সিরিয়ার পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট গ্রাম। ভোর হলে সূর্যের সোনালি আলো পাহাড়ের মাথায় ঝলমল করে ওঠে। সেই আলোয় জেগে ওঠে হাসিখুশি এক মেয়ে। যার নাম মারিয়াম। তার চোখে ঝিলিক, মুখে সব সময় হাসি। বয়স মাত্র সাত, কিন্তু সে ছিল খুবই বুদ্ধিমতী আর সাহসী।
তার একটা ছোট ভাই ছিল। তার নাম ইলাফ। দুজন একসঙ্গে খেলত, গল্প করত, কখনো ফুল তুলত, কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাখি গুনত।
রাতে ঘুমানোর সময় ইলাফ বলত, ‘আপু, আমি তোমার পাশে ঘুমাব, একা একা ভয় লাগে।’
মারিয়াম মৃদু হেসে বলত, ‘আরে পাগল! আমি তো আছিই, ভয় কীসের?’
একদিন খুব ভোরে, যখন সবাই ঘুমাচ্ছে, হঠাৎ ঘরটা দুলে উঠল- মনে হলো যেন গোটা পৃথিবী কেঁপে উঠেছে। মুহূর্তেই বিকট শব্দ। চারপাশে চিৎকার, ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’
মারিয়াম শক্ত করে ভাইয়ের হাত ধরল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
চোখ খুলে দেখে- ওরা দুজন মাটির নিচে আটকে গেছে। ধুলা, অন্ধকার আর গরম বাতাস। মারিয়ামের পা নড়ছে না, ব্যথায় চোখে পানি চলে আসে। ঠিক তখনই পাশ থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে শোনা যায়, ‘আপু… আমি ভয় পাচ্ছি…’
মারিয়াম হাত বাড়িয়ে ভাইয়ের মাথায় রাখে, ধুলো মুছে দেয়।
— ‘না না, ভয় পেও না ভাইয়া, আমি তো আছি! আমি তোমাকে একা ছাড়ব না, কখনো না।’
অন্ধকারে চারদিক নিঃশব্দ। দূরে ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে বালু ঝরে পড়ে।
মারিয়াম মনে মনে দোয়া পড়ে, ‘হে আল্লাহ, আমাদের রক্ষা করো।’
সে ভাবে, ‘না, আমি কাঁদলে ভাই ভয় পাবে- আমাকে হাসতেই হবে।’
মারিয়াম ধীরে বলে, ‘ইলাফ, মনে আছে? সেই ছোট্ট পাখিটার গল্পটা?’
ইলাফ ফিসফিস করে বলে, ‘যেটা ভাঙা ডানা নিয়েও উড়েছিল আকাশে?’
— ‘হ্যাঁ! ঠিক তাই! সেই পাখির মতো আমরাও পারব, ভয় নেই ভাইয়া।’
অন্ধকার আর ধুলার ভেতরেও মারিয়ামের কণ্ঠে আলো ফুটে ওঠে। সে গল্প বলে, গান গায়, ছড়া পড়ে। ইলাফ হাসে- ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে। বোনের পাশে থেকে তার ভয় কেটে যায়।
এভাবে অনেক সময় পার হয়ে যায়। ১৭ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের ফাঁক দিয়ে আলো ঢোকে। বাইরে লোকেরা তখনো খুঁজছে, ‘কেউ কি এখনো বেঁচে আছে?’
একজন বলে, ‘যদি কেউ বেঁচে থাকে, সে খুবই ভাগ্যবান!’
মারিয়াম শুনতে পায় শব্দগুলো, কিন্তু মুখে ধুলা, গলা শুকিয়ে গেছে।
সে ধীরে ফিসফিস করে বলে, ‘আমরা… এখানে… বেঁচে আছি…’
তার কণ্ঠ এত ক্ষীণ যে, প্রথমে কেউ শোনে না। কিছুক্ষণ পর এক উদ্ধারকর্মী থেমে কান পাতে, ‘থামো! কেউ একজন কথা বলেছে!’
তারপরই তারা দৌড়ে আসে, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেখে- এক ছোট্ট মেয়ে, ধুলায় ভরা মুখ, আধখোলা তার চোখে ক্লান্তি, তবুও সে আস্তে আস্তে নিশ্বাস নিচ্ছে। তার হাত শক্ত করে রাখা ভাইয়ের মাথায়।
একজন উদ্ধারকর্মী কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘চলো মা, তোমাকে আগে তুলি।’
কিন্তু মারিয়াম ধীরে বলে, ‘আগে… আগে ওকে নিন… আমার ভাইকে।’
মারিয়ামের ভালোবাসা আর সাহসেই বেঁচে যায় ইলাফ। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এক ছোট্ট মেয়ের এমন সাহস, ত্যাগ আর ভালোবাসা, যা পাহাড়ের চেয়েও বড়!
এরপর গ্রামজুড়ে সবাই বলে, ‘মারিয়াম আমাদের শেখাল- সত্যিকারের সাহস মানে, অন্যকে রক্ষা করা আর হাল না ছাড়া।’