মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বিশ্ববাণিজ্যে। পাশাপাশি ভোগ্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি আঘাত পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। বর্তমানে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি সামুদ্রিক ধমনি চরম ঝুঁকির মুখে। গুরুত্বপূর্ণ দুটি রুট এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজ। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ দেশে পণ্য পৌঁছাতে সুয়েজ খাল ব্যবহার করা হয়। এটি পরিবহন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সাশ্রয়ী। কিন্তু চলমান পরিস্থিতিতে এ রুটটি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে ইউরোপে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি বেড়ে যাচ্ছে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং কনটেইনার পরিবহনের ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয় লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে। অন্যদিকে বিশ্বের মোট জালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এ রুটগুলো অনিরাপদ হওয়া মানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের হৃৎস্পন্দন থমকে যাওয়া। নিরাপত্তার খাতিরে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো এখন সুয়েজ খালের পরিবর্তে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে ঘুরে যাতায়াত করছে। এর কারণে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা যাত্রাপথে ১০ থেকে ১৫ দিন বাড়তি সময় যোগ করছে। এতে আমদানি-রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। অস্থিতিশীল হতে পারে ভোগ্যপণ্যের বাজার। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে পোশাক খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস, লিড টাইম ও অর্ডার বাতিল, কাঁচামাল, রিজার্ভসংকটসহ বিভিন্ন বিপর্যয় নেমে আসবে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ এখন ভূরাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন পৌঁছে গেছে বিশ্বের প্রত্যেক সাধারণ মানুষের হেঁশেল পর্যন্ত। এ বৈশ্বিক যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ দেশের পোশাকশিল্প এবং প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ দুটি খাতই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারি মাসেও প্রবাসী আয় এসেছে ৩ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচের দেশগুলোতে অনেক রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমতে থাকবে। তেল সরবরাহ ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ায় আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে খরচ ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। লোহিত সাগরের অস্থিরতা মানেই জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি। চাল, ডাল, তেল, গম আমদানিতে খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
এদিকে মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা। তারা সতর্ক করেছেন, এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে খুচরা পণ্যের দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও সংশোধন করার দরকার হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, জ্বালানির দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যদি এক বছর স্থায়ী হয়, তবে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪০ বেসিস পয়েন্ট (দশমিক ৪০ শতাংশ) বাড়তে পারে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বৈশ্বিক যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়তে পারে। এতে করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে ভোগ্যপণ্যের বাজার। তাই এখন থেকেই সরকারকে প্রভাব মোকাবিলায় বিকল্প কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পণ্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে, সে বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। যথাযথ কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই সংকট উত্তরণে সরকার দূরদর্শিতার পরিচয় দেবে, এটাই প্রত্যাশা।