রাজধানী ঢাকার রাস্তায় বেরোলে বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে অস্বাভাবিক একটা সংকটের দৃশ্য চোখে পড়ে। যারা ভুক্তভোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ছেন, ধুলোবালিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, অপেক্ষার যন্ত্রণায় তাদের জেরবার অবস্থা। জ্বালানিসংকটের এ হলো পানিতে ডুবন্ত বরফের চূড়া মাত্র। কিন্তু সংকট শুধু উপরিতলে নয়, অনেক গভীরে।
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তখন থেকে যত দিন যাচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তত তীব্র হচ্ছে। এই সংকট দূর হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ একে আরও জটিল করে তুলছে। যুদ্ধের ডামাডোল আর জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে দেশ এখন স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্তত ১০টি খাতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এগুলো হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, গৃহস্থালি, সেবা, নির্মাণশিল্প, পর্যটন ও বিনোদন, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি তেলের ৯৫ শতাংশ আমদানি করে; এর আবার ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। হরমুজ নিয়ে এখন চলছে টানাপোড়েন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেল, গ্যাস ও কয়লার প্রয়োজন হয়। জ্বালানির অভাবে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয় ঘটেছে। জ্বালানির অভাবে অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদনসংকট দেখা দিয়েছে। লোডশেডিং বাড়িয়েছে সরকার। দেশের পরিবহন খাতের পুরোটাই জ্বালানিনির্ভর। তেলের সংকটে পরিবহনব্যবস্থায় নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেল পাওয়া নিয়ে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি প্রায়ই বচসা থেকে সংঘাতের খবর মিলছে। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কৃষি ও শিল্প খাতেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ব্যাহত হচ্ছে সেচ, ট্রাক্টর চালনা, পণ্য পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন। বাণিজ্য, নির্মাণশিল্প, সেবা, গৃহস্থালি, পর্যটন, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতের অবস্থা তথৈবচ।
নিস্তরঙ্গভাবে চললেও আমাদের জীবনে যে একধরনের ছন্দ ছিল, তা এখন সুরলয়তালহীন এবং অনেকটাই স্থবির। জ্বালানি তেল নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এই উদ্বেগ সাধারণ মানুষকে নানা দিক থেকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। সরকার তিন দিন অনলাইনে স্কুলের ছেলেমেয়েদের ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। বিপণিবিতানগুলো সন্ধে ৭টার পর বন্ধ থাকছে। অফিস-আদালত-ব্যাংক খোলা রাখার সময়সীমা কয়েক ঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে। পাম্পগুলো থেকে তেল দিচ্ছে সীমিত পরিমাণে। রাস্তায় গণপরিবহন এবং ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য আনা-নেওয়াতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ তখন আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বে। প্রবৃদ্ধি কমে যাবে এবং সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।
বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ডলারসংকট আমাদের জ্বালানি খাতকে ভীষণ চাপে ফেলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ তাই এই মুহূর্তে অনিশ্চিত হলেও করণীয় কী, বিশেষজ্ঞরা তা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। চলমান সংকট মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দারস্থ হয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ চেয়েছে। কিন্তু আইএমএফ যেসব শর্তে ঋণ দেবে তা পূরণ করা সহজ হবে না। বিশেষজ্ঞরা তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংরক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সমন্বিত নীতির ওপর জোর দিচ্ছেন।
সংকট গভীর, এর সমাধানও সুচিন্তিত ও কার্যকর হওয়া জরুরি। প্রথমেই করণীয় হচ্ছে, জনদুর্ভোগ কমিয়ে মানুষের ক্ষোভ প্রশমন করা। গতকাল প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষার চাপে গণপরিবহনের সংকটে রাজধানীতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। দেশের অন্য স্থান থেকেও তীব্র সংকটের খবর পাওয়া গেছে। দ্রুতই এ থেকে পরিত্রাণের উপায় বের করতে হবে সরকারকে। প্রয়োজনে এ জন্য রাজনৈতিক দল, পরিবহন সমিতি, নাগরিক সমাজ এবং অন্যান্য স্টেক হোল্ডারের সঙ্গে সরকার আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করতে পারে। রাজধানীসহ জনজীবনে স্বস্তি নিশ্চিত করাই সরকারের এই মুহূর্তের লক্ষ্য হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষ এই আপাত স্বস্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।