন সেখানে প্রদাহের সৃষ্টি হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেপাটাইটিস নামে পরিচিত। এই রোগটি কখনো হঠাৎ দেখা দিয়ে ৬ মাসের মধ্যে সেরে যায়, একে বলা হয় অ্যাকিউট (Acute) বা তীব্র হেপাটাইটিস। আবার কখনো এটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় এবং আস্তে আস্তে লিভারকে ধ্বংস করতে থাকে, একে বলা হয় ক্রনিক (Chronic) বা দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস।
হেপাটাইটিসের বিভিন্ন প্রকারভেদ
হেপাটাইটিস প্রধানত তিন ধরনের হতে পারে — ◉ ভাইরাল হেপাটাইটিস: এটি সবচেয়ে সাধারণ রূপ। বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে এই রোগ হয়, যেমন— হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই। ◉ টক্সিক বা বিষাক্ত হেপাটাইটিস: অতিরিক্ত অ্যালকোহল (মদ) সেবন, বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে লিভারের যে ক্ষতি হয়, তা-ই টক্সিক হেপাটাইটিস। ◉ অটোইমিউন হেপাটাইটিস: এটি একটি বিরল রোগ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) ভুলবশত নিজের লিভারের কোষগুলোকেই শত্রু ভেবে আক্রমণ করে বসে।
হেপাটাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ রূপ ভাইরাল হেপাটাইটিস।
রোগটির লক্ষণসমূহ কী কী?
হেপাটাইটিস অত্যন্ত চতুর একটি রোগ। অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। তবে রোগটি দেখা দিলে সাধারণত যেসব লক্ষণ প্রকাশ পায় — • ঘন ঘন ডায়রিয়া ও প্রচণ্ড ক্লান্তি বা অবসাদ। • শরীর দুর্বল লাগা এবং অস্বস্তি বোধ হওয়া। • ভাইরাল ইনফেকশন হলে জ্বর আসা। • বমি বমি ভাব বা ক্ষুধামন্দা। • পেটের ডানদিকের ওপরের অংশে ব্যথা হওয়া। যদি রোগটি দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) রূপ নেয় এবং লিভারের বেশি ক্ষতি করে, তবে নিচের জটিল লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে — • জন্ডিস (ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া)। • প্রস্রাবের রঙ গাঢ় বা ডার্ক হওয়া এবং পায়খানার রঙ ফ্যাকাসে হওয়া। • ত্বক চুলকানো (Pruritus)। লিভারের মারাত্মক ক্ষতির কারণে মস্তিস্কে প্রভাব পড়া, যার ফলে স্মৃতিভ্রম, দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব (Hepatic Encephalopathy) হতে পারে।
কেন হয় এই রোগ?
হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হলো ভাইরাস। তবে এটি কীভাবে ছড়ায়, তা ভাইরাসের ধরনের ওপর নির্ভর করে — ১. দূষিত খাদ্য ও পানি: হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়, যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় ফুড পয়জনিং-ও বলে থাকি। ২. রক্ত ও শারীরিক তরল: হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ এবং ‘ডি’ ছড়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে। যেমন— আক্রান্ত ব্যক্তির সুই বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে এবং অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এছাড়া আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে সন্তান জন্মের সময়ও হেপাটাইটিস ‘বি’ ছড়াতে পারে।
হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘বি’ এর অত্যন্ত কার্যকর টিকা রয়েছে।
অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণ — ভাইরাস ছাড়াও বেশ কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে। যেমন— লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা (MASLD), পিত্তথলির সমস্যা (Cholestasis), অতিরিক্ত আয়রন বা তামা জমে যাওয়ার মতো বিরল জিনগত রোগ (Hemochromatosis ও Wilson Disease), এবং কিছু বিশেষ ভাইরাসের (যেমন- CMV, Epstein-Barr) সংক্রমণ।
লিভারের মারাত্মক জটিলতা
হেপাটাইটিসকে অবহেলা করলে তা শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে — • সিরোসিস (Cirrhosis): দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে লিভার ক্ষতবিক্ষত হয়ে শুকিয়ে যায় এবং তার কার্যক্ষমতা হারায়। • লিভার ক্যান্সার: গবেষণায় দেখা গেছে, লিভার ক্যান্সারের প্রায় অর্ধেক ঘটনার পেছনে রয়েছে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের কারণে হওয়া লিভার সিরোসিস। • লিভার ফেইলিওর: যখন লিভার সম্পূর্ণ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। • পোর্টাল হাইপারটেনশন: সিরোসিসের কারণে লিভারের প্রধান রক্তনালীতে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়া।
রাস্তার ধারের খাবার হেপাটাইটিস ছড়ানোর অন্যতম কারণ।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
লক্ষণ দেখে চিকিৎসকেরা শারীরিক পরীক্ষা, লিভার ফাংশন টেস্ট (Blood Test), ইমেজিন টেস্ট (যেমন— লিভার স্ক্যান বা ইলাস্টোগ্রাফি) এবং প্রয়োজনে লিভার বায়োপসির মাধ্যমে রোগটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করেন। যেহেতু হেপাটাইটিসের কারণ ভিন্ন ভিন্ন, তাই এর চিকিৎসায় কোনো একক পদ্ধতি নেই — • জীবনযাত্রার পরিবর্তন: পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং পুরোপুরি অ্যালকোহল বর্জন করলে হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং অ্যাকিউট হেপাটাইটিস ‘বি’ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। • অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ: ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ এর জন্য আজীবন ওষুধ খেতে হতে পারে, যা ভাইরাস ছড়ানো ও জটিলতা কমায়। অন্যদিকে, আধুনিক ‘ডাইরেক্ট-অ্যাক্টিং অ্যান্টিভাইরাল’ (DAA) ওষুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘সি’ এখন পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। • লিভার প্রতিস্থাপন (Transplant): লিভার যদি একেবারেই অকেজো বা ফেইলিওর হয়ে যায়, তবে শেষ চিকিৎসা হিসেবে লিভার প্রতিস্থাপন করতে হয়।
ভাইরাস ছাড়াও বেশ কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে।
প্রতিরোধের সহজ উপায়
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। হেপাটাইটিস থেকে দূরে থাকতে এই নিয়মগুলো মেনে চলুন — • টিকা নিন: হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘বি’ এর অত্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিন বা টিকা রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আজই টিকা নিন। • স্বাস্থ্যবিধি মানুন: টয়লেট ব্যবহারের পর এবং খাবার তৈরি বা খাওয়ার আগে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। বাইরের খোলা বা দূষিত পানি ও খাবার পরিহার করুন। • সচেতনতা: যেকোনো ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য বা অতিরিক্ত ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন। ইনজেকশন নেওয়ার সময় সবসময় নতুন সিরিঞ্জ ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
লিভার আমাদের শরীরের পাওয়ার হাউজ। সামান্য সচেতনতাই পারে এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে হেপাটাইটিসের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন!