শিশুর জন্মের পর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সঠিক গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো ডেভেলপমেন্টাল ডিসপ্লাসিয়া অব দ্য হিপ (ডিডিএইচ)। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে শিশুর নিতম্বের ‘বল ও সকেট’ জয়েন্টটি ঠিকভাবে গঠিত হয় না।
কী এই ডিডিএইচ
আমাদের নিতম্বের জয়েন্টটি উরুর হাড় (ফিমার) এবং পেলভিসের সংযোগস্থলে তৈরি হয়। ফিমারের ওপরের অংশটি গোলাকার (বল-এর মতো), যা একটি কাপের মতো খাঁজে (সকেট) বসে থাকে।
ডিডিএইচ হলে এই সকেটটি স্বাভাবিকের তুলনায় কম গভীর হয়। ফলে ফিমারের মাথা ঠিকভাবে বসে থাকতে পারে না এবং জয়েন্ট ঢিলা হয়ে যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে হাড়টি সকেট থেকে বেরিয়েও যেতে পারে (ডিসলোকেশন)। এই সমস্যা এক বা দুই নিতম্বেই হতে পারে, তবে বাম পাশে বেশি দেখা যায়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ডিডিএইচ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যেমন-
মেয়েশিশু
পরিবারের কারও শৈশবে নিতম্বের সমস্যা থাকলে
প্রথম সন্তান
গর্ভাবস্থার শেষদিকে শিশুর উল্টো অবস্থান (ব্রিচ পজিশন) থাকলে
সময়মতো চিকিৎসা না হলে কী হতে পারে?
প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা না হলে শিশুর ভবিষ্যতে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন-
হাঁটতে সমস্যা বা খুঁড়িয়ে হাঁটা
নিতম্বে ব্যথা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিস
তবে সুখবর হলো— শুরুর দিকে ধরা পড়লে বেশিরভাগ শিশুই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে এবং অপারেশনের প্রয়োজন হয় না।
যেভাবে ধরা পড়ে
জন্মের ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই শিশুর নিতম্ব পরীক্ষা করা হয়। এরপর ৬-৮ সপ্তাহ বয়সেও আবার পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় শিশুর পা ধীরে ধীরে নড়ানো হয়, যাতে বোঝা যায় জয়েন্টটি ঠিক আছে কি না। এতে শিশুর কোনো ব্যথা হয় না।
যদি চিকিৎসক মনে করেন নিতম্ব ঢিলা, তা হলে ৪-৬ সপ্তাহ বয়সে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া যেসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি (যেমন ব্রিচ পজিশন বা পারিবারিক ইতিহাস), সেসব শিশুর ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা পদ্ধতি
১. প্যাভলিক হারনেস
শিশুর জীবনের শুরুতেই ডিডিএইচ ধরা পড়লে সাধারণত একটি বিশেষ কাপড়ের বেল্ট বা স্প্লিন্ট ব্যবহার করা হয়, যাকে প্যাভলিক হারনেস বলা হয়। এটি শিশুর দুই পা এমনভাবে ধরে রাখে, যাতে নিতম্বের জয়েন্ট সঠিক অবস্থানে থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে। সাধারণত ৬-১২ সপ্তাহ এটি পরিয়ে রাখতে হয়। এই সময়-
হারনেস খুলে ফেলা যাবে না (চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া)
ডায়াপার ব্যবহার করা যাবে
পরিষ্কার করার সময়ও সতর্ক থাকতে হবে
শিশুকে চিত করে শোয়াতে হবে
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাঝে মাঝে হারনেস খুলে শিশুকে নড়াচড়া করতে দেওয়া যেতে পারে।
২. অস্ত্রোপচার
যদি ৬ মাস বয়সের পর রোগ ধরা পড়ে বা হারনেসে কাজ না হয়, তা হলে অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে। অপারেশনের মাধ্যমে ফিমারের মাথাকে আবার সকেটের ভেতরে বসানো হয়। এটি দুইভাবে হতে পারে-
ক্লোজড রিডাকশন (কাটা ছাড়া)
ওপেন রিডাকশন (কেটে করা)
অপারেশনের পর শিশুকে কয়েক সপ্তাহ প্লাস্টার (কাস্ট) পরিয়ে রাখা হয়, যাতে জয়েন্টটি স্থির থাকে।
দেরিতে ধরা পড়লে লক্ষণ কী
কিছু ক্ষেত্রে জন্মের সময় ধরা না পড়ে পরে লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন-
এক পা অন্য পায়ের মতো সহজে পাশের দিকে না নড়ানো
এক পা অন্যটির তুলনায় ছোট মনে হওয়া
হামাগুড়ি দেওয়ার সময় একটি পা টেনে নেওয়া
খুঁড়িয়ে বা দুলে দুলে হাঁটা
এমন কিছু দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শিশুকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন
জন্মের পর কিছুদিন শিশুর নিতম্ব খুব নমনীয় থাকে। তাই শিশুকে কাপড়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে রাখলে পায়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা ডিডিএইচের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই—
শিশুর পা ও হাঁটু যেন অবাধে নড়াচড়া করতে পারে
খুব শক্ত করে পেঁচিয়ে না রাখা
‘হিপ-হেলদি’ পদ্ধতিতে শিশুকে জড়িয়ে রাখা
শেষ কথা
ডেভেলপমেন্টাল ডিসপ্লাসিয়া অব দ্য হিপ একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সচেতনতা ও সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর নড়াচড়া ও হাঁটার ধরনে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। কারণ, যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, শিশুর সুস্থ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তত বেশি।
লেখক: চিকিৎসক, গবেষক ও কলাম লেখক


