ডিম খেতে কে না পছন্দ করেন। পছন্দ ও চাহিদার কারণে রান্নাঘরের সহজ একটা উপকরণ হিসেবে ডিমের নাম আছে সবার ঊর্ধ্বে। কিন্তু শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, এর বাইরেও ডিমের ব্যবহার রয়েছে। ডিমের এই ব্যবহার নন্দিতের চেয়ে নিন্দিত বেশি।
প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বিক্ষোভের মঞ্চে ডিম বহুবার পরিণত হয়েছে একটি প্রতীকী অস্ত্রে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে রাজনীতিকদের দিকে ডিম ছোড়ার ঘটনা বেড়েছে। তবে যদি ভেবে থাকেন এটি নতুন কোনো প্রবণতা তাহলে ভুল করবেন। বরং এর ইতিহাস বহু পুরোনো এবং বৈশ্বিক।
ভিন্ন ভিন্ন কারণে রাজনীতিবিদদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে মানুষ ডিম ছুড়ে মেরেছে। এমনকি আদালত প্রাঙ্গণে আসামিদের ওপর প্রতিবাদ জানাতে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা বারবার ঘটছে। মধ্যযুগে বন্দিদের ওপর জনসমক্ষে ডিম নিক্ষেপ করা হতো বলে লোকমুখে জানা যায়। লিখিত সূত্রে ডিম নিক্ষেপের প্রথম কাহিনি পাওয়া যায় ১৮ শতকের শুরুতে। ওই সময় আইল অব ম্যান দ্বীপে মেথোডিস্টদের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা নথিভুক্ত আছে। আর ১৮৩৪ সালে মার্কিন শহর কনকর্ডে দাসত্ববিরোধী বক্তা জর্জ হোয়াইটারকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়েছিল।
ডিম ছোড়া সব সময় নিরাপদ হয় না। ২০০৪ সালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হলে তিনি গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অনেকে ভেবেছিলেন তাকে হয়তো ইট জাতীয় কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, কিন্তু পরে জানা যায় সেটি ছিল একটি ডিম।
২০১১ সালে আফগানি বিক্ষোভকারীরা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানি কনস্যুলেটদের দিকে ডিম নিক্ষেপ করে। ২০১৩ সালে লন্ডনে একদল বিক্ষোভকারী, প্রয়াত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের কফিন ডিম দিয়ে পরিপূর্ণ করার হুমকি দেয়। যদিও তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে চরম নিরাপত্তার কারণে সেটা তারা করতে পারেনি। একই বছরের আগস্টে ডিমের দাম কমে যাওয়ার প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ইউরোপিয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ফরাসি কৃষকরা রাস্তায় সপ্তাহজুড়ে প্রতিদিন ১ লাখ ডিম ভাঙার শপথ নিয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো- অস্ট্রেলিয়ায় ১৯১৭ সালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী বিলি হিউজকে জনসভায় ডিম মারার ঘটনা এবং ব্রিটেনে ২০০১ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটকে একজন তরুণ কৃষক ডিম নিক্ষেপ করলে প্রেসকটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘুষি দেওয়ার ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
হলিউড অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারকে লক্ষ্য করে টমেটো কিংবা ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে। ২০০৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে গভর্নর নির্বাচনে ভোটের প্রচার চালানোর সময় তার দিকে ডিম নিক্ষেপ করা হয়। অবশ্য তিনি সিনেমার নায়কের মতোই নির্বিকারভাবে হাত দিয়ে ঝেরে ফেলে দেন ডিমটা।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু গেলম্যান এই ধরনের খাদ্য নিক্ষেপের সুন্দর একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। খাদ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট বোনাপিটিট ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি বলেন, “প্রতিবাদ করতে গিয়ে খাবার ছুড়ে মারার কারণ হতে পারে- এটা সস্তা, সহজলভ্য এবং দৃশ্যমান। ‘টমেটো হালকা, নিক্ষেপ করা সহজ, দামও কম। ছুড়ে মারার পর ফেটে গেলে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি জাগায়। ডিমের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই, ফেটে গিয়ে বিচ্ছিরি পরিস্থিতি তৈরি করে। খাবার ছুড়ে মারাকে সাধারণত অহিংস প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়। যেমন- পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়লে, তারা গুলি করতেও পারে। তবে ডিম বা টমেটো মারলে গুলি করাটা পুলিশদের ‘ফুলিশ’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হবে। তাই আমার মনে হয় এই খাবার ছুড়ে মারার একটা প্রতীকী মূল্য রয়েছে।”
ডিমের মাধ্যমে প্রতিবাদ শুধুই ক্ষোভের প্রকাশ নয়, এটি সস্তা এবং দ্রুত নজর কাড়ার কারণে জনগণীয় বিক্ষোভের এক কার্যকর প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তারেক/
.jpg)