তখন ঢাকার শাহজাহানপুর ভাড়া বাসায় থাকি। বাড়ির মালিকদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে বড়ই নাখোশ হয়েছি। বাড়িতে কয়জন মেহমান এল, কে বেশি পানি খরচ করে, তার খবরদারি করা লাগবে। রাত ১১টার পর গেট বন্ধ। কিন্তু মিডিয়া জগতে কাজ করে ১১টায় নীড়ে ফেরা কি সম্ভব? এ জন্য কৈফিয়ত নিত্যদিনের ঘটনা। তিনি অবশ্যই সদালাপী। আবার গল্প-গুজবও করেন ভালো। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার বেলায় ষোলো আনা তার পক্ষে।
ভদ্রলোক সিনেমাপাড়ায় নাপিত সাপ্লাই করতেন। ঢাকার বড় মার্কেটে তার একটা অত্যাধুনিক সেলুন রয়েছে। তাই বুদ্ধি সব সময় ষোলো চুঙ্কার করে থাকেন বাড়ির মালিক এ ভদ্রলোকটি। এটা না হয় মেনে নেওয়া যায় কিন্তু যখন কোনো ঘরে একটা সুন্দরী ভাড়াটে উঠেছেন সেখানে একটু নক দিয়ে অহেতুক খোঁজখবর নেওয়া, তা তো আর মেনে নেওয়া যায় না। তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ অনেকেরই। তাই মনের দুঃখে অগত্যা ভাড়া বাড়ি ছেড়ে একটা প্লট কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখনকার সময়ে ঢাকার আশপাশে জায়গা-জমির মূল্য তুলনামূলক একটু কমই ছিল। তাই ঝিল মসজিদ থেকে ট্রেন লাইন পাড় হয়ে অপর প্রান্ত থেকে বন্ধের দিনগুলোয় ডেমরা এলাকায় জমির খোঁজ করতে থাকি। কিন্তু ভালো কাগজপত্রের জমি পাওয়া যেন একটা চাঁদ হাতে পাওয়ারই মতোই। তখন ডেমরা-সারুলিয়ার সুলতানা কামাল ব্রিজ হয়নি। ব্রিজের পিলারগুলো তৈরি করে রেখে দিয়েছেন। জাহাজ চলাচলের জন্য দেশের নামকরা শিল্প গ্রুপের জাহাজ চলাচলের জন্য ব্রিজটি আরও উঁচু করতে হবে। তাই কাজ বন্ধ।
বাস থেকে ডেমরার সেই ব্রিজের নিচে নেমেছি অমনি দেখি একটা বাচ্চা ছেলেকে একজন দম্পতি জেরা করছেন। কৌতূহলবশত আমি বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছি। কিন্তু তাদের জেরায় ছেলেটি কিছুই বলছে না। ছেলেটি অনেকক্ষণ ধরে এ দম্পতির পেছন পেছন আসছে। তাদের ফলো করতে দেখেই দম্পতি ছেলেটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
আমি তার কাঁধের ব্যাগটি খুলতেই তা থেকে ছোট একটা ব্রাশ আর টুথপেস্ট পেলাম।
আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি কোথায় যাবে? বলল, তাদের সঙ্গে যাব (দম্পতিদের সঙ্গে)। আমি বললাম, তুমি তাদের চেনো, ছেলেটি বলল, না। তোমার বাড়ি কোথায়? সে কিছু বলছে না।
এমন করে আধা ঘণ্টা কেটে গেল সময়। ছেলেটির মুখটি খুবই মায়াবী। বয়স ছয়-সাত বছর হবে। নিষ্পাপ চেহারা। সে কোথা থেকে আসছে তাও বলছে না। আমি জমি কিনতে এসেছি তা ফেলে ছেলেটির পরিবারের খোঁজখবর করছি। অনেকক্ষণ জেরার পর সে অবশেষে বলল, তার বাড়ি মানিকনগর। সে ডেমরা এলাকার একটি মাদরাসায় পড়ে। অগত্যা নিজের কাজ ফেলে তাকে নিয়ে মানিকনগর যাওয়ার জন্য বাসে উঠে বসলাম। মানিকনগর নিয়ে গলির ভেতর ঢুকতেই বলল, এ গলিতেই তাদের বাড়ি। এক সময় সে গলির শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছাই কিন্তু না, তার বাড়ি পাওয়া গেল না। আবার অন্য গলি ধরে খোঁজ করতে শুরু করলাম। এবার সে এ গলিতেই তার বাড়ি বলে জানায়। তাকে নিয়ে সে গলিও ঘুরে আসি। নাহ্, তার বাড়ি-ঘরের বা পরিবার-পরিজনের কোনো হদিস এবারও পেলাম না। আবার অবুঝ এ বাচ্চাটিকে একা ফেলে রেখেও আসতে পারছি না।
ইতোমধ্যে মানিক নগর এসে ঘণ্টা ঘানিক সময় ব্যয় করে ফেলেছি। এবার অন্যদিক দিয়ে খোঁজা শুরু করলাম। এবারও বলে এ গলিতেই তাদের বাড়ি। গলি শেষ হতেই দেখি একটা বাঁশের সাঁকো। সামনে খাল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এলোমেলোভাবে বাচ্চাটিকে নিয়ে মানিকনগর ঘুরছি আর ঘুরছি। হঠাৎ করেই সে বলে বসে, ওইটা আমার খালা। সামনে চেয়ে দেখি একজন চা বিক্রেতা নারীকে সে খালা বলে ডাকছে। ছেলেটির চেহারা সুরতের সঙ্গে এ খালার সঙ্গে মেলাতে পারছি না। ছেলেটিকে দেখতে একটা রাজপুত্রের মতো মনে হয়। চেহারা-সুরতে অভিজাত শ্রেণির কোনো ঘরের ছেলে বলেই আমার কাছে মনে হয়। আমি গিয়ে তার খালার কাছে যেতেই ওই নারী একটা লাঠি নিয়ে ছেলেটিকে তেড়ে এল মারতে। আমি তো অবাক। তার খালা বলল, সে মাদরাসা থেকে মাঝে মাঝেই পালায়। আর তার কাছে এসে আশ্রয় নেয়। এ নিয়ে তার মায়ের সঙ্গে আর খালার কয়েক দফা ঝগড়াঝাঁটি হয়ে গেছে। তাই ছেলেটিকে দেখেই তার খালা লাঠি নিয়ে তেড়ে এল।
আমি আশপাশের মানুষজনের কাছ থেকে ছেলেটি মায়ের বিষয় জানতে বিশদভাবে জানতে চাইলাম। সেখানকার একজন স্থানীয় ভদ্রলোক বলল, তার মাকে একজন অফিসার বিয়ে করেছিল। তার ঘরেই মূলত এ ছেলেটির জন্ম। ছেলে জন্ম হওয়ার পর থেকে সে সাহেব ভদ্রলোকটি তার মায়ের আর কোনো খোঁজখবর নেননি। এদিকে মধুলোভীর মধু পান শেষে মা-ছেলেকে ফেলে রেখে গেছে। তার মা তাকে ডেমরার একটি মাদরাসায় ভর্তি করে দিয়ে এসেছেন। মাসে মাসে শুধু ছেলের খরচ দিতে মাদরাসায় যান তার মা। ছেলেটির বয়স কম থাকায় মাঝে মাঝেই সে পালায়। মাকে ছাড়া সে একা একা থাকতে পারে না। আবার মাও তার কাছে রাখতে পারেন না বিশেষ কারণে।
এভাবেই জোছনা রাতের মায়াবী আলো কালো মেঘের ভেলায় ঢেকে যায় ছেলেটির জন্ম পরিচয়। জগতের আলো-আঁধারী খেলায় কত অঘটনের জন্ম নেয় তা বলা এ ক্ষেত্রে বড়ই মুশকিল। কেউ যদি প্রকৃতির নিয়ম ভেদ করতে চায়, তাহলেই অঘটনের জন্ম লাভ করে থাকে।
মিতা। অষ্টাদশী সুন্দরী ও সুশ্রী বলা চলে। এক হারা গড়ন। মুখটা লম্বা এবং মায়াবী। শাড়িতে মিতাকে ঠিক অপ্সরী লাগে। একবার তার দিকে চোখ পড়লে ফেরানো যায় না। কাজল কালো চোখ। পুরো অবয়বে মিষ্টি একটা লাবণ্য আছে। তার রূপ-সুধা পান করে তাকে একটা বিষবৃক্ষ ধরিয়ে দিয়ে গেছেন মতিঝিল পাড়ার একজন সাহেব। একদিকে মিতার নিজের খাওয়া-পড়া অন্যদিকে ছেলেটির মাদরাসার খরচ বহন করতে হয় তাকে। তাই তো তিনি এখন ভিন্ন জগতের বাসিন্দা হয়েছেন। মধু খেকোরা মিতাকে নিয়ে হানিমুন ট্যুরে যান। আনন্দ-উল্লাস করেন। কয়েক দিন মজা করে ফিরে আসেন। কিন্তু মিতা সে আনন্দের রসদ জোগান দেন। এতে যা পান তা দিয়েই মিতা আর তার ছেলের জীবন চক্র ঘুরতে থাকে। তাতেই তাদের আহার জোটে। আগে মিতা ছেলের খরচ দিতে নিয়মিত মাদরাসায় যেতেন। কিন্তু মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষকের লোলুপদৃষ্টি তার ওপরে পড়ায় তিনি এখন আর নিজে মাদরাসায় যান না। সে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হলেও ছেলের মাদরাসার কারও সঙ্গে অনৈতিকতার বেড়াজালে বন্দি হতে রাজি হননি তিনি।
মানুষের জীবন চক্র কত কিছুর সঙ্গে মাকড়সার জালের মতো বন্দি হয়ে আছে তা মিতাকে না দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই। মিতা আর তার ছেলেকে সমাজে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অনৈতিকতার প্রেক্ষাপট ঘিরে। সাহেবরা তাদের বিবেকবর্জিত আয়ে এভাবে আমাদের সমাজে একেকটি মিতা তৈরি করে সটকে পড়েন। কয়েক মিনিটের আনন্দের জন্য একটা বিষবৃক্ষের জন্ম দিয়ে উড়াল দেন। তা বয়ে নিতে নিতে বেলা শেষ হয়ে যায় অষ্টাদশী মিতার। এভাবেই মায়াবী জোছনা একেবারে অন্ধকারে ঢেকে যায়। মিতার ছেলেটা সমাজের কাছে বিষবৃক্ষ হলেও তার কাছে পরম আদরের ধন। বাবা শুধু ক্ষণিকের সময় উপভোগ করেছেন। তাতে যে ফল লাভ হয়েছেন তা তিনি ভালোবাসেননি। সেটা এখন সমাজের কাছে একটা বিষবৃক্ষের ফল। এ বিষবৃক্ষটি তার মায়ের কাছে ফেরাতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে বড় ধরনের একটা স্বস্তি। ভালো থাকুক মিতা। ভালো থাকুক বিষবৃক্ষ।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)