শীত এলেই প্রকৃতি বদলে যায়—কুয়াশায় ঢাকা সকাল, নরম রোদ আর পিঠা-চায়ের আড্ডায় প্রাণ ফিরে আসে। কিন্তু আবহাওয়ার এই মনোরম রূপান্তর অনেকের শরীরের জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শীতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শরীরকে বেশি শক্তি ব্যয় করে নিজেকে উষ্ণ রাখতে হয়। ফলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শীতে শুধু গরম পোশাক নয়, দরকার সুগঠিত জীবনধারা ও সঠিক স্বাস্থ্যচর্চা।
শরীরের ওপর শীতের প্রভাব
তাপমাত্রা কমলে রক্তনালি সংকুচিত হয়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। যাদের আগেই হাইপারটেনশন বা হৃদরোগ আছে, তাদের জন্য এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। শীতে ঘরবন্দি সময় বেড়ে যায়, জানালা-দরজা বন্ধ থাকায় ঘরের বাতাসে জীবাণুর ঘনত্ব বাড়ে। এ কারণে সর্দি-কাশি, ফ্লু ও নিউমোনিয়ার মতো রোগ দ্রুত ছড়ায়।
এ ছাড়া সূর্যের আলো কম পাওয়ায় ভিটামিন-ডির অভাব দেখা দেয়, যা হাড় দুর্বল করে ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সকালবেলা অল্পক্ষণ রোদে থাকা তাই অত্যন্ত জরুরি।
শীতে যেসব রোগ বেশি দেখা যায়
ভাইরাল সর্দি-কাশি: ঠাণ্ডা বাতাস, ধুলা অথবা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে দ্রুত ছড়ায়।
ইনফ্লুয়েঞ্জা: জ্বর, গলা ব্যথা, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথা এর প্রধান উপসর্গ।
নিউমোনিয়া: শিশু ও প্রবীণদের জন্য খুব বিপজ্জনক।
অ্যাজমা: ঠাণ্ডা বাতাসে হাঁপানি রোগীদের সমস্যা অনেক বাড়ে।
ত্বকের সমস্যা: শুষ্কতা, চুলকানি ও ঠোঁট ফাটার ঘটনা সাধারণত বাড়ে।
হৃদরোগ: ঠাণ্ডাজনিত রক্তনালির সংকোচনের কারণে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
সাইনোসাইটিস: নাক বন্ধ, মুখে চাপ ও মাথাব্যথার প্রবণতা বেড়ে যায়।
শীতে খাদ্যাভ্যাস—কী খাবেন, কেন খাবেন
শরীরকে উষ্ণ ও সচল রাখতে শীতে পুষ্টিকর খাদ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-
প্রোটিন: মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, বাদাম থেকে পাবেন। এটা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
ভিটামিন সি: কমলা, পেয়ারা, আমলকী, টমেটো থেকে পাবেন। এটা রোগপ্রতিরোধে বিশেষ কার্যকর।
সবুজ শাকসবজি: পালং, ব্রকলি, কপি ও ফুলকপিতে রয়েছে আয়রন ও প্রয়োজনীয় মিনারেল।
শক্তিদায়ক খাবার: আলু, মিষ্টি আলু, ভাত ও গমশস্য শরীরে তাপ উৎপাদনে সাহায্য করে।
গরম ভেষজ পানীয়: আদা-লেবু, তুলসী বা দারুচিনি-গোলমরিচের পানীয় সর্দি প্রতিরোধে উপকারী।
পর্যাপ্ত পানি: শীতে তৃষ্ণা কম লাগে। কিন্তু শরীরের পানির ঘাটতি দ্রুত ঘটে। তাই ন্যূনতম ৭-৮ গ্লাস পানি পান জরুরি।
সঠিক জীবনযাপনই প্রতিরোধের চাবিকাঠি
উষ্ণ পোশাক ব্যবহার করুন; বিশেষ করে কান, মাথা ও পা ভালোভাবে ঢেকে রাখুন।
বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
ঘরে পর্যাপ্ত সময় জানালা খুলে বাতাস চলাচলের সুযোগ রাখুন।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন কিংবা হালকা ব্যায়াম করুন।
ধূমপান থেকে দূরে থাকুন— শীতে এটি শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়।
যথেষ্ট ঘুম নিশ্চিত করুন।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের (শিশু, প্রবীণ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগী) ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত।
শিশু ও প্রবীণদের বিশেষ যত্ন
শিশুদের ক্ষেত্রে: শিশুরা ঠাণ্ডায় দ্রুত অসুস্থ হয়। বাইরে গেলে অবশ্যই টুপি, মোজা, গরম জামা পরাতে হবে। তাদের ত্বক সেনসিটিভ হওয়ায় মৃদু ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। ঠাণ্ডা পানি এড়িয়ে চলা উচিত।
প্রবীণদের ক্ষেত্রে: প্রবীণরা শীতে জয়েন্ট পেইন, হাঁপানি ও কার্ডিয়াক সমস্যায় বেশি ভোগেন। নিয়মিত গরম পানি পান, অল্প ব্যায়াম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ জরুরি। খুব ভোরে কুয়াশার মধ্যে হাঁটা উচিত নয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন
শীতে সূর্যালোক কম থাকায় অনেকে মনমরা হয়ে পড়েন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায়
সকালে রোদে হাঁটাহাঁটি করা
কাজের প্রতি মনোযোগ
পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো
পর্যাপ্ত ঘুম
এগুলো মনকে শান্ত ও প্রাণবন্ত রাখে।
ত্বক ও ঠোঁটের যত্ন
স্নানের পর সঙ্গে সঙ্গে ময়েশ্চারাইজার লাগান।
খুব গরম পানি এড়িয়ে চলুন।
মধু বা ওটসের প্যাক ত্বককে কোমল রাখে।
ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি বা নারিকেল তেল লাগান।
ঘুমানোর আগে হাত-পায়ে অল্প তেল লাগালে ফাটা ত্বক কমে।
লেখক: চিকিৎসক, গবেষক ও কলাম লেখক


