স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অন্যতম আদি প্রাণী বানর। এরা প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত। মূলত সিমিয়ান প্রাইমেট গণের তিনটি দলের মধ্যে দুইটির সদস্যরা সাধারণভাবে বানর নামে পরিচিত। এই দলগুলো হলো, নতুন পৃথিবীর বানর, পুরাতন পৃথিবীর বানর এবং নরবানর। এদের প্রধানত দেখা যায় দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায়।
বানর, দুষ্টুমি আর অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ডের জন্য সবার কাছে অতি পরিচিত। এ প্রাণীটি খুবই বুদ্ধিমান ও সামাজিক জীব। বানরের বেশির ভাগ প্রজাতিই গাছে বাস করে। এদের কেউ কেউ নিরামিষভোজী এবং কেউ কেউ সর্বভুক। কিন্তু এদের বাসস্থান ও খাদ্যে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০০টিরও বেশি প্রজাতির বানর রয়েছে। তবে অন্য একটি সূত্র বলছে, প্রায় ৫০৪ প্রজাতির বানরজাতীয় প্রাণী রয়েছে। যদিও এদের মধ্যে অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। তেমনি এক প্রজাতি হলো এম্পেরর তামারিন (Emperor Tamarin)।
সম্রাট তামারিন (Tamarinus imperator), যারা ‘গোঁফের বানর’ ডাকনামে পরিচিত। এ ছাড়াও এরা কালো চিহ্নযুক্ত সম্রাট তামারিন নামে পরিচিত। এই প্রজাতির বানর দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী। পূর্ব পেরু, উত্তর বলিভিয়া এবং উত্তর-পশ্চিম ব্রাজিলীয় রাজ্য একর এবং আমাজনাসের দক্ষিণ-পশ্চিম আমাজন নদীর অববাহিকায় এদের পাওয়া যায়। এরা সামাজিক জীব। দলবদ্ধ হয়ে এরা বাস করে। সাধারণত ৮ থেকে ১০ জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বাস করে।
.jpg)
এম্পেরর তামারিন মূলত ক্ষুদ্র আকৃতির একটি বানর। এদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এদের মুখে বড় বড় সাদা গোঁফ। স্ত্রী, পুরুষ কিংবা শাবক সবারই সাদা গোঁফ রয়েছে। এদের দেহের পশম ধূসর-বাদামি রঙের হয়ে থাকে এবং লেজ গারো কমলা রঙের হয়। ঠোঁট ও নাকের অংশ হালকা গোলাপি রঙের হয়ে থাকে। অন্যান্য বানরের মতো এদেরও নখর রয়েছে, যা তাদের গাছপালা বেয়ে উঠতে এবং ডালপালা শক্ত করে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এদের বুকে এবং যৌনাঙ্গে ঘ্রাণগ্রন্থি থাকে।
এম্পেরর তামারিন প্রাণীগুলোর দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৩-২৬ সেন্টিমিটার বা ৯-১০ ইঞ্চি এবং লেজ ৩৫-৪১.৫ সেমি বা ১৩.৮-১৬.৩ ইঞ্চি লম্বা হয়। এদের ওজন প্রায় ৫০০ গ্রাম বা ১৮ আউন্স।
এই প্রাণীর সাধারণত আয়ুষ্কাল ১০ থেকে ২০ বছর বয়স হয়ে থাকে। এরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাপ্ত বয়সে পরিণত হয়। মাত্র ১৬ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যেই প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে ওঠে। স্ত্রী এম্পেরর তামারিনরা ১১২-১৪০ দিনের মধ্যে গর্ভধারণ করার সক্ষমতা অর্জন করে। গর্ভকালীন সময় থাকে সাড়ে ৪ মাস এবং আন্তঃপ্রজনন ব্যবধান হয় ৬ মাস। এদের প্রজনন সাধারণত বর্ষাকালে বেশি হয়ে থাকে। কারণ এই সময় খাবারের আধিক্য থাকে। এই প্রাণীরা একত্রে দুটি সন্তান জন্মদান করে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও ঘটে, কখনো কখনো এরা একটি বা তিনটি সন্তানও জন্ম দিতে পারে। সন্তান লালন-পালনে বাবা-মা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাবারা সাধারণত সন্তানদের দেখাশোনা, বিপদ থেকে রক্ষা এবং পিঠে করে বহনের কাজ করে থাকে। এ ছাড়াও শিশুরা কাঁদলে সান্ত্বনা ও আশ্বাস দিয়ে থাকে। অন্যদিকে মায়েরা শুধু স্তন্যপান করানোর দায়িত্ব পালন করেন।
এম্পেরর তামারিনরা ধৈর্যশীল সুযোগসন্ধানী। এরা সর্বভুক প্রাণী। পোকামাকড়, মাকড়সা, শামুক, পাখির ডিম, গাছের ব্যাঙ, টিকটিকি এবং ছোট ইঁদুর তাদের মাংসাশী তৃষ্ণা মেটায়। এ ছাড়া বিভিন্ন উদ্ভিদের রস, মাড়ি, ল্যাটেক্স, ফুল-ফল এবং মধু খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
.jpg)
আকৃতিতে ছোট হওয়ার কারণে তাদের জীবনের আশঙ্কা অনেক। সাপ, বড় বন্য বিড়াল এবং কুকুরের মতো শিকারিদের খাদ্য হয়ে থাকে এরা। সতর্কতা বাণী এবং সাধারণ সংলাপের ক্ষেত্রে তারা উচ্চ কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে থাকে, যা ৪৯২ ফুট বা ১৫০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে পৌঁছায়। এ ছাড়াও এরা দ্রুতগতিতে দৌড়ানোর ক্ষমতা রাখে। এরা ঘণ্টায় ২৪ মাইল বেগে ছুটতে পারে। যা তাদেরকে শিকারের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
দাঁড়ি ছাড়াও তাদের বিশেষ আরও একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এরা সুগন্ধি নিঃসৃত করতে পারে। চলাচলের পথে এরা সুগন্ধি নিঃসৃত করে তাদের যাতায়াত পথকে চিহ্নিত করে।
এম্পেরর তামারিন নামকরণ করা হয়েছে জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেমের নামানুসারে। তার মুখেও একটি খুব বড় গোঁফ ছিল। ১৯০৭ সালে যখন এম্পেরর তামারিন আবিষ্কৃত হয় তখন প্রয়াত সুইস-ব্রাজিলিয়ান প্রকৃতিবিদ-প্রাণিবিদ এমিল অগাস্ট গোয়েল্ডি এই প্রাণীটিকে সম্রাট নাম দিয়েছিলেন।
এই প্রাণীরা পরিবেশ রক্ষায়ও যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে থাকে। তাদের খাওয়া ফলমূলের বীজ মলের দ্বারা ছড়িয়ে দেয়। এতে করে বনায়ন সৃষ্টি হয়, সেই সঙ্গে গড়ে ওঠে তাদের আবাসস্থল। এম্পেরর তামারিন বামন বানর। প্রকৃতির নানা জীব ও বৈচিত্র্যের একটি বিশেষ অংশ হচ্ছে এই সম্রাট তামারিনরা। প্রকৃতির এই প্রাণীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)