সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সিলেটের সভাপতি ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি সিলেট বিভাগীয় শাখার প্রধান সৈয়দা শিরিন আক্তার। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিলেট ব্যুরো অফিসের নিজস্ব প্রতিবেদক শাকিলা ববি।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে। বিভিন্ন দল থেকে অনেক দিন ধরে একটি ‘ভালো নির্বাচনের’ কথা বলা হচ্ছে। সেই ‘ভালো’ নির্বাচনের পরিবেশ দেখছেন এখন?
সৈয়দা শিরিন আক্তার: আমি পুরোপুরি ‘ভালো’ নির্বাচনের পরিবেশ দেখছি না। কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছে নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে রকম হওয়ার কথা ছিল, এখনো সে রকম দেখছি না। এখনো অনেক খুন-খারাবি হচ্ছে। তাই আমার মনে হচ্ছে নির্বাচনের পরিবেশ আরও ভালো করতে হবে।
খবরের কাগজ: নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি? নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কি তৈরি হয়েছে?
সৈয়দা শিরিন আক্তার: বস্তুত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটি দল নির্বাচন করছে। আওয়ামী লীগ যেহেতু নেই, বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বেশির ভাগ দল জোট করাতে বলা যায় যে এই দুটি দলের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড খুব একটা খারাপ মনে হচ্ছে না। দেখা যাক, সামনে কী হয়। প্রশাসনের আবার কোনো একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়ারও আশঙ্কা আছে।
খবরের কাগজ: বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই। নির্বাচনের আগে এ ক্ষেত্রে কিছুটা কি উন্নতি হয়েছে? কোথায় আরও কাজ করতে হবে?
সৈয়দা শিরিন আক্তার: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। এখনো হঠাৎ করে খুনোখুনি হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের ছোট পদধারী নেতা বা কর্মীদেরও খুন করা হচ্ছে। এটি একটি আশঙ্কার বিষয়। আমার কাছে মনে হয় কয়েকটি বিষয়ে কাজ করতে হবে। যেমন ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় অনেক থানা ও কারাগার থেকে দণ্ডিত অপরাধী বের হয়ে গিয়েছিল তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং থানা থেকে অনেক অস্ত্র লুট হয়েছে। সেসব অস্ত্র কিন্তু উদ্ধার হয়নি। সেই অস্ত্রগুলো নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই নির্বাচনের আগে এই অস্ত্রগুলো উদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা করা জরুরি। অনেক অপরাধী কারাগার থেকে পালিয়েছে, আবার অনেককে বিজ্ঞ আদালত জামিন দিয়েছেন তাই জামিনপ্রাপ্তদের নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু কারাগার ভেঙে যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের গ্রেপ্তার করা উচিত।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেমন দেখছেন?
সৈয়দা শিরিন আক্তার: প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ মনে হচ্ছে। কিন্তু সিলেটে দেখলাম রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রার্থী প্রশ্ন তোলার পর আবার তিনি প্রমাণসহ তার কাজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটা ভালো লক্ষণ। প্রশাসন যাতে কোনো অবস্থাতেই কোনো দলের প্রতি ঝুঁকে না যায়–এ ব্যাপারে তাদের সতর্ক থাকতে হবে।
খবরের কাগজ: নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে আপনার অভিমত কী?
সৈয়দা শিরিন আক্তার: নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ার কারণে গণভোটের প্রচার খুব একটা হচ্ছে না। কারণ প্রার্থীরা সবাই নিজেদের দল জেতানো নিয়ে ব্যস্ত। গণভোটের একটি প্রশ্নই চারভাবে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গণভোটের ব্যাপারে এখনো অনেকেই জানেন না। দেশের মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে অনেকেই গণভোটের ব্যাপারটা বোঝেননি। নির্বাচনের দিন তারা হয়তো না বুঝেই ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন। গণভোট নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে আরও অনেক বেশি প্রচার চালানো দরকার ছিল।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন?
সৈয়দা শিরিন আক্তার: আসন্ন নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা। নির্বাচনের প্রাক্কালে, নির্বাচনের সময় এবং নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। অনেক মানুষ নির্যাতিত হয়। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারী, প্রান্তিক মানুষের ওপর অনেক ধরনের আঘাত আসে। তাই আমি মনে করি এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকারের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা নিয়ে আমার মনে যথেষ্ট শঙ্কা আছে।
খবরের কাগজ: নির্বাচনে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?
সৈয়দা শিরিন আক্তার: নির্বাচনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে। পাশাপাশি সংবাদ পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠতা থাকতে হবে। সত্য ঘটনা সব সময় তুলে ধরতে হবে। শুধু নির্বাচনকালে না, সব সময়ই গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমের কর্মীর কাছে আমরা প্রত্যাশা করি–তারা কোনো দলের প্রতি বা বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবেন না। তারা নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে যেখানে যা ঘটে, প্রকৃত সত্যটা তুলে ধরবেন।