দেশের মোট চিকিৎসার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে দেওয়া হয়। ক্লিনিক ও হাসপাতাল গড়ে উঠলেও সরকারিভাবে কোনো প্রণোদনা নেই। যন্ত্রপাতি ও ল্যাব সামগ্রী আমদানি করতে বেশি ভ্যাট ও শুল্ক দিতে হয়। কিছু ছাড় দিলে রোগীরা সরাসরি উপকৃত হতেন। বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনায় রোগীদের আস্থা তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এসব কথা বলেছেন চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালের এমডি ডা. এটিএম রেজাউল করিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের নিজস্ব প্রতিবেদক আবদুস সাত্তার।
খবরের কাগজ: চিকিৎসা খাতে প্রতিবছর দেশের বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। এটা আটকাতে কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ডা. এটিএম রেজাউল করিম: চিকিৎসা খাতে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের এলিট শ্রেণির কিছু মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান। এটা রোধ করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের চিকিৎসা যদি সরকারিভাবে দেশের মধ্যে করা হয়, তাহলে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনই থাকবে না। এ জন্য সরকারকে বড় হাসপাতালগুলোতে উন্নত ইকুইপমেন্ট সংযোজন করতে হবে। ভালো চিকিৎসার উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারিভাবে আমাদের দেশের অনেক হাসপাতালে অবকাঠামো ও ইকুইপমেন্ট আছে। কিন্তু রোগীদের আস্থা নেই। এই আস্থা তৈরি করতে আরও উন্নয়ন করতে হবে। বেসরকারি খাতে মানুষের বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের চিকিৎসার প্রতি আস্থা থাকলে মানুষ বিদেশে যাবে না। বর্তমানে বেসরকারিভাবে হার্ট, কিডনি, ব্রেইনসহ বড় জটিল রোগের চিকিৎসা দেশে সম্ভব।
খবরের কাগজ: অনেকেই অভিযোগ করেন, দেশে অল্পসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। তবে বেশির ভাগ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে উন্নতমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
ডা. এটিএম রেজাউল করিম: মেডিকেল যন্ত্রপাতির দাম খুবই বেশি। যেমন, একটি এমআরআই মেশিন কিনতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। এ ধরনের আরও অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি রয়েছে। আধুনিক সব যন্ত্রপাতি সংযোজন করে সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনা করা খুবই কঠিন। যন্ত্রপাতি ও ল্যাব পরীক্ষার সংকটের কারণে সঠিক রোগ নির্ণয় করা সম্ভব না হওয়াও আধুনিক চিকিৎসার একটি বড় বাধা। মেডিকেল চিকিৎসা সেবা একটি প্যাকেজের মতো; সবকিছু সঠিক মানের থাকতে হবে। ভালো চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন। সব হাসপাতাল এটি মেনে চলতে পারে না। তাই চিকিৎসার মানে হেরফের ঘটে। এই পরিস্থিতিতে রোগীকে সচেতন হয়ে হাসপাতাল নির্বাচন করতে হবে।
খবরের কাগজ: আপনার হাসপাতালটি সুনামের সঙ্গে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আপনি কীভাবে সেবার মান বাড়িয়েছেন?
ডা. এটিএম রেজাউল করিম: আমার হাসপাতালটি সরকারি সব লাইসেন্স নিয়ে, সুন্দর অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আমি নিজে সব সময় ডাক্তার থেকে শুরু করে নার্স, ল্যাবকর্মী ও অফিস স্টাফসহ সবার সঙ্গে সেমিনার করি। কর্মীদের আধুনিক বিশ্বের নতুন রোগ, রোগ নির্ণয় ও সেবা মান বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিই। রোগীকে আধুনিক চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমি শতভাগ সচেতন থাকি। সব কর্মী যাতে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেন, সেদিকে আমার নজর থাকে। হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। সঠিক রোগের সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমরা এগিয়েছি। এখন চট্টগ্রামের মানুষের আস্থা আমার হাসপাতালে। তবে এর জন্য সবাইকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি একা কিছুই করতে পারি না। হাসপাতাল পরিচালনায় সবাই মিলে কাজ করি। এভাবেই আমরা সেবার মান উন্নত করেছি।
খবরের কাগজ: চাকরি ছেড়ে দিয়ে হাসপাতাল করার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
ডা. এটিএম রেজাউল করিম: চাকরি করে দেখলাম আমি কিছু করতে পারছি না। সবসময় আমার মধ্যে বড় কিছু করার ইচ্ছা ছিল। ওই আবেগ থেকেই হাসপাতাল করার বিষয়ে এগিয়ে এলাম। সরকারি চাকরিও ছেড়ে দিলাম। ধীরে ধীরে মোটিভেশন তৈরি হয়ে আমি উদ্যোক্তা হয়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলাম। এখন আমার পুরো সময় এই হাসপাতালে দিই। এটি আমার পরিবার, আমার সন্তান। এ হাসপাতালে আমার সঙ্গে প্রায় দেড় হাজার জনবল কাজ করেন। এত মানুষের সংসারের দায়িত্ব নেওয়া ছোট বিষয় নয়। আমার প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
খবরের কাগজ: হাসপাতাল চালাতে গিয়ে কোন কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন? এসব বাধা কীভাবে অতিক্রম করেছেন?
ডা. এটিএম রেজাউল করিম: হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আনা, সেগুলো স্থাপন করা। এর জন্য অর্থ বিনিয়োগ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা পার্কভিউ হাসপাতাল যাত্রা থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের ওপর জোর দিয়েছি। সব ধরনের রোগ নির্ণয়ের জন্য সঠিক রি-এজেন্ট আমদানি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। ভালো ডাক্তার যেন এ হাসপাতালে রোগী দেখেন, তারও ব্যবস্থা করেছি। সব মিলিয়ে, যেটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে, তার সঠিক সমাধান করেছি। হাসপাতাল পরিচালনাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এটি একটি ইন্ডাস্ট্রির মতো; সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কর্মীদের সব সময় আপডেট রাখা প্রয়োজন। এসব করার মাধ্যমে মানুষের আস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়। ধীরে ধীরে রোগীদের আস্থা তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি।
খবরের কাগজ: সুষ্ঠুভাবে হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনার কৌশল কী?
ডা. এটিএম রেজাউল করিম: আমার কোনো নির্দিষ্ট কৌশল নেই। সবকিছু করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। তবে আমি টিমওয়ার্কে বিশ্বাস করি। সবাই মিলে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আমার একার কোনো কৃতিত্ব নেই। সবাই মিলেমিশে এই হাসপাতালকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
খবরের কাগজ: বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনায় সরকারের কাছে আপনার চাওয়া-পাওয়া কী?
ডা. এটিএম রেজাউল করিম: সরকারের কাছে আমাদের অনেক কিছু চাওয়ার আছে। আমরা চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি। মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি। আমরা প্রণোদনা চাই না। আমরা চাই মেডিকেল যন্ত্রপাতি, রি-এজেন্ট ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন উপাদান আমদানিতে শুল্ক কমানো হোক। তখন রোগ নির্ণয়ের খরচ কমে যাবে। রোগীরা সরাসরি উপকৃত হবেন। বেসরকারি হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার আরও নানা সুবিধা দিতে পারে। এতে দেশের জনগণ উপকৃত হবে।