ফুসফুসের ক্যানসার বিশ্বে তৃতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। এটি এমন এক রোগ, যেখানে ফুসফুসের কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে এই কোষগুলো টিউমারে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে ফুসফুসের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করে। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যু হার আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।
ফুসফুসের ক্যানসার কীভাবে হয়
আমাদের শরীরের কোষ নিয়মিতভাবে বিভাজিত হয়ে নতুন কোষ তৈরি করে। কিন্তু কোনো কারণে এই কোষগুলোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেলে তারা ক্রমাগত বিভাজিত হতে থাকে। এই অনিয়ন্ত্রিত কোষই ক্যানসার তৈরি করে। ফুসফুসের ক্যানসার মূলত ফুসফুসের ভেতরের বায়ুনালি বা বায়ুথলিতে শুরু হয়।
ফুসফুসের ক্যানসারের ধরন
ফুসফুসের ক্যানসার প্রধানত দুই প্রকার-
নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার (NSCLC): এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীর এই ধরনের ক্যানসার হয়। এর মধ্যে অ্যাডেনোকারসিনোমা ও স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা সবচেয়ে সাধারণ।
স্মল সেল লাং ক্যানসার (SCLC): এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সহজেই শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
রোগের ধাপ বা স্টেজ
ক্যানসার সাধারণত কত দূর ছড়িয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে স্টেজ নির্ধারণ করা হয়।
স্টেজ জিরো: ক্যানসার শুধু ফুসফুসের ওপরের আস্তরণে সীমিত।
স্টেজ ওয়ান: ক্যানসার এখনো ফুসফুসের ভেতরেই সীমাবদ্ধ।
স্টেজ টু ও থ্রি: ক্যানসার আশপাশের টিস্যু বা লসিকা গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে।
স্টেজ ফোর: ক্যানসার অন্য ফুসফুস বা শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
লক্ষণ
ফুসফুসের ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—
• দীর্ঘদিন ধরে থাকা কাশি
• শ্বাস নিতে কষ্ট
• বুক ব্যথা বা শোঁ শোঁ শব্দ
• রক্তসহ কাশি
• হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া ও ক্ষুধামান্দ্য হওয়া
• অতিরিক্ত ক্লান্তি
ফুসফুস ক্যানসারের কারণ
ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় কারণ। মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যান্য কারণ হলো-
• পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে থাকা
• রেডন, অ্যাসবেস্টস, ডিজেল ধোঁয়া বা অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হয় এমন পরিবেশে কাজ করা
• বংশগত কারণ বা পারিবারিক ইতিহাস
• বুকে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া
নির্ণয়
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর শারীরিক পরীক্ষা ও এক্স-রে করতে পারেন। প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান, পিইটি স্ক্যান বা বায়োপসি (টিস্যু পরীক্ষা) করে নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা হয়।
চিকিৎসা
ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসানির্ভর করে রোগের ধরন ও স্টেজের ওপর। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো-
সার্জারি: ক্যানসার আক্রান্ত অংশ বা পুরো ফুসফুস অপসারণ করা হয়।
কেমো থেরাপি: ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়।
রেডিয়েশন থেরাপি: বিকিরণ দিয়ে ক্যানসার কোষ মারা হয়।
টার্গেটেড ওষুধ ও ইমিউনো থেরাপি: ক্যানসার কোষের জেনেটিক পরিবর্তন চিহ্নিত করে বিশেষ ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে।
প্রতিরোধ
ধূমপান বন্ধ করা ও পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এছাড়া দূষণমুক্ত পরিবেশে থাকা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা সম্ভব, যা সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা বাড়ায়।
লেখক: চিকিৎসক, গবেষক ও কলাম লেখক


