রাত বারোটা। শহরের ফাঁকা রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছি টিএসসির দিকে আমরা চারজন। দুজন গায়ক, আর একজনের অবস্থান ঠিক পুরোপুরি জানি না। গায়ক দুজন ভালো গান করে, যদিও তারা কোনো পেশাদার শিল্পী নন। আমরা চারজনই সিগারেট টানছি আর হাঁটছি।
গায়ক আকাশ ভাই মাঝেমধ্যে মৃদু স্বরে গেয়ে যাচ্ছেন- ‘ভালোবাসার এই কিরে খাজনা, দিয়ে ফাঁকি ওরে পাখি যতই ডাকি আর ফেরে না’। আমি নিজের সঙ্গে নিজে বিড়বিড় করে বলছি- ‘আছেন কোথায় স্বর্গপুরে কেহ নাহি তার ভেদ জানে, কেনো জিজ্ঞাসিলে খোদার কথা দেখায় আসমানে’। হেঁটে যাচ্ছি চারজন। শহরটাকে মনে হচ্ছে কত চেনা, কত আপন। ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো এবং রাস্তার পাশের কাঠবাদাম গাছের পাতাগুলো যেন আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে- শব্দহীনতায় এই শহরের কোনো মূল্য নেই, শব্দই শহরের প্রাণ। গান বন্ধ করে আকাশ ভাই থমকে দাঁড়ান, সঙ্গে আমরাও।
বারো-তেরো বছরের একটা ছেলে, রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে কী জানি লিখছে। আচমকা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ছেলেটি বোকা হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে হাতের খাতা-কলমটি ছাপিয়ে নেয়। আকাশ ভাই প্রশ্ন করে—
তুমি কী করছো এখানে?
ছেলেটি মিহি স্বরে উত্তর দেয়—
- এই যে বসে আছি।
- তোমার নাম কী?
- আমার নাম কোলাহল।
- তুমি এত রাতে এখানে কী করছো?
- এই যে বসে আছি।
- যাবে কোথায়?
- কোথাও না।
- মানে! রাতে থাকবে কোথায়?
- এখানেই।
- এখানেই থাকবে?
- হ্যাঁ।
- খাওয়া-দাওয়া করো কোথায়? পড়াশোনা করো?
- খাওয়া-দাওয়া করি ওইখানে, ওই টিএসসির মোড়ে, আর ওইখানেই পড়ি।
- তোমার বাবা-মা নাই?
- বাবা নাই, মা আছে।
- মা কোথায়?
- মা গেছে গা।
- কোথায় গেছে?
- অন্য বেটার সাথে।
- তোমার আর ভাই-বোন নাই?
- না, জানি না।
- তো তুমি এখানে কীভাবে থাকবে, বিছানা কোথায়?
- বিছানা নাই, একটা গামছা ছিল। কে জানি নিয়া গেছে। বলেই ফিক করে হেসে উঠল ছেলেটি।
আমরা সবাই এতক্ষণ ওর সব কথা শুনছিলাম। আমি একটু অবাক হলাম- গামছাটা কে জানি নিয়ে গেছে বলে আর হেসে ওঠা দেখে! ‘জীবনে যার কিছুই নাই সেই সবচেয়ে সুখী, শূন্যতার মাঝেই চমৎকার আনন্দ।’ এটা আমি এখন উপলব্ধি করলাম। শূন্যতার মাঝে আনন্দ না থাকলে, ছেলেটির কিছুই নাই। সর্বশেষ ছিল একটি গামছা, সেটাও কে জানি নিয়ে গেছে তা এত আনন্দের সঙ্গে বলতে পারত না। আমি বললাম-
- খাতায় কী লিখছিলে?
- না, কিছু না।
- কিছু তো একটা।
- না, কবিতা লিখছিলাম।
- কবিতা! আমি ভয়ংকরভাবে অবাক হলাম। আমি খাতাটা নিয়ে উচ্চৈঃস্বরে কবিতাটা পড়তে লাগলাম।
মা, আমি তোমার মাসুম বাচ্চা
কেন গেলা ছাইড়া?
আমি এখন রাস্তায় থাকি
তোমার আপন ছিলাম আমি
তুমি কেমন মা? কেমন মা?
এলোমেলো কাটাছেঁড়া লাইনগুলো আমি পড়ে ভীষণ আহত হলাম। ‘কবিতা কোনো আবেগ নয়, হৃদয়ের তাজা রক্ত।’
আকাশ ভাই ছেলেটিকে কিছু টাকা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি শেষবারের মতো পেছন ফিরে আর একবার ছেলেটাকে দেখে নিলাম। ল্যাম্পপোস্টের বাতিটা মায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে ওর মাথার ওপর আলো নিয়ে, কাঠবাদাম গাছটি শহরটাকে শীতল করে দিতে চাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
শহর একটা টেলিভিশন, যেখানে প্রতিনিয়ত জীবন্ত মুভি প্রচার হয়।
ফকির শাহিন শাহ্
ঠিকানা পাওয়া যায়নি
তারেক
.jpg)
.jpg)