শরীরের যেকোনো সাধারণ সংক্রমণ কখনও কখনও ভয়ংকরভাবে জটিল রূপ নিতে পারে। সেপসিস এমনই একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সংক্রমণ প্রতিরোধ করার বদলে উল্টো স্বাভাবিক কোষ ও অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করে। এ সময় রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, যা বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এর ফলে অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, এমনকি অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সেপসিসকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সেপসিসের ধাপ
আগে সেপসিসকে তিনটি ধাপে ভাগ করা হতো—সেপসিস, গুরুতর সেপসিস এবং সেপটিক শক। এখন এই ধারণা কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। সংক্রমণ থেকে শুরু করে রক্তে জীবাণুর উপস্থিতি (ব্যাকটেরিমিয়া) এবং সেখান থেকে সেপসিস ও সেপটিক শকে রূপ নেওয়ার একটি ক্রমবর্ধমান অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। শেষ পর্যায়ে একাধিক অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে প্রাণহানির ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
সেপসিস যেকোনো বয়সের মানুষেরই হতে পারে, বিশেষত যাদের দেহে কোনো ধরনের সংক্রমণ রয়েছে। তবে কিছু মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। যেমন-
• ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি
• গর্ভবতী নারী
• ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ক্যানসার বা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
• দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ
• হাসপাতালে ভর্তি রোগী
• বড় ধরনের পোড়া বা আঘাত পাওয়া ব্যক্তি
• ক্যাথেটার, শিরায় সুচ (IV) বা শ্বাসনালিতে টিউব থাকা
• এ ছাড়া নবজাতক ও শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
সেপসিসের লক্ষণ
সেপসিস দেহের বিভিন্ন অঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই লক্ষণও ভিন্ন রকম হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
• জ্বর বা অস্বাভাবিকভাবে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া
• হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া
• নিম্ন রক্তচাপ
• কাঁপুনি বা ঠাণ্ডা লাগা
• কম প্রস্রাব হওয়া
• দুর্বলতা, অবসাদ
• দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাসকষ্ট
• অস্বাভাবিক বিভ্রান্তি বা উত্তেজনা
• তীব্র ব্যথা
• কখনও ত্বকে লালচে দাগ বা র্যাশ দেখা যেতে পারে।
সেপসিসের কারণ
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ সেপসিসের জন্য দায়ী। তবে ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীর সংক্রমণ থেকেও সেপসিস হতে পারে। সংক্রমণ দেহের যেকোনো জায়গা থেকে শুরু হতে পারে—
• ফুসফুস: যেমন নিউমোনিয়া
• মূত্রনালি: বিশেষত ক্যাথেটার থাকলে
• পেটের ভেতর: অ্যাপেন্ডিক্স, পিত্তথলি, অন্ত্র বা যকৃতের সংক্রমণ
• মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড: মেনিনজাইটিস বা অন্যান্য সংক্রমণ
• ত্বক: ক্ষত, পোড়া বা ক্যাথেটার প্রবেশের স্থান দিয়ে জীবাণু ঢুকে গেলে
নির্ণয় কীভাবে হয়?
কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষায় সেপসিস নিশ্চিত করা যায় না। এ জন্য চিকিৎসকরা শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানসহ নানা তথ্য বিবেচনা করেন। সংক্রমণ শনাক্তের জন্য রক্তের কালচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ও চেতনার মাত্রা দেখে দ্রুত সেপসিস সন্দেহ করা যায়।
চিকিৎসা
সেপসিস সন্দেহ হলেই জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা শুরু করতে হয়। সাধারণত রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। প্রধান চিকিৎসা হলো—
• অ্যান্টিবায়োটিক: ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ঠেকাতে
• শিরায় স্যালাইন: রক্তচাপ বজায় রাখতে
• ভাসোপ্রেসর ওষুধ: রক্তনালি সংকুচিত করে রক্তচাপ বাড়াতে
• সহায়ক চিকিৎসা: কিডনি অকেজো হলে ডায়ালাইসিস, শ্বাসকষ্ট হলে ভেন্টিলেশন
• সার্জারি: ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু সরাতে দরকার হতে পারে
সতর্কতা
সেপসিসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি দ্রুত জটিল হয়। তাই সামান্য সংক্রমণও অবহেলা করা যাবে না। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কম প্রস্রাব বা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে সেপসিস থেকে জীবন বাঁচানো সম্ভব। তাই সচেতন থাকাই সুরক্ষা।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক


