লিভার বা যকৃৎ হলো মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা প্রায় সব শারীরিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। খাদ্য হজম, রক্ত পরিশোধন, শক্তি সঞ্চয়, হরমোনের ভারসাম্য— সব ক্ষেত্রেই লিভারের অবদান অপরিসীম। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ফলে লিভার সিরোসিস তৈরি হয়, যা শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়, রোগীর মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও প্রভাব ফেলে।
লিভার সিরোসিস কী?
লিভার সিরোসিস হলো লিভারের স্থায়ী ক্ষতি, যেখানে সুস্থ কোষ ধীরে ধীরে শক্ত ও দাগযুক্ত টিস্যুতে রূপান্তরিত হয়। এই দাগযুক্ত টিস্যু লিভারের রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং কার্যক্ষমতা হ্রাস করে। সিরোসিস হঠাৎ হয় না; এটি বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তাই সচেতনতা ও নিয়মিত পরীক্ষা অপরিহার্য।
প্রধান কারণ
ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস: হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা সিরোসিসে রূপ নেয়।
অ্যালকোহলজনিত ক্ষতি: দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের ফলে লিভার ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ: ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস লিভারে চর্বি জমায়।
ওষুধ ও বিষাক্ত পদার্থ: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিছু ওষুধ বা রাসায়নিক পদার্থ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করতে পারে।
বংশগত ও বিরল কারণ: যেমন উইলসন ডিজিজ, অটোইমিউন হেপাটাইটিস বা আয়রন জমে যাওয়ার রোগ।
লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে: দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, ক্ষুধামান্দ্য, ওজন কমা, কর্মক্ষমতা হ্রাস।
অগ্রসর পর্যায়ে: চোখ ও ত্বক হলুদ হওয়া, পেটে ও পায়ে পানি জমা, চুলকানি, সহজে রক্তপাত, মানসিক বিভ্রান্তি বা আচরণগত পরিবর্তন।
রোগ নির্ণয়
রক্ত পরীক্ষা: লিভার এনজাইম, বিলিরুবিন, রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা।
চিত্রায়ণ পরীক্ষা: আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই।
ফাইব্রোস্ক্যান: লিভারের শক্তি ও দাগের মাত্রা নির্ণয়।
প্রয়োজনে লিভার বায়োপসি।
বিশ্ব ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি
বিশ্বে ৫ কোটির বেশি মানুষ সিরোসিসে আক্রান্ত। প্রতিবছর ১২-১৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় লিভার সিরোসিস একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশে প্রায় ১ কোটির বেশি মানুষ সংক্রমিত, যাদের একাংশ বিভিন্ন পর্যায়ের সিরোসিসে ভুগছেন। প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
মাহে রমজান ও করণীয়
রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, পানিশূন্যতা এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন লিভারের ওপর চাপ বাড়ায়। তাই...
স্থিতিশীল রোগীরা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা রাখতে পারেন।
অগ্রসর রোগীরা: রোজা ঝুঁকিপূর্ণ; ইসলাম অসুস্থদের জন্য ছাড় দিয়েছে।
সতর্কতা: পানি, লবণ ও চর্বি নিয়ন্ত্রণ, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং ওষুধের সময়সূচি ঠিক রাখা জরুরি।
জীবনযাত্রা ও কার্যকারিতা
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম লিভার পুনরুদ্ধারে সহায়ক।
হালকা হাঁটা বা নরম ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
স্ট্রেস কমানো ও মানসিক স্থিতিশীলতা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
পরিবারের সমর্থন মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা মেনে চলায় সহায়ক।
লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি


