বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাচুর্যতা, এখনো বহু ভ্রমণপিপাসুদের রয়েছে অজানা। অচেনা-অজানা নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের খোঁজে ‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা দিই হুটহাট দে ছুট। কখনো ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে, কখনোবা চুপেচাপে। এবার দ্বিতীয় পদ্ধতিটাই বেছে নিয়ে আমি আর সামসুল ফকিরাপুল গিয়ে কুয়াকাটার বাসে চড়ি। যেতে যেতে বাস গিয়ে পৌঁছে পাখি ডাকা ভোরে।
টার্মিনালের কিছুদূর আগে আলীপুর বাজারে নেমে পড়ি। কুয়াকাটার ভ্রমণবন্ধু ওমর মিজান আগেভাগেই হোটেল সুন্দরবন ইনের রুম বুকিং রাখায় বাড়তি হ্যাসেল ছাড়াই কক্ষে প্রবেশ করে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিই। উদ্দেশ্য দেশের অন্যতম আলীপুরের আড়তগুলোতে আসা নানা পদের মাছ পর্যবেক্ষণ। ইতোমধ্যে ভ্যান ড্রাইভার ইলিয়াস এসে হাজির। হোটেলের কাছাকাছি হওয়ায় খুব দ্রুতই পৌঁছে যাই। গিয়েই দেখি মাছ বিক্রির হাঁকডাক। ঘাটে নোঙর করা রয়েছে জেলেদের সারি সারি সাগরফেরত ট্রলার।
চেনা-অচেনা বাহারি মাছের পসরা। কিছু টাটকা চিংড়ি ও বেল ঘাগড়া মাছ কিনে ড্রাইভারের বাসায় রান্নার জন্য পাঠিয়ে দিই। এবার হোটেলে ফিরে খানিকটা সময় বিশ্রাম। দুপুরে ভ্যানচালক ফিরে আসে দেশীয় মোটা চালের ভাত, ডাল, ভর্তা ও মাছের তরকারি নিয়ে। মাশাআল্লাহ নতুন নাম জানা বেল ঘাগড়া মাছের স্বাদ অতুলনীয়। পাক্কা রাঁধুনির রান্না বেশ আয়েশ করে খেয়েদেয়ে বের হয়ে পড়ি তাহেরপুরের পথে। যেতে যেতে আমখোলাপাড়ায় ব্রেক। সড়কের পাশেই তালগাছের ছায়ায় ঘেরা স্বচ্ছ টলটলে পানির একটি পুকুর। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এ পুকুর কুয়াকাটার প্রথম খনন করা মিষ্টি পানির পুকুর।
এখান থেকে তৎকালীন মগ জনগোষ্ঠী সুপেয় পানি সংগ্রহ করত। পুকুরের আশপাশ পরিবেশটাও বেশ চমৎকার। চাইলে এক বিকেল আমখোলাপাড়া পুকুরটির ধারে বসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের আরও যেতে হবে বহুদূর। ভ্যানগাড়ি চলল। চলতে চলতে সাবমেরিন অফিস পার হওয়ার পরেই তাহেরপুরের সৌন্দর্য আমাদের প্রায় গিলে খেল। পথের দুই ধারে সারি সারি প্রাচীন তালগাছ। কোনো কোনো সড়কের দুই পাশে বাবলা। বাবলা গাছগুলো এমনভাবে ওপর দিয়ে মেলেছে, যেন মনে হয় শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোন পথ। আদতে এর সৌন্দর্য ও দেখার পর মনের অনুভূতি লিখে বোঝানো দায়।
যাই এবার লেম্বুর বনের পথে। বেড়িবাঁধ সড়কের বেহাল দশা হলেও যাওয়ার পরে নিমিষেই পথের ক্লান্তি উবে যায়। প্রায় ১ হাজার একর আয়তনের লেম্বুর বনে লেবু গাছের দেখা না মিললেও, এখানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ যেমন কেওড়া, গেওয়া, গোরান, কড়ই ও গোলপাতা। এর মধ্যে সৈকত লাগোয়া কিছু কিছু মৃত গাছের আকৃতি দেখলে মনে হয় যেন কোনো প্রাগ ঐতিহাসিক যুগে ফিরে গিয়েছি। এক কথায় অসাধারণ প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা পুরো লেম্বুর বন। ইতোমধ্যে পশ্চিমাকাশে দিনের তেজি সূর্যটা লালিমা ছড়িয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে এক অভূতপূর্ব নান্দনিক দৃশ্য। ভাটার ফলে শান্ত সাগরের দিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়িতে, মৃদু হাওয়ায় এবার ভ্যান চলে আন্ধারমানিকের দিকে। মাগরিবের ওয়াক্ত হলে সৈকত ঘেঁষা মসজিদে নামাজ পড়ে সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া বিক্রির জন্য পসরা মেলে থাকা দোকানি থেকে কিছু কিনে ফ্রাই করতে দিই।
চোখের সামনেই তেলে ভাজা মচমচা কাঁকড়া। খেতেও বেশ স্বাদ। চারদিক অন্ধকার জেকে বসলে আলীপুরের দিকে ফিরি। রাতের খাবার খেয়েই রুমে ঢুকে ঘুমের প্রস্তুতি। উঠতে হবে ভোর ৪টায়। টার্গেট কাউয়ার চর থেকে সূর্যোদয় দেখা। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। মরিচ পোড়া ঘুম দিয়েই ঠিক ৪টার কিছু পড়ে উঠে পড়ি। সাফসুতর হয়েই বেরিয়ে পড়ি। যেতে যেতে লক্ষ্মীর বাজার গ্রামের সুন্দর উঠানওয়ালা একটি মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করে নিই। প্রার্থনা আমার প্রভুর জন্য, আমাকে তার সৃষ্টি দেখার সৌভাগ্য দান করেছেন। নামাজ পড়েই ছুটতে শুরু করি। কিন্তু নাহ! গঙ্গামতির চর পর্যন্ত পৌঁছতেই পুব আকাশে একরাশ মেঘমল্লার আগমনে সূর্যোদয় দেখা ভেস্তে যায়। তাতে কী? একটা সৌন্দর্য মিছ হয়েছে আরো দশটা প্রকৃতির রূপ চোখে ধরা দেবে তা নিশ্চিত।

ফ্রেশ একটা ডাবের পানি পান করে এবার ভাড়ায় টানা রুবেলের মোটরবাইকে চেপে বসি। চলছে সে সৈকতের বালুকাময় বুক বেয়ে। ডানে সাগর। বামে দীর্ঘ ঝাউবন। যাচ্ছি আর থামছি। মূলত অবারিত প্রকৃতি আমাদের থামতে বাধ্য করছে। অনেকটাই হারিয়ে যাওয়া সাগরলতা কাউয়ার চরে প্রচুর দেখা মিলল। ছুটে চলা লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ। শব্দ পেলেই গর্তে লুকিয়ে পড়া। পায়রা নদীর মোহনা। খেয়া জালে মাছ শিকার। উত্তাল সাগরের শান্ত রূপ। এরকমটা দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই কাউয়ার চর সৈকতের শেষ সীমা পর্যন্ত। বাইক ছেড়ে ঢুকে যাই ঝাউ বনের ভেতরে। প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ ঝাউবনের সৌন্দর্য বর্ণনাতীত।
যাই এবার কাউয়ার চরের আরেক সৌন্দর্যের আধার বটতলীর হামিদ সি প্যালেস। যাওয়ার আগে সাগর থেকে ধরে আনা ইলিশ দিয়ে খিচুড়ি নামমাত্র মূল্যে সকালের নাশতা সেরে নিই। ডুবো তেলে নিজ হাতে ইলিশ ভাজতে পেরে যারপরনাই খুশি হয়ে ভ্যানে উঠে বসি। সৈকত লাগোয়া বেড়িবাঁধ সড়কের দুপাশে মনোরম সারি সারি বাবলা গাছের ছায়া ঘেরা নির্জনতায়, মাত্র ১০ মিনিটে ভ্যান পৌঁছে হামিদ প্যালেসের দোরগোড়ায়। প্রথম দেখাতেই চোখের শান্তি। ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে প্রবেশ করতে থাকি। প্রবেশদ্বারের দুপাশে আকাশমনি বৃক্ষ। ভেতরটাতে লম্বু গাছের বাগান। নান্দনিক ডিজাইনের দুতলা বাংলো।
এর ছাদ থেকে ঝাউবনসহ পুরো প্যালেসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নজরে আসে। প্রায় ৩০০ বিঘা জমির ওপর প্রচুর তালগাছ। প্যালেসটাকে তালবাগান বললেও ভুল হবে না। রয়েছে মাছের খামার। যেখানটাতে দাঁড়ালে মাছের লম্পঝম্পর দেখা মেলে। আরও রয়েছে খাঁটি দেশাল গরুর বহর। অচেনা স্বর্ণ-৫ জাতের ধানের চাষাবাদ। বাতাসে ধান গাছের দোল। এসব মিলিয়ে ভ্রমণে যাওয়া শহুরে জনগোষ্ঠীর জন্য তা হবে বাড়তি পাওনা। আদি ঢাকার ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ হামিদুর রহমান হামিদ প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ হতে এটা তিলে তিলে পরম যত্নে গড়ে তুলছেন। যা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাউয়ার চর ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের বেশ বিনোদিত করবে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা-কুয়াকাটা সরাসরি বাস চলাচল করে। কুয়াকাটা থেকে মোটরবাইক, অটো বা ভ্যানগাড়িতে কাউয়ার চরে পৌঁছানো সম্ভব। সকালে গিয়ে দুপুরের মধ্যেই ফেরা যাবে।
থাকা-খাওয়া
কুয়াকাটায় প্রচুর হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। খাবার হোটেলও মানভেদে প্রচুর। কাউয়ার চরে থাকতে চাইলে নিজস্ব তাঁবুতে বা স্থানীয়দের সহযোগিতায় অথবা মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বে গঙ্গামতি।
টিপস
ভ্রমণ শুধু বিনোদন কিংবা নয়নাভিরাম প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভ্রমণকালীন আরও উপভোগ করতে হয় ঘুরতে যাওয়া অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার, মানুষের যাপিত জীবন, সামাজিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যথাসাধ্য সম্যক ধারণা লাভ করার মাধ্যমে। ভ্রমণ মূলত নির্মল সুস্থ মানসিক বিনোদনের পাশাপাশি, জীবনের বাস্তবমুখী উচ্চতর শিক্ষা।
/রোদসী

.jpg)