টোকো টোকান অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বিস্ময়কর পাখি। এদের মূলত দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে দেখা যায়। এদের চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হলো তাদের বিশাল ও রঙিন ঠোঁট। এটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং অনেক কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।
শারীরিক গঠন
টোকো টোকান হলো টোকান প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় পাখি। একটি পূর্ণবয়স্ক টোকো টোকানের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৫ থেকে ৬৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ওজন হয় প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম। এদের ঠোঁট প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যা পুরো দেহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। ঠোঁটটি দেখতে ভারী মনে হলেও এটি আসলে খুব হালকা। কারণ এটি কেরাটিন নামক এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি, যার ভেতরটা ফাঁপা।
এই ঠোঁটটি কমলা, হলুদ ও লাল রঙের সংমিশ্রণে তৈরি এবং তার প্রান্ত সাধারণত কালো রঙের হয়। এদের চোখের চারপাশে উজ্জ্বল নীল বা কমলা রঙের বৃত্ত থাকে, যা তাদের আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এদের শরীর সাধারণত কালো রঙের হলেও বুক এবং গলা সাদা বা হালকা রঙের হয়।
আবাসস্থল
টোকো টোকান সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যেমন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়ার উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জঙ্গলে বাস করে। তবে তারা শুধু গভীর অরণ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের কখনো কখনো খোলা সাভানা, ফলবাগান এবং গ্রামীণ বনের আশপাশেও দেখা যায়। এরা সাধারণত গাছে বসবাস করে এবং গাছের ফাঁকফোকর, পুরোনো কাঠঠোকরার গর্তে বাসা বানায়।
খাদ্যাভ্যাস
টোকো টোকান সর্বভূক পাখি। এরা মূলত ফল খেতে পছন্দ করে, বিশেষ করে পাকা, নরম ফল তাদের প্রধান খাদ্য। তবে শুধু ফলে সীমাবদ্ধ না থেকে তারা পোকামাকড়, ছোট ছোট সরীসৃপ, পাখির ডিম এবং বাচ্চাও খেতে পারে। এদের ঠোঁটটি ফল ছেঁটে খাওয়া এবং দূরের শাখা থেকে ফল পেড়ে আনার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
ছানাপোনা
টোকো টোকান জোড়া হিসেবে থাকে। এরা সাধারণত গাছের উঁচুতে বাসা তৈরি করে এবং স্ত্রী পাখি প্রতি মৌসুমে দুই থেকে চারটি ডিম পাড়ে। বাবা-মা উভয়ই ডিমে তা দেয় এবং বাচ্চাদের যত্ন নেয়। বাচ্চারা সাধারণত প্রায় দুই মাস পরে উড়তে শেখে এবং ততদিন তারা বাসাতেই থাকে।
আচরণ
টোকো টোকান অত্যন্ত সামাজিক পাখি। তারা প্রায়ই ছোট দলে ঘুরে বেড়ায় এবং একে অপরের সঙ্গে ঠোঁট ঠোকরানোর মাধ্যমে মজা করে। তারা উচ্চৈঃস্বরে ডাকাডাকি করে, যেটি অনেক দূর থেকে শোনা যায়। এই ডাকের মাধ্যমে তারা তাদের এলাকা চিহ্নিত করে এবং বিপদে সতর্কতা সংকেত দেয়।
উড়তে একেবারেই ভালোবাসে না টোকো টোকান। যতটা না ওড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি লাফিয়ে চলে। পুরো গাছই লাফাতে লাফাতে পার হয়। জীবনের বেশির ভাগ সময় মগডালে কাটায়। বৃষ্টিময় আমাজন বনমালার আলো-ছায়ায় ওরা রঙিন শরীর লুকিয়ে শিকারিদের ফাঁকি দেয়।