ওভারিয়ান সিস্ট নারীদের একটি খুবই সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি মূলত ডিম্বাশয়ের ভেতরে বা ওপরে তরল বা আধা-ঠোস পদার্থে ভরা একটি ছোট থলি বা গাঁট। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওভারিয়ান সিস্ট ক্ষতিকর নয়, তেমন কোনো উপসর্গও দেখা যায় না এবং অনেক সময় চিকিৎসা ছাড়াই নিজে নিজে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত পরীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ওভারিয়ান সিস্ট কী?
ওভারিয়ান সিস্ট হলো ডিম্বাশয়ের ভেতরে বা ওপরে তৈরি হওয়া তরলভর্তি একটি থলি। এটি এক বা দুই ডিম্বাশয়েই হতে পারে। বেশির ভাগ সিস্টই ক্যানসার নয় (বিনাইন) এবং ব্যথাহীন। অনেক নারী জানতেই পারেন না যে তার ডিম্বাশয়ে সিস্ট আছে—এটি সাধারণত আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা পেলভিক পরীক্ষার সময় ধরা পড়ে। বিশেষ করে যারা এখনো মেনোপজে যাননি, তাদের মধ্যে ওভারিয়ান সিস্ট খুব বেশি দেখা যায়।
ওভারিয়ান সিস্টের প্রকারভেদ
◉ ফাংশনাল সিস্ট
ফলিকুলার সিস্ট: প্রতি মাসে ডিম্বাশয়ে একটি ফলিকল থেকে ডিম্বাণু বের হওয়ার কথা। কিন্তু ডিম্বাণু বের না হলে ফলিকলটি তরল জমে সিস্টে পরিণত হয়।
কর্পাস লিউটিয়াম সিস্ট: ডিম্বাণু বের হওয়ার পর যে অংশটি তৈরি হয়, সেটি সাধারণত ভেঙে যায়। কিন্তু কখনো কখনো সেটিতে তরল জমে সিস্ট হয়।
এই ধরনের সিস্ট সাধারণত দুয়েক মাসের মধ্যেই নিজে নিজে সেরে যায়।
◉ অন্যান্য সিস্ট
সিস্টাডেনোমা: ডিম্বাশয়ের ওপর তৈরি হয়, ভেতরে পাতলা বা ঘন তরল থাকতে পারে।
ডারময়েড সিস্ট (টেরাটোমা): এতে চুল, দাঁত বা ত্বকের মতো কোষ থাকতে পারে। এটি সাধারণত ক্যানসার নয়।
এন্ডোমেট্রিওমা: এন্ডোমেট্রিওসিস রোগে আক্রান্ত নারীদের হয়, এতে জমে থাকে পুরোনো রক্ত।
ওভারিয়ান ক্যানসার সিস্ট: এটি কঠিন ও ক্যানসারযুক্ত হতে পারে, সাধারণত মেনোপজের পর বেশি দেখা যায়।
ওভারিয়ান সিস্ট কি গুরুতর?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নয়। ১ শতাংশেরও কম সিস্ট ক্যানসার হয়ে থাকে। তবে বয়স বেশি হলে বা মেনোপজের পর সিস্ট হলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
ওভারিয়ান সিস্টের লক্ষণ
ছোট সিস্টে সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না। বড় সিস্টে দেখা দিতে পারে—
তলপেটে বা কোমরে ব্যথা
পেট ফাঁপা বা ভারী ভাব (এক পাশে বেশি অনুভূত হতে পারে)
সহবাসের সময় ব্যথা
মাসিক অনিয়ম বা অতিরিক্ত ব্যথা
ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ
কোষ্ঠকাঠিন্য
সিস্ট হলে কেমন লাগে?
কারো কোনো কষ্টই নাও হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে—
হালকা অস্বস্তি
মাঝে মাঝে তীব্র ব্যথা
মাসিকের নির্দিষ্ট সময়ে ব্যথা বাড়তে পারে
ওভারিয়ান সিস্ট হওয়ার কারণ
ডিম্বস্ফোটন (Ovulation)
হরমোনজনিত সমস্যা
এন্ডোমেট্রিওসিস
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)
পেলভিক ইনফেকশন (PID)
অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ফলে
ঝুঁকি কাদের বেশি?
যাদের এখনো মেনোপজ হয়নি
গর্ভাবস্থায়
আগে সিস্ট হয়ে থাকলে
PCOS বা এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে
বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার ওষুধ সেবনে
সম্ভাব্য জটিলতা
সিস্ট ফেটে যাওয়া: হঠাৎ তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি হতে পারে
ওভারিয়ান টর্শন: সিস্ট বড় হলে ডিম্বাশয় পেঁচিয়ে যেতে পারে, যা খুবই জরুরি অবস্থা
ক্যানসার: বিরল হলেও সম্ভাবনা থাকে
সিস্ট ফেটে গেলে কী অনুভূত হয়?
হঠাৎ তীব্র তলপেটের ব্যথা
যোনিপথে রক্তপাত
বমি বা বমিভাব
পেট ফুলে যাওয়া
এমন হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
পেলভিক পরীক্ষা
আল্ট্রাসনোগ্রাফি
ল্যাপারোস্কপি (প্রয়োজনে সিস্ট অপসারণও করা যায়)
চিকিৎসা পদ্ধতি
পর্যবেক্ষণ: বেশির ভাগ ফাংশনাল সিস্ট নিজে নিজে সেরে যায়। কিছুদিন পরপর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে হয়।
ওষুধ
হরমোনাল ওষুধ (যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল) ভবিষ্যতে সিস্ট হওয়া রোধ করতে সাহায্য করে।
অস্ত্রোপচার
সিস্ট বড় হলে, ব্যথা করলে বা ক্যানসারের আশঙ্কা থাকলে অপারেশন প্রয়োজন হয়।
কখন সিস্ট অপসারণ জরুরি?
সিস্ট ১০ সেন্টিমিটারের বেশি হলে
তীব্র ব্যথা বা মাসিক সমস্যা হলে
বন্ধ্যত্বের কারণ হলে
ক্যানসারের সন্দেহ থাকলে
চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে?
কিছু সিস্ট নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু সিস্ট জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অবহেলা করা ঠিক নয়।
মনে রাখবেন, ওভারিয়ান সিস্ট সাধারণ হলেও সচেতন থাকা জরুরি। নিয়মিত পরীক্ষা, উপসর্গ হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং ভয় না পেয়ে সঠিক তথ্য জানা—এই তিনটি বিষয়ই নারীর সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: চিকিৎসক ও গবেষক


