অনেক দিন আগের কথা, লক্ষ্মীপুর গ্রামে বড় একটি জঙ্গল ছিল। তার গভীরে ছিল শতবর্ষী এক বটগাছ। তার নিচে অদ্ভুত এক সংসার। পাড়ার মুরুব্বিদের মুখে শুনেছি তার নাম ছিল ‘প্রজাপতির সংসার’।
এখানে নাকি একসঙ্গে বাস করত হরিণ, বাঘ, বানর, ময়ূর, সাপ এমনকি ছোট্ট একটি কাঠবিড়ালী। কেউ কাউকে খেত না, ভয় পেত না, সবাই মিলেমিশে থাকত।
এই সংসারের প্রধান ছিল এক বৃদ্ধ কচ্ছপ, নাম তার বুড়ো ধীরাজ। সে ছিল অত্যন্ত জ্ঞানী, ধীরস্থির এবং বিচক্ষণ। তার বিচারকার্য মানত সবাই।
একদিন সকালে বনের একাংশে হঠাৎ আগুন লেগে গেল। সবাই ছুটে এল বুড়ো ধীরাজের কাছে।
বানর লাফাতে লাফাতে বলল, ‘আগুন আমাদের দিকেই আসছে! আমাদের কিছু একটা করতে হবে!’
সিংহ গর্জন করে বলল, ‘আমার কথা শোনো! সবাই নিজ নিজ গুহায় ঢুকে পড়ো, কেউ কাউকে সাহায্য করলে নিজের জীবন যাবে।’
ধীরাজ কচ্ছপ ধীরে ধীরে মাথা তুলল, ‘না, প্রিয় বন্ধুরা। এই সংসার শুধু একসঙ্গে থাকাই মূল ব্যাপার নয়। একে অপরের দায়িত্বও নেওয়া উচিত।’
তখন ময়ূর তার রঙিন পাখা মেলে বলল, ‘আমি মেঘ ডেকে বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা করব।’
হরিণ বলল, ‘আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে নদী থেকে পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করব।’
সাপ বলল, ‘আমি আগুনের কাছাকাছি গিয়ে ঝোপে লুকিয়ে দেখব আগুন কোন দিকে ছড়াচ্ছে।’
বানর গাছের ডালে বসে নেচে নেচে বলল, ‘আমি উঁচু থেকে সবাইকে দিক নির্দেশনা দেব!’
এভাবে সবাই মিলে একটা পরিকল্পনা করল। কেউ পানি আনল, কেউ আগুনের দিক জানাল, কেউ পাখায় বাতাস দিয়ে আগুনের গতি রোধ করল। অবশেষে বিকেলের আলো ফোটার আগেই আগুন নিভে গেল।
সন্ধ্যায় সবাই আবার বটগাছের নিচে জড়ো হলো। কচ্ছপ সরদার ধীরাজ হাসতে হাসতে বলল, ‘দেখেছ, প্রকৃত সংসার কীভাবে চলে? শক্তিশালী যতই হোক একা কিছু নয়, মিলের মধ্যেই সব শক্তি।’
সিংহ ধীরে ধীরে এসে কচ্ছপের সামনে মাথা নত করে বলল, ‘আমি ভুল বলেছিলাম ধীরাজ সরদার। ভেবেছিলাম, নিজের জীবন রক্ষা করলেই চলবে। কিন্তু আজ বুঝলাম, প্রজাপতির সংসারে সবাই সবার শক্তি।’
তারা সবাই একসঙ্গে রাতভর গল্প করল, গান গাইল, নাচল।
প্রকৃতির গভীর এক কোণে, যেখানে হিংসা ছিল না, লোভ ছিল না, ছিল শুধু মিল, সহযোগিতা আর ভালোবাসা; এমনটাই ছিল সেই প্রজাপতির সংসার।