দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন বর্ষারণ্যের গভীরে একটি লাজুক ও ব্যতিক্রমী প্রাণীকে নীরবে ঘুরতে দেখা যায়। একদম শান্ত-সহজ প্রকৃতির এই প্রাণীর শূকরের মতো শরীর, ছোট হাতির শুঁড়ের মতো নাক আছে। যা তার আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য। একটি ছোট ঘোড়ার আকারের হওয়ায় একে দেখতেও অদ্ভুত লাগে। ছোট্ট শান্ত স্বভাবের এই প্রাণীর নাম টাপির।
টাপিরদের প্রায় ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলা হয়, কারণ তারা প্রায় ২ কোটি বছর ধরে টিকে আছে। বর্তমানে এদের চারটি প্রধান প্রজাতি রয়েছে- ব্রাজিলিয়ান টাপির, মালয়ান টাপির, বেয়ার্ডের টাপির এবং পার্বত্য টাপির। প্রতিটি প্রজাতি বন, তৃণভূমি বা জলাভূমিতে বাস করে এবং সর্বদা জলের উৎসের কাছাকাছি থাকে। তাদের সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো তাদের অন্যরকম মুখ, যা একটি ছোট শুঁড়ের মতো কাজ করে। টাপিররা এটি ব্যবহার করে পাতা, ফল এবং জলজ উদ্ভিদ ধরে খায়। তারা চমৎকার সাঁতারু এবং জাগুয়ার বা বাঘের মতো শিকারির হাত থেকে বাঁচতে নদীর তলদেশ ধরেও হাঁটতে পারে।
ভারী দেহ এবং বেশ খাটো পায়ের টাপির ১.৩ থেকে ২.৫ মিটার লম্বা হয় এবং কাঁধ পর্যন্ত প্রায় ১ মিটার উঁচু হয়। এদের চোখ ছোট, কান খাটো ও গোলাকার এবং মুখ থেকে একটি ছোট মাংসল শুঁড় বা কাণ্ড বেরিয়ে আসে, যা ঠোঁটের ওপর দিয়ে ঝুলে থাকে। টাপিরের পায়ে তিনটি কার্যকরী আঙুল থাকে। এদের শরীরের লোম ছোট এবং পাতলা হয়। তবে সামনের পায়ে বেশ ঘন থাকে।
টাপিরকে ‘বনের মালী’ও বলা হয়। কারণ তাদের খাদ্যাভ্যাস। তারা বিভিন্ন ধরনের ফল ও গাছপালা খায় এবং বনের মধ্যে চলাচলের সময় তাদের মলমূত্রের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে দেয়। এ প্রক্রিয়াটি বনের পুনর্জন্ম এবং জীববৈচিত্র্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা টাপিরকে একটি কীস্টোন প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করেন। যার অর্থ হলো বাস্তুতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এদের উপস্থিতি অপরিহার্য। এদের ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু গাছপালার বেড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে, যা অন্যান্য অগণিত প্রাণীর ওপর প্রভাব ফেলে।
টাপিরের বাচ্চাগুলো বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। তারা তাদের কালো রঙের বাবা-মায়ের থেকে ভিন্ন, টাপিরের বাচ্চারা তরমুজের মতো সাদা ডোরা ও ছোপ নিয়ে জন্মায়। যা প্রাকৃতিক ছদ্মবেশ তাদের বনের মাটির সঙ্গে মিশে যেতে এবং শিকারিদের এড়াতে সাহায্য করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নকশা মিলিয়ে যায় এবং তাদের গায়ের রং প্রাপ্তবয়স্ক টাপিরের মতো একরঙা হয়ে ওঠে।
পৃথিবীতে দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও টাপিররা এখন গুরুতর হুমকির সম্মুখীন। বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং বাসস্থান ধ্বংস হওয়ায় তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বেশির ভাগ টাপির প্রজাতি এখন সংকটাপন্ন বা বিপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। অনেক সংস্থা তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণে এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। টাপির হয়তো সিংহ বা হাতির মতো বিখ্যাত নয়, কিন্তু প্রকৃতিতে এর ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। টাপির আমাদের এই কথা মনে করিয়ে দেয় যে, সবচেয়ে শান্ত প্রাণীরাও প্রকৃতিতে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)