প্রবন্ধ রচনা
কৃষিকাজে বিজ্ঞান
(২য় অংশ)
আমাদের কৃষক এবং আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তি: আমাদের কৃষক সম্প্রদায় এখানো শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে আছে। কৃষকদের মাঝে শিক্ষার আলো না পৌঁছানোর কারণে তারা সেই মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণা নিয়েই কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষিতে বিজ্ঞানের অবদানের খবর তারা রাখেন না। সীমিত সামর্থ্যের কারণে সরকারও সামগ্রিকভাবে কৃষকদের বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারছে না। যদিও বর্তমানে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো কৃষকদের বিজ্ঞানের অবদান সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করছে; সেই সঙ্গে চেষ্টা করছে কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই সামান্য। আরও ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। কৃষি যন্ত্রপাতি ও সার কেনার জন্য ঋণদানের ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে কৃষকদের বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষ করে তুলতে হবে। এ দেশে প্রতিষ্ঠিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি কলেজকে আরও বেশি অর্থবহ ও গবেষণাধর্মী করে গড়ে তুলতে হবে। সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়কে আরও গতিশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের দেশ যেহেতু কৃষিপ্রধান অর্থনীতির দেশ তাই আমাদের কৃষির উন্নতির লক্ষ্যে বিজ্ঞানের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞানের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে আমরাও কৃষির উৎপাদন দ্বিগুণ পরিমাণে বৃদ্ধি করতে পারব। আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু সেই সঙ্গে জমি বাড়ছে না। উপরন্তু অন্যান্য কাজে ব্যবহারের জন্য জমি কমে যাচ্ছে কৃষি খাত থেকে। তাই উৎপাদন দ্বিগুণ করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথই খোলা নেই।
কৃষিকাজে বিজ্ঞানের অবদান সম্পর্কে প্রচারণা: প্রিন্টিং মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো কৃষিকাজে বিজ্ঞানের অবদান নিয়ে যে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে তা খুব আশাব্যঞ্জক। প্রায় প্রতিটি চ্যানেলেই কৃষি নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। বিশেষ করে শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ এক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রকৃতপক্ষে, কৃষকদের কৃষি বিষয়ে তথ্য ও তত্ত্ব দ্বারা শিক্ষিত, সচেতন করা গেলে কৃষিকাজে বিজ্ঞানের অবদান ব্যবহৃত হবে ব্যাপকভাবে আর এতে কৃষি, কৃষক ও জাতীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে।
শস্য ও ফলমূল: ফলমূল ও শস্যাদি উৎপাদনে বিজ্ঞানের অবদানের তুলনা নেই। বীজ নির্বাচনে সতর্কতা, নতুন ও উন্নত ধরনের গাছপালার প্রজনন ব্যবস্থা এবং বীজ অংকুরণ ও গাছের কলম ব্যবহারের নতুন নতুন ব্যবস্থা কৃষিকাজে বিপ্লব এনেছে। আলুর আকার বৃদ্ধি পাওয়া, বুনো টক আপেলের জায়গায় নতুন জাতের মিষ্টি আপেল উৎপাদন, অম্লময় বীজে ভরা টক আঙুরের বদলে নতুন প্রজাতি আঙুরের উদ্ভাবন প্রভৃতি বিজ্ঞানেরই অবদান।
আরো পড়ুন : কৃষিকাজে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ১ম পর্ব
পশুরোগ সংক্রান্ত বিজ্ঞান: পশুরোগসংক্রান্ত বিজ্ঞানের আবিষ্কার খামারের পশুদের মধ্যে রোগজনিত মৃত্যুহার বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। গাছপালা ও শস্যাদির মধ্যে নানা ধরনের পতঙ্গের উৎপাত, জীবাণু সংক্রমণ ও রোগ থেকে যেসব ক্ষতি হয় এ সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। কৃষকরা তাই বিপজ্জনক পোকামাকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছে এবং এগুলোর ক্ষতিকর আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে সক্ষম হচ্ছে।
উন্নত জাতি ও তাদের কৃষিকাজ: ইতিহাস থেকে জানা যায়, অতীতের উন্নত জাতিগুলো কৃষিকাজেও উন্নত ছিল। প্রাচীন মিসরবাসী পালাক্রমে ভিন্ন ভিন্ন শস্যের চাষ জানত। কৃত্রিম পানি সেচন পদ্ধতির সঙ্গে তারা পরিচিত ছিল। এ ছাড়া কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফোটানোর কার্যক্রমও তাদের অজানা ছিল না। উন্নত পানি সেচন পদ্ধতি প্রাচীন ভারত ও ব্যাবিলনে (বর্তমান ইরাক) প্রচলিত ছিল। পারস্যে একসময় চালু ছিল প্রগাঢ় ধাঁচের খেত (ইনটেনসিভ ফার্মিং)। পানি সেচন পদ্ধতি, জমি চাষ প্রক্রিয়া,
সার ব্যবহার প্রভৃতি কাজে প্রাচীন রোমানরা ছিল অগ্রদূত।
প্রকৃতির খেয়াল থেকে রক্ষা: বিজ্ঞান প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা থেকে কৃষিব্যবস্থাকে রক্ষা করেছে। কৃষকদের ফসল উৎপাদনের জন্য আজ আর বৃষ্টির জন্য প্রকৃতির দিকে চেয়ে থাকতে হয় না। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কৃষক সেচযন্ত্র ব্যবহার করে ধন্য হচ্ছে। বিজ্ঞানের ক্রমোন্নতির ফলে সরকারের গৃহীত ‘অধিক খাদ্য ফলাও’ অভিযান সফল হতে পারছে।
উপসংহার: এককথায়, বিজ্ঞান সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যবহার ব্যাপকহারে সমাদৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানের কল্যাণে ঊষর মরুভূমি, হাজার বছরের পতিত জমি, যেসব স্থানে ফসল ফলানোর কথা কল্পনাও করা যেত না, সেখানেও আজ প্রয়োজনীয় সব ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। সার, কীটনাশক প্রভৃতি ব্যবহার করে মাটি ও ফসলের গুণগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। আমরা বিজ্ঞানের বদৌলতে উন্নত মানের ডিম, মাংস প্রভৃতি সুলভে পাচ্ছি। ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা, পরিবহন প্রভৃতি ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান ব্যবহৃত হচ্ছে। এককথায় বলা যায়, কৃষিক্ষেত্রে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে ক্রমোন্নতিশীল বিজ্ঞানের আবিষ্কার। আমরা ক্রমশ উন্নয়নের দিকেই ধাবিত হচ্ছি। আমাদের জন্য এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
কবীর