শোনো কিচিমিচি, আমি ফিরে আসার আগে বাসার বাইরে যাবে না। বাঘ কাঁপানো মাঘের শীত। হিমেল হাওয়া বইছে। ঘন কুয়াশা। এমন শীতের সকালে ছোটদের বাইরে যেতে নেই। ঠাণ্ডা-কাশি-জ্বর হতে পারে। ধবল কুয়াশার ভিড়ে হারিয়ে ফেলতে পারো পথ। তখন বাসায় ফিরবে কেমন করে? লাউজাংলার বাসায় বসে ছোট্ট ছানা কিচিমিচিকে সতর্ক করল মা শালিক।
কিচিমিচি কিচমিচিয়ে বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছ মা?
— ওই যে ছোট নদীটা, ওটার ওপারেই সরিষাখেত। কুয়াশায় ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। ওখানেই যাব। দেখি, কয়েকটা কাটুই পোকা পাওয়া যায় কি না।
— ঘুম থেকে জেগে বাবাকে দেখছি না। আবার তুমিও বেরোচ্ছ?
— বেলা ওঠার আগেই তোমার বাবা উড়াল দিয়েছে খলসেপুঁটির বিলের দিকে। অনেক দিন ধরে তুমি পুঁটি খাও না। খলসেপুঁটি শিকার করে তোমার বাবাও খাবে, তোমার জন্যও ঠোঁটে করে নিয়ে আসবে একটা পুঁটি।
— তাই নাকি মা? বাবা পুঁটি নিয়ে এলে খুব মজা করে মচমচিয়ে খাব।
মা শালিক বলল, পুঁটি তো মজা করে খাবেই। কাটুই পোকাটাও দারুণ মজা! এটি সরিষাগাছের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আমাদের জন্য মজাদার একটি খাদ্য। তোমার বাবা নিয়ে আসবে পুঁটি। আর আমি কাটুই পোকা। তুমি খাবে আর গান গাবে। সবুজ পাতার পাঠশালায় পড়বে আর আপন মনে উড়ে বেড়াবে।
— আর গাছের ডালে ডালে, পাতায় পাতায় নেচে বেড়াব। ফুলের গন্ধে প্রাণ জুড়াব।
— কিন্তু আজ কোনো দুষ্টুমি করবে না। আমার দেরি হবে না ফিরতে। তবে তোমার বাবার দেরি হবে। খলসেপুঁটির বিলটা অনেক দূরে। যেতে আসতে অনেক সময় লাগে। তবুও যেতে হয়। ছোট নদীটা শুকিয়ে গেছে। আশপাশে কোনো জলাশয় নেই। যা দুয়েকটা ছিল, মানুষ সেগুলো ভরাট করে বাড়িঘর বানিয়েছে। কারখানা বানিয়েছে।
মা শালিক বাসা থেকে বেরোবার পরেই কুয়াশা কেটে যেতে লাগল। রোদ উঠল। কমলা রঙের রোদ। কচিমিচিদের বাসার দরজার সামনেই কয়েকটা লকলকে লাউপাতা। পুব দিক থেকে ভোরের রোদ এসে পাতাগুলোর নিচে ঢুকে পড়েছে। কিচিমিচি দরজার বাইরে এসে পাতার নিচে কঞ্চিতে বসে মেলে দিল ডানা। কী মিষ্টি রোদ! আনন্দে ডানা ঝাঁকিয়ে বলল, লাউপাতার বারান্দায় বসে রোদ পোহাচ্ছি, কী মজা! কী মজা!
ডানা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে পা ফসকে পড়ে গেল জাংলার নিচে। ব্যথা পেল খুব। উড়ে যে বাসায় ফিরবে, তা-ও পারল না। শুধু কিচিরমিচির করে কাঁদতে লাগল।
একটু পরেই কাটুই পোকা নিয়ে বাসায় ফিরল মা শালিক। কিচিমিচিকে না পেয়ে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মুহূর্তেই জাংলার নিচ থেকে কানে এল কান্নার শব্দ। ছানাটির অবস্থা দেখে ভীষণ কষ্ট পেল। দ্রুত উড়ে গেল ছানাটির কাছে। মা শালিকও কাঁদতে লাগল।
এদিকে ঠোঁটে পুঁটি নিয়ে ফিরে এল কিচিমিচির বাবা। ছানাকে দেখে হতাশায় ভেঙে যেতে লাগল বুকটা। কিচিমিচি উড়তে চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। মা-বাবা দুজনে ছানাটির চারপাশ দিয়ে ওড়াউড়ি করছে। কিন্তু ছানাকে বাসায় তুলে আনার সাধ্য নেই তাদের। হায়রে পাখিজীবন!
এমন সময় ছুটে এল একটা মানুষ খোকা। কিচিমিচিকে হাতে তুলে আদর করল। তারপর তুলে দিল বাসায়। শালিক মা-বাবা চিন্তামুক্ত হলো।
কিচিমিচির খিদে পেয়েছে খুব। বাবা দিল পুঁটি। আর মা দিল কাটুই পোকা। টপাটপ খেয়ে ফেলল কিচিমিচি।
মা শালিক বলল, এই যে দুষ্টুর হাড্ডি, বারবার বলে গেলাম বাইরে যাবে না। মায়ের কথা না শুনে বিপদে পড়েছিলে। খোকাটা না এলে কী যে হতো! ভাগ্য ভালো, বিড়াল-বেজিদের সামনে পড়োনি।
চোখ বড় বড় করে বাবা বলল, তাই তো, তাই তো!
কিচিমিচি বলল, আমি তো দুষ্টুমি করিনি। আমাদের লাউপাতার বারান্দায় রোদ পোহাতে গিয়েছিলাম। জানো মা, সকালের রোদে ভিটামিন ডি থাকে। এটি খুব উপকারী। হাড় সুস্থ রাখে। দাঁত সুস্থ রাখে। রিকেট ও ক্যানসার প্রতিরোধ করে। আরও কত কী!
মা শালিক হেসে হেসে বাবা শালিককে বলল, শোনো, শোনো, পাজিটা একেবারে ডাক্তারদের মতো কথা বলছে। বড় হয়ে যেন পাখিডাক্তার হবে!