ড. আলী রীয়াজ একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সরকার বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: আমাদের মনে রাখতে হবে, আগামী জাতীয় সংসদকে বলা হয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। নতুন জাতীয় সংসদের একটা বড় দায়িত্ব হবে, অর্থাৎ যদি জুলাই সনদ পাস হয়, তা হলে সেটা সংবিধানে যুক্ত করতে হবে। এর বাইরেও সংবিধানে যুক্ত করার মতো আরও কিছু বিষয় আছে। এই সমস্ত বিবেচনায় আমরা বলেছি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এটা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সংবিধান পরিষদ হিসেবে বিবেচিত হবে ১৮০ দিনের জন্য। এই পরিষদ সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করবে। সেদিক থেকে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যেকোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে আমরা যে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, অর্থাৎ যে নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেটা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনটা নির্বাচন। তার একটা হচ্ছে গণভোট। গণভোট যদি পাস হয়, তা হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং সেটাই হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সবার মধ্যে যে উৎসাহ দেখতে পাচ্ছি, এটা অত্যন্ত ইতিবাচক বলে আমরা মনে করছি।
খবরের কাগজ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটুকু অনুকূলে আছে বলে আপনি মনে করছেন?
ড. আলী রীয়াজ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টা প্রকৃতপক্ষে যারা সরাসরি আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, তারা আরও সুস্পষ্টভাবে বলতে পারবেন। তবে সামগ্রিকভাবে আমরা যারা বাইরে থেকে দেখছি, দু-একটি ঘটনা ঘটেছে- যেগুলো অবশ্যই উদ্বেগজনক। তা সত্ত্বেও স্বাভাবিকভাবে যেটা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, বড় ধরনের কোনো হুমকি এখন পর্যন্ত উপস্থিত হয়নি। একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচন এবং জনগণের অংশগ্রহণের জায়গাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যেই তারা প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রার্থিতা বিষয়ে যে সমস্ত বিষয় আছে, সেগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেন। আমরা আশা করছি ২২ তারিখ তারা আরও সংগত কারণেই প্রচারে নামবেন। এর বাইরে বড় রকমের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনোরকম হুমকির মুখে আছে বা জনগণের জন্য বিপজ্জনকভাবে আছে, নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এমনটা মনে করছি না।
খবরের কাগজ: গণভোট কতটা সফল হতে পারে বলে মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: আমরা অত্যন্ত আশাবাদী যে, গণভোট সফল হবে এবং জনগণের পক্ষ থেকে একটা বড় রকমের সমর্থন পাওয়া যাবে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছে আছে। যদি পরিবর্তনের ইচ্ছা না থাকত, তা হলে ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান হতো না। গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংস্কারকে বাস্তবায়নের জন্য ঐকমত্যে এসেছে, সেক্ষেত্রে কিছু কিছু ভিন্নমত আছে। সামগ্রিকভাবে গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কারোরই দ্বিমত ছিল না। গণভোটের একটা বড় দিক হচ্ছে, এটা একটা সাংবিধানিক ক্ষমতা, যা আসলে জনগণ চর্চা করবে। যে কারণে আমরা বলেছি যে, আগামী সংসদ হবে একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং সেটা সীমিত সময়ের জন্য। তারা এ সনদের মধ্যে যে সমস্যা আছে, সেগুলো সমাধান ও বাস্তবায়ন করবে। ফলে নানারকম কার্যক্রমের বিষয় নিয়ে প্রচার চলছে এবং প্রচার অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থিতার বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পর তারা গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে।
খবরের কাগজ: নির্বাচনে একটি বড় দল আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারছে না। এ বিষয়ে কি বলবেন?
ড. আলী রীয়াজ: আওয়ামী লীগ বলে যে সংগঠনটির কথা উল্লেখ করলেন, সেই সংগঠনটির রাজনৈতিক কার্যকলাপ এখন সাময়িক নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন স্থগিত রেখেছে। এই রাজনৈতিক দলের কোনো নেতার কাছ থেকে, এমনকি নিম্নপর্যায়ের নেতার কাছ থেকেও আমরা কেউই কোনোরকম ক্ষমা প্রার্থনা বা অনুশোচনা দেখিনি। উপরন্তু এই দলের সভানেত্রী বলে যিনি পরিচিত, তিনি লুকিয়ে থেকে দেশের বাইরে বসে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং এক ধরনের সহিংস কাজে প্ররোচনা দিচ্ছেন। এগুলো তো রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নয়। ইতোমধ্যেই সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বেশ কয়েকজন, যার মধ্যে এই দলের এখন পর্যন্ত যিনি সভানেত্রী, তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এবং দণ্ডিত হয়েছেন।
খবরের কাগজ: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, নির্বাচন ও সংস্কার কার্যক্রম একই সমান্তরালে চলবে। এ বিষয়ে কিছু বলুন।
ড. আলী রীয়াজ: দেখুন, সরকারের পক্ষ থেকে অনেক কিছু সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নও করা হয়েছে। যেমন- একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা তারা করতে পেরেছে। কিংবা ধরুন বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া তৈরি করা, সেটাও তারা করতে পেরেছে। পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, আইনসহ কিছু কিছু বিষয়ের সংস্কার হয়েছে। আরও বেশি সংস্কার করা সম্ভব হলে সেটা আরও বেশি ইতিবাচক হতো। এর মধ্যে বিভিন্ন রকম সীমাবদ্ধতাও ছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সমস্ত কিছু বিবেচনায় নিয়ে আমার কাছে মনে হয় যে, সংস্কার প্রক্রিয়ার একটা বড় দিক হচ্ছে সংবিধান। সেক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এই প্রস্তাবগুলো খুবই সুস্পষ্ট। গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে জনগণের সম্মতি নিয়ে রাজনৈতিক দল যারাই ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদে থাকবেন এবং রাজনীতিতে থাকবেন অর্থাৎ এটা কেবলমাত্র জাতীয় সংসদে যারা থাকবেন তাদের দায়িত্ব নয়। এটা সবারই দায়িত্ব হবে।
আরও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয়েছে। আমরা ব্যাংকিং ক্ষেত্রে বেশকিছু সংস্কারের কথা জানি। এর পাশাপাশি ধরুন, পুলিশের একটি কমিশন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এবং অন্য যে সমস্ত পদক্ষেপ রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা মনে করি, বেশকিছু ক্ষেত্রে আমরা সংস্কার করতে পেরেছি। কিন্তু সংবিধান সংস্কারের বিষয়টা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং যে দল জাতীয় সংসদ গঠন করবে, তাদেরকেই করতে হবে। এ ব্যাপারে আশা করি জনগণের সম্মতি পাওয়া যাবে এবং সেটা খুব খুবই জরুরি।
উপরন্তু, একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি অর্থাৎ প্রায় ধসে পড়া একটা অর্থনীতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে শুরু করতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিগত সময়ে যে ধস নেমেছিল, সেই ধসটা তারা বন্ধ করতে পেরেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। এগুলো সবই ইতিবাচক। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের ঘাটতি থেকে গেছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সেটা খুবই স্বাভাবিক। যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে বিদেশি এবং দেশি বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করেন যে, তারা আসলে একটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা বিবেচনা করে বিনিয়োগ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বলব বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো আশা করি বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে। যেমন- আমাদের পোশাকশিল্পে একটা অগ্রগতি হয়েছে। এর বাইরে আরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা আমরা দেখতে পাই। তার মধ্যে একটা বড় বিষয় হচ্ছে যে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত যেসব ব্যাংক ছিল, সেগুলো অন্ততপক্ষে সাময়িকভাবে হলেও বন্ধ করা গেছে। এটাকে আমি অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছি। একটা ধসে পড়া অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য যে চেষ্টাটা করতে হয়েছে, সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কাটছাঁট করতে হয়েছে। সেদিক থেকে সব সময় এই ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগণ, এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সত্যি। পৃথিবীর যেকোনো দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের অন্তর্বর্তী সময় এই বিপদটা একটা বড় সংখ্যক জনগণকে ভুক্তভোগী করেছে। সরকার যতদূর সম্ভব চেষ্টা করেছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে খুব একটা বড় রকমের অর্জন ১৬ বা ১৮ মাসে করা সম্ভব নয়।
খবরের কাগজ: নির্বাচন কমিশনের ‘নিরপেক্ষতা বা দায়বদ্ধতা’ সম্পর্কে জনগণের সন্তুষ্টি কতটুকু বলে মনে করছেন?
ড. আলী রীয়াজ: নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত যে সমস্ত কাজ করেছে তাতে আমি বড় রকমের কোনো ব্যত্য়য় দেখতে পাইনি। তবে শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের প্রক্রিয়া অর্থাৎ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ফলাফল ঘোষণা, সেগুলোর ওপর নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হলো কি না! সামগ্রিকভাবে বললে, চ্যালেঞ্জগুলো তো থেকেই যাচ্ছে। আমাদের প্রায় ১৬ বছরে কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। আমাদের ভোটাররা বিগত সময়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেননি। তাদেরকে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটদানের ব্যাপারে আস্থা তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এ পর্যন্ত সমস্ত জরিপেই যদিও দেখা যায় লোকজন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছে। আশা করি তারা যুক্ত হবেন।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১২ ফেব্রুয়ারি ) নিয়ে আপনার আশাবাদ কতটুকু?
ড. আলী রীয়াজ: আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে, মানুষ যেহেতু ভোট দিতে চান, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীলভাবেই নিজ নিজ ভূমিকা পালন করবেন এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে আমরা দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহিমূলক একটা রাষ্ট্রের ব্যাপারে জনগণের সম্মতিটুকু আমরা পাব। এগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের যাত্রাটা শুরু হবে।
মানুষ যা চায় আমাদেরকে সেটা সুনিশ্চিত করতে হবে এবং আমি আশাবাদী যে, এটা সম্ভব।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. আলী রীয়াজ: আপনাকেও ধন্যবাদ।