২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর প্রিয় মানুষের জন্মদিনে ১৩টি কদম চারা রোপণের মাধ্যমে সিলেটের শাহ সিকান্দার শাকিরের বৃক্ষরোপণের শুরু। গত ১১ বছরে তার রোপণ করা বৃক্ষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৩২।
প্রায় একক প্রচেষ্টায় বৃক্ষরোপণে শাকির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তিনি ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সিলেট শাখায় অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট পদে কর্মরত আছেন। লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
শাকিরের হৃদয়ে এক অদ্ভুত টান প্রকৃতির প্রতি। গাছ, মাঠ, আকাশ আর মাটির ঘ্রাণে সে খুঁজে পায় জীবনের মানে। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাই’-এর মতো, প্রকৃতির ছায়াতলে বসে সে খুঁজে নেয় আনন্দ আর প্রশান্তি। বৃক্ষরোপণই যেন তার ধ্যান-জ্ঞান, নিজ খরচে গাছ লাগিয়ে এক টুকরো সবুজ ফেরাতে চায় সে পৃথিবীতে। অথচ এই শহরে প্রতিদিনই নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যায় কোনো না কোনো মাঠ, কোনো না কোনো খোলা জায়গা।
.jpg)
তার শৈশবের সেই প্রিয় মাঠটিও একদিন হারিয়ে যায়, দালানের নিচে চিরতরে চাপা পড়ে যায় সবুজ ঘাসের হাসি, মাঠের উচ্ছ্বাস। সেদিন বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠেছিল শাকিরের। অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল সে সেই জায়গাটায়—যেখানে একসময় ফুটবল গড়াত, সাইকেলের চাকা ঘুরত, আর বাতাসে ভেসে বেড়াত বন্ধুর হাসি। সেই ক্ষত থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক অদম্য প্রত্যয়। যতক্ষণ দম আছে, শাকির থাকবে সবুজ ফেরানোর এক নীরব, একনিষ্ঠ যোদ্ধা হয়ে।
প্রিয় মাঠ হারানোর বেদনা শাকিরকে বৃক্ষরোপণে আরও উদ্বুদ্ধ করল। এরপর গাছ লাগানোই হয়ে গেল তার ধ্যানজ্ঞান। মানুষজন পাগল বলত। এসব করে কী লাভ। ফল তো খেতে পারবে না। গাছ বাঁচবে না। শুধু শুধু টাকা নষ্ট। এমন অনেক কথাই বলত। কিন্তু এসব কথা অদম্য শাকিরের অগ্রযাত্রা বিন্দুমাত্র রোধ করতে পারেনি। তিনি তার মতো করে এগিয়ে গেছেন।
সিলেটে বুদ্ধিজীবীদের কবরস্থান ছিল ময়লা, আবর্জনা, জঙ্গলময়। জায়গাটা পরিষ্কার করে সেখানে বেশ কিছু গাছের চারা লাগিয়েছিলেন শাকির। আবার সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনেও শাকিরের লাগানো গাছ শোভা বাড়াচ্ছে। সিলেট শহরের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, কারাগার, সড়ক বিভাজন কিংবা সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ করেছেন শাকির।
একটুখানি ফাঁকা জায়গা পেলেই সেখানে সবুজের সমারোহ ঘটিয়ে তোলেন শাকির। তবে তা এলোমেলোভাবে নয়—যেখানে যে গাছ লাগানো প্রয়োজন, সেটাই বেছে নেন তিনি ভাবনা-ভালোবাসা মিশিয়ে। প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর মিতালি গড়ে তুলেছেন শাকির। আর এই মিতালিতেই তিনি হয়ে উঠেছেন এক নিঃশব্দ বৃক্ষবিশারদ। তার লাগানো গাছের তালিকায় আছে হরেক রকমের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ।
.jpeg)
সিলেট শহরের ডিভাইডারগুলোতে রাধাচূড়া গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে বেড়ে উঠা রাধাচূড়া গাছ থেকে নিয়ে কয়েক হাজার বীজ শাকির বিভিন্ন স্থানে বপন করেন। তিনি কয়েক শ আমের বীজ লাগিয়েছেন। তার লাগানো বীজের সংখ্যা কয়েক হাজার।
শহরে লাগানো গাছ তো গরু-ছাগলের নষ্ট করার সুযোগ নেই। এসব গাছ মানুষই নষ্ট করে। তাই শাকিলের ভাষায় গাছের বড় শত্রু মানুষ। গাছ লাগানো মোটেই কঠিন কাজ নয়। শাকির বলেন, খাওয়ার চেয়েও সহজ কাজ গাছ লাগানো। একটুখানি যত্ন, ভালোবাসা পেলে গাছগুলো তরতর করে বেড়ে ওঠে।
ছুটির দিন তো বটেই। অন্যান্য দিন ফজরের নামাজের পর শাকির বের হন। গোপনে গাছ, বীজ রোপণ করে আসেন। সেই গাছ একসময় অনেক বড় হয়। কেউ জানে না যে এগুলো শাকিরেরই লাগানো। নিজ হাতে লাগানো গাছগুলো যখন বড় হয়, দেখে ভীষণ ভালো লাগে এই তরুণের।
শাকির যেখানে যান সেখানেই বৃক্ষরোপণের চেষ্টা করেন। হোক তা নিজ শহর কিংবা তার বাইরে। তিনি নরসিংদী, চাঁদপুর, চট্টগ্রামে গিয়েছেন। সেখানেও নানা ধরনের গাছ রোপণ করেছেন। এমনকি কুরিয়ার করে নানা জায়গার মানুষকে গাছের চারা উপহার পাঠিয়েছেন তিনি।
শাকিরের বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বর্তমানে অসুস্থ। মা গৃহিণী। শাকিররা তিন ভাই, দুই বোন। সিলেটে তাদের কোনো জায়গাজমি নেই। ভাড়া বাড়িতে থাকেন। চাকরি আর টিউশনির কিছু টাকা খেয়ে না খেয়ে বাঁচিয়ে রাখেন শাকির। সেই টাকায় বৃক্ষরোপণ করেন।
সবার প্রতি শাকিরের একটাই বিনম্র আহ্বান—বৃক্ষরোপণ করুন। তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেই গাছের যত্ন নিতে হবে মমতা ও দায়িত্ব নিয়ে। কারণ, ভালোবাসা আর যত্নেই গড়ে ওঠে সবুজের অপূর্ব সমারোহ, যা আমাদের জীবনকে করে তুলতে পারে আরও প্রাণবন্ত।
তারেক
.jpg)
.jpg)