কম্পিউটার প্রযুক্তির জগতে বহুল পরিচিত নাম Hewlett-Packard বা সংক্ষেপে HP। আধুনিক কম্পিউটার, প্রিন্টার ও প্রযুক্তি পণ্যের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা এই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণের পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ গল্প, একটি সাধারণ মুদ্রা নিক্ষেপ বা কয়েন টস!
১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করছিলেন দুই তরুণ- William Hewlett এবং David Packard। ১৯৩৫ সালে পড়াশোনা শেষ করার পর থেকেই তারা প্রযুক্তি নিয়ে কিছু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৯৩৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার Palo Alto-এর একটি ছোট গ্যারেজে মাত্র ৫৩৮ ডলার মূলধন নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। এই গ্যারেজটি পরবর্তী সময়ে ‘সিলিকন ভ্যালির জন্মস্থান’ হিসেবে খ্যাতি পায়। কিন্তু কোম্পানি শুরু করার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল–কোম্পানির নাম কী হবে?
দুই প্রতিষ্ঠাতার নামেই কোম্পানির নাম রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রশ্ন ছিল–আগে কার নাম থাকবে? ‘হিউলেট-প্যাকার্ড’ নাকি ‘প্যাকার্ড-হিউলেট’? বিষয়টি সহজভাবে সমাধান করতে তারা আশ্রয় নেন একটি কয়েন টসের। ভাগ্যের খেলায় জয়ী হন বিল হিউলেট। ফলে কোম্পানির নাম হয় ‘হিউলেট-প্যাকার্ড’, যা আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘HP’ নামে।
আরো পড়ুন: মোটা হওয়া যেখানে অপরাধ!
এই ছোট্ট সিদ্ধান্তই একদিন বিশ্ব প্রযুক্তি ব্র্যান্ডের পরিচয় হয়ে উঠবে- তখন হয়তো তারা নিজেরাও তা ভাবেননি।
শুরুতে HP মূলত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরি করত। তাদের প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য পণ্য ছিল একটি অডিও অসিলেটর, যা Walt Disney Company-এর মতো প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেছিল। ধীরে ধীরে তারা প্রযুক্তি জগতে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে থাকে।
যদিও কোম্পানির যাত্রা শুরু ১৯৩৯ সালে, কম্পিউটার জগতে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে আরও পরে। ১৯৬৬ সালে তারা বাজারে আনে HP 2116A, তাদের প্রথম কম্পিউটার। এরপর ১৯৬৮ সালে আসে HP 9100A, যা অনেকের কাছে বিশ্বের প্রথম পার্সোনাল কম্পিউটার বা বৈজ্ঞানিক ক্যালকুলেটর হিসেবে বিবেচিত। এই দুটি পণ্যই HP-কে প্রযুক্তি শিল্পে একটি শক্ত অবস্থান এনে দেয়।
বলাবাহুল্য, তারা দুজনই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত। তারা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফ্রেডরিক টারম্যানের কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পান। শুরুতে HP মূলত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরি করত। কোম্পানিটি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি তৈরি করে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ওয়াল্ট ডিজনি প্রোডাকশনস হিউলেট-প্যাকার্ডের কাছ থেকে ১৯৪০ সালে আটটি অডিও অসিলেটর কিনে, যার মাধ্যমে নির্মিত হয় বিশ্ববিখ্যাত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ফ্যান্টাসিয়া। এটি ছিল কোম্পানির প্রথম বড় রকমের বিক্রি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিউলেট-প্যাকার্ড সামরিক অস্ত্র তৈরি করে। যা সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে এবং সিগন্যাল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ সময় তারা নৌবাহিনীর গবেষণার কাজের সঙ্গে কাজ করে এবং কাউন্টার রাডার প্রযুক্তির বিকাশ সাধন করে। ১৯৫১ সালে উচ্চ দ্রুতিসম্পন্ন কম্পাঙ্ক মাপক যন্ত্র তৈরি করে। যোগাযোগ কমিশন নীতিমালা অনুসরণ করে এটি এফএম বেতার ও টেলিভিশন প্রচারণা কেন্দ্রগুলোয় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ১৯৬৯ সালে প্যাকার্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন প্রতিরক্ষাবিষয়ক ডেপুটি সেক্রেটারি পদে মনোনয়ন দেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে HP শুধু একটি কোম্পানি নয়, বরং একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রতীক হয়ে ওঠে। কম্পিউটার, প্রিন্টার, সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সমাধানের মাধ্যমে তারা বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব ধরে রাখে।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে। ২০১৫ সালে Hewlett-Packard দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত হয়। একটি হলো HP Inc., যা ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও প্রিন্টার নিয়ে কাজ করে। অন্যটি Hewlett Packard Enterprise (HPE), যা সার্ভার, স্টোরেজ এবং এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তি খাতে কাজ করছে।
HP-এর নামকরণের এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়–কখনো কখনো বড় ইতিহাসের পেছনে থাকে খুব সাধারণ একটি মুহূর্ত। একটি ছোট সিদ্ধান্ত, একটি মুদ্রা নিক্ষেপ; যা বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে HP শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়; বরং উদ্ভাবন, সাহসিকতা এবং বন্ধুত্বের এক অনন্য প্রতীক। দুই তরুণের স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং একটি কয়েন টস–এই তিনের মিলনেই গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
তারেক/
.jpg)