গভীর জঙ্গলের ভেতর, পাহাড়ের গা ঘেঁষে এক বিশাল গুহা ছিল। সেই গুহায় বাস করত এক দৈত্য। তার নাম ছিল ‘কৌতূহলী দৈত্য’। কেন তাকে এ নাম দেওয়া হয়েছিল? কারণ, পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস নিয়েই তার হাজারো প্রশ্ন থাকত। আকাশ কেন নীল, নদীর পানি কেন বয়ে যায়, পাখিরা কীভাবে উড়ে, ফুলের ঘ্রাণ কেন ছড়িয়ে পড়ে—সবকিছুতেই সে কৌতূহলী।
কৌতূহলী দৈত্যের গায়ের রং ছিল হালকা সবুজ, চোখ দুটি ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ আর মাথার চুলগুলো যেন শ্যাওলার মতো ঝুলে থাকত। তার ভয়ংকর চেহারা দেখলে ছুটে পালাত। কিন্তু আসলে সে ছিল নিরীহ আর বন্ধুসুলভ।
একদিন দুপুরে, আকাশে হালকা মেঘ ভাসছে, গাছের ডালে ডালে পাখির কিচিরমিচির। কৌতূহলী দৈত্য গুহার সামনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, ‘পাখিরা তো ছোট্ট ডানা মেলে উড়ে যায়। কিন্তু আমি এত বড়, আমার কেন ডানা নেই?’
ঠিক তখনই কালো এক কাক উড়ে এসে তার সামনে বসল। কাকের নাম কাকু। কাকু ছিল দারুণ বুদ্ধিমান। সে গ্রামের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াত, মানুষের গল্প শুনত আর নানা ধরনের জ্ঞান আহরণ করত।
দৈত্য কাকুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই কাকু, তুমি আমার বন্ধু হবে? আমি তোমাকে অনেক প্রশ্ন করব।’
কাকু প্রথমে একটু ভয় পেল। এত বিশাল দৈত্য যদি বন্ধু হয়, তবে কি সে তাকে খেয়ে ফেলবে না? কিন্তু দৈত্যের চোখের কোমলতা দেখে কাক সাহস পেল। সে মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি তোমার বন্ধু হব। কিন্তু শর্ত হলো—তুমি আমাকে খাবে না।’
দৈত্য হেসে উঠল, তার হাসির শব্দে গাছের পাতা কাঁপল। বলল, ‘আমি তো বন্ধু খাই না। আমি শুধু গল্প আর জ্ঞান খাই।’
এভাবেই শুরু হলো কাকু আর কৌতূহলী দৈত্যের বন্ধুত্ব। প্রতিদিন কাকু কোথাও না কোথাও উড়ে যেত, গ্রাম-শহরের খবর আনত, নতুন কিছু শিখে আসত, আর তা দৈত্যকে শোনাত।
একদিন কাকু বলল, তুমি জানো, নদীর পানি সব সময় বয়ে চলে, থেমে থাকে না।
দৈত্য অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, কেন থেমে থাকে না?
কাকু ব্যাখ্যা দিল, কারণ পাহাড় থেকে পানি নেমে আসে, আবার সমুদ্রের দিকে গড়িয়ে যায়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
দৈত্য আরও অবাক, তাহলে কি আকাশের মেঘও নদীর মতো কোথাও বয়ে চলে?
কাকু হেসে বলল, হ্যাঁ, মেঘও আকাশে ভেসে যায়। বাতাস তাদের ঠেলে নিয়ে চলে।
দিন কেটে গেল। কৌতূহলী দৈত্য প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে লাগল।
একদিন গ্রামে ভয়ানক খরা পড়ল। নদীর পানি শুকিয়ে গেল, ফসল নষ্ট হতে শুরু করল। মানুষ দুঃখে দিন কাটাতে লাগল। কৌতূহলী দৈত্য কাকুকে জিজ্ঞেস করল, মানুষেরা এত দুঃখী কেন?
কাকু বলল, কারণ তাদের পানির দরকার। পানি ছাড়া ওরা বাঁচতে পারে না।
দৈত্য এক মুহূর্ত ভাবল। তার মাথায় বুদ্ধি এল। সে পাহাড়ে উঠে গিয়ে বড় বড় পাথর সরিয়ে দিল, যাতে আটকে থাকা ঝর্ণার পানি নেমে আসে। মুহূর্তেই শুকিয়ে যাওয়া নদী আবার পানিতে ভরে উঠল। গ্রাম বাঁচল, মানুষ খুশি হলো।
মানুষ প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিল—এত বড় দৈত্য নদীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে! কিন্তু যখন দেখল, নদীতে আবার পানি এসেছে, তখন তারা বুঝল এই দৈত্য তাদের উপকার করেছে।
গ্রামের বাচ্চারা কৌতূহলী দৈত্যের কাছে গল্প শুনতে আসতে লাগল। দৈত্যও শিখে আসা জ্ঞান তাদের শোনাত। কাকু তখন পাশে বসে খুশিতে ডাকত, কাকা! কাকা!
একদিন দৈত্য বলল, কাকু, আমি এতদিন ধরে প্রশ্ন করে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি। এখন এই জ্ঞান আমি কাজে লাগাব।
কাক হেসে মাথা নেড়ে বলল, বন্ধু, তুমি সত্যিই বুদ্ধিমান হয়ে গেছ। কৌতূহল যদি ভালো কাজে লাগে, তবে সেটাই জ্ঞানের আসল শক্তি।
তারপর থেকে গ্রাম আর জঙ্গলজুড়ে এক অদ্ভুত কাহিনি ছড়িয়ে পড়ল—এক কৌতূহলী দৈত্যের, যে ছিল কাকের বন্ধু। যে শুধু প্রশ্ন করত না, উত্তর খুঁজত আর মানুষের উপকার করত।
গ্রামের শিশুরা বলত, আমরা ভয় পাই না। আমাদের বন্ধু হলো কৌতূহলী দৈত্য।
এভাবেই কৌতূহলী দৈত্য শিখল—বন্ধুত্ব আর জ্ঞান, দুটোই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি।