বইমেলা পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য হিসেবে মেলার পরিকল্পনাটা আমার জানা আছে। আশা করছি, বইমেলা নিয়ে আলোচনায় যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা পালন করলে অবশ্যই সুন্দর হবে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর বইমেলা নিয়ে কিছু দাবি ছিল। বিগত স্বৈরশাসকের যারা দোসর ছিল, তারা অনেক প্রকাশককে নানাভাবে দমন-পীড়ন করেছে। তাদের মেলায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। কিছু প্রকাশককে মেলায় স্টল বরাদ্দ দেওয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছিল। এই মুহূর্তে আমরা ফ্যাসিস্টদের মতো আচরণ করতে পারি না। তাই তাদের স্টলের সাইজ কিছুটা ছোট করে দেওয়া হয়েছে।
এবারের বইমেলায় অয়ন প্রকাশনী থেকে আমার কবিতাসমগ্র বের হবে। পুরস্কার পাওয়ার প্রতি আমার কখনোই কোনো মোহ ছিল না। বাংলাদেশে পুরস্কার পাওয়ার যে প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়াকে আমি ঘৃণা করি। যখন যে সরকার আসে, সেই সরকারের তল্পিবাহকরা, পছন্দের লোকেরা ও দলের লোকেরা পুরস্কার পেয়ে থাকেন। আমার মনে হয়, অনেকটা ভুল পথে এসব পুরস্কার দেওয়া হয়। বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল। এরপর কিছু পরিবর্তন হলেও মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
এবারের জাতীয় কবিতা উৎসব ছিল অনেকটা চ্যালেঞ্জের। আশির দশকে কবিতা পরিষদের প্রথম আহ্বান আমিই করেছিলাম। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন এবং তার গুম ও খুনের ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়ার জন্য দেশি-বিদেশি কবিদের ডেকে নিয়ে ঢাকার ওসমানী উদ্যানে এশীয় কবিতা উৎসবের আহ্বান করেছিলেন। সেটাকে চ্যালেঞ্জ করে তরুণ কবিরা কবিতা উৎসবের আয়োজন করেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে খোলা প্রান্তরে আমরা জাতীয় কবিতা উৎসবের আয়োজন করি। ‘শৃঙ্খলা মুক্তির জন্য কবিতা’ স্লোগানে কবিতা উৎসবের আয়োজন করেছিলাম। সেই উৎসবে অভূতপূর্ব সাড়া পড়েছিল এবং সারা দেশ থেকে কয়েক শ কবি এসেছিলেন। সেদিন ১০ সহস্রাধিক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে কবিরা কলম ধরেছেন। গণতন্ত্র ও অধিকারের জন্য কলম ধরেছেন কবিরা। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা- সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এগোচ্ছিলাম। তারপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি গঠন করল। বিগত ১৬ বছর শেখ হাসিনার পছন্দের লোকেরা কবিতা পরিষদে ছিলেন।
বৈষম্য ও কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর যে নিপীড়ন-অত্যাচার হয়েছে, এটাকে সমর্থন করেছে জাতীয় কবিতা পরিষদ। এই সময়ে তারা একটি কথাও বলেননি। এর পক্ষে তারা কলম ধরেছেন এবং শেখ হাসিনা সরকারকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু আমরা রাজপথে ছিলাম। এবারের জুলাই বিপ্লবে আমরা রাজপথে ছিলাম। হাসিনার পতনের পর আমাদের শ্রমে-ঘামে গড়া জাতীয় কবিতা পরিষদ পুনর্গঠন করেছি।
তরুণ লেখকদের বিষয়ে কিছু বলতে চাই। আমি অনেকের লেখা পড়েছি। তাদের লেখা সময়কে ধারণ করছে। তবে তাদের লেখার গঠন ও মান নিয়ে কিছু প্রশ্ন আছে। তাদের আরও বেশি লেখাপড়া করতে হবে। ভালো লিখতে হলে অনেক বেশি পড়তে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: মোহন রায়হান, কবি ও সভাপতি, জাতীয় কবিতা পরিষদ
অনুলিখন: সানজিদ সকাল