ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ মার্তিনেজকে ঘিরে নতুন শঙ্কা শাহবাগে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বিক্ষোভ নাটোরে ৭০ দরিদ্র রোগীর বিনামূল্যে ছানি অপারেশন চাকরি মেলায় সাড়া, রাজশাহীতে ৫০ শতাংশ প্রার্থীর তাৎক্ষণিক নিয়োগ ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন মাইকেল অলিভার ‘ফেনীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় ওছমান হারুন মাহমুদ দুলাল’ পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রিন ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মিসরকে কেন জার্সি পরিবর্তন করতে বলল ফিফা? রবিবার বিশ্ব রক্তদাতা দিবস যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায় রাজধানীতে প্রান্তিক গ্রামের ফুটবল উন্মাদনা, আর্জেন্টিনা–ব্রাজিল ম্যাচ একদিনে ৫ মরদেহ উদ্ধার, বরগুনায় চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ দাউদকান্দিতে শিবির নেতার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায়কারীরা জনগণের বন্ধু নয়: তারেক রহমান মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করায় আনন্দ মিছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আগারগাঁওয়ে ‘রান ফর আর্থ’ আয়োজন সিদ্ধিরগঞ্জের ডিএনডি লেকে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু জনদুর্ভোগ নিরসন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি ডা. শফিকুর রহমানের ভারতীয় সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে ধীরাজ শেঠ ‘তুই আসামি, চোখ নামিয়ে কথা বল’—ওসির বিরুদ্ধে নাঈম হাসানের অভিযোগ প্রযুক্তিদক্ষ তরুণরাই গড়বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী সোনারগাঁওয়ে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক হবে: শিক্ষামন্ত্রী জলবায়ু-সহনশীল ও পরিবেশ-বান্ধব পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ বিআইপির আলোচিত সিনেমার সিক্যুয়েল নিয়ে জয়া টেইলর সুইফটের নতুন রেকর্ড পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি? সাংবাদিকতায় দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন: মোস্তফা কামাল
Nagad desktop

কালের সাক্ষী মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৫৩ পিএম
আপডেট: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৫৪ পিএম
কালের  সাক্ষী মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি

আজকাল নগর জীবনের অনেকেই আছেন ছুটির দিনে, দলবেঁধে বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে পছন্দ করেন। তাদের জন্যই দিনে দিনে বেড়ানোর মতো জেলা ময়মনসিংহ থেকে ঘুরে এসে লিখেছি ভ্রমণগল্প।হুট করেই দে-ছুট। ছুটছি ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া। রাতটা কাটিয়ে পর দিন যাব মুক্তাগাছা।

ব্যক্তিগত বাহনে রাত ৯টায় রওনা দিয়ে ঢাকার যানজট ঠেলে ঠুলে পৌঁছাই রাত প্রায় ২টায়। কিছুটা দেরি হওয়ার কারণও রয়েছে, চলতি পথে নানান জায়গায় গাড়ি ব্রেক দিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খানিকটা সময় দোকানিদের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছি। ভ্রমণকালীন নানা জায়গার নানা মানুষের জীবনমান সম্পর্কে ধারণা নেওয়াটাও আমাদের কাছে বেশ ভালো লাগে।

ফুলবাড়ীয়া বাজারে আগে থেকেই তাবলিগ জামাতে যাওয়া বন্ধু মোস্তাক অপেক্ষমাণ ছিল। তার সঙ্গে কুশলাদি সেরে আশ্রয় নেই মসজিদে। খুব স্বল্প সময়ের ঘুম কিন্তু তৃপ্তি বোধ বেশ। ফজরের নামাজ আদায় শেষে চলে যাই সৌন্দর্যের চাদরে ঘেরা গ্রামগুলো ঘুরতে। এই গ্রাম থেকে ওই গ্রাম ঘুরে, ফিরি আবার মসজিদে। চিল্লায় যাওয়া ভাইদের আয়োজনে, নাশতা সেরে চলে যাই মুক্তাগাছার পথে। এবারের ভ্রমণ সঙ্গী ছিল উজ্জ্বল, কালাম ও চির তরুণ রাজা।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাই মুক্তাগাছা রাজবাড়ি। রাজবাড়ির বিশাল ফটকে দাঁড়িয়ে নিজেকে রাজা রাজা মনে হতে লাগল। এটি একটি প্রাচীনতম ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। এর বয়স প্রায় ৩০০ বছর। নিরাপত্তারক্ষীদের অনুমতি নিয়ে ঢুকে যাই ভেতরে। ওমা একদা মহারাজা আচার্য্য চৌধুরীর বাড়ির এমন ভগ্নদশা কেন? ভাবতেই বেশ অস্বস্তি লাগে। দে-ছুটের বন্ধুরা ইতিহাস-ঐতিহ্যের টানে পুরো বাড়িটি চষে বেড়ানোর চেষ্টা করি। প্রতিটি স্থাপনা বেশ ভালো করে পরখ করি।

প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ি। বাড়ির ভেতর আস্তাবল, মন্দির, রং মহল, সিন্দুক ঘর, নাট্যমঞ্চ ও বসতঘরসহ আরও অনেক কিছুই রয়েছে। নেই শুধু রাজা থেকে মহারাজা উপাধিপ্রাপ্ত জমিদার আচার্য্য চৌধুরী- শৌখিন জমিদার শশীকান্ত চৌধুরীর পদচারণা কিংবা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানো অবাধ্য প্রজার গগনবিদারী চিৎকার। তবে যতটুকু অক্ষত রয়েছে তার নির্মাণশৈলী দেখেই বোঝা যায় যে, বাড়ির ভেতরের স্থাপনাগুলো ছিল বেশ দৃষ্টিনন্দন। 

এই বাড়িতে ১৯৪৫ সালে উপমহাদেশের প্রথম ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ স্থাপন করেছিলেন নাট্যপ্রেমী জমিদার জীবেন্দ্র কিশোর আচার্য্য চৌধুরী। যা তাদের আভিজাত্যের পরিচয় বহন করে। ভগ্ন অবস্থায় দোতলা একটি ঘর দেখা গেল, জানা যায় গরমের দিনে প্রাকৃতিকভাবেই বাইরে দিয়ে ঘামিয়ে ভেতরে ঘরকে রাখত ঠাণ্ডা। জমিদার আচার্য্য চৌধুরীর পূর্বপুরুষরা থাকতেন বগুড়াতে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে নানা কারণে শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরীর চার ছেলে হররাম, শিবরাম, বিষ্ণুরাম, রামরাম তৎকালীন আলাপসিং পরগনা আসেন। এখানে বসবাসের জন্য মনস্থির করেন।

আলাপসিং পরগনার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখেন। পরে মুক্তাগাছার জায়গাটা পছন্দ করেন। উল্লেখ্য আজকের মুক্তাগাছা তৎকালীন আলাপসিং পরগনার অধীনে ছিল। জমিদার আচার্য্য চৌধুরীর বংশের প্রথম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরী মুর্শিদাবাদ নবাবের খুব আস্থাভাজন ছিলেন। সেই প্রতিদানস্বরূপ তিনি ১১৩২ খ্রিষ্টাব্দে নবাবের কাছ থেকে আলাপসিং পরগনার বন্দোবস্ত পেয়েছিলেন। সেই সময় মুক্তাগাছা শহরসহ আশপাশে জলাভূমি ও অরণ্য ঘেরা ছিল। মূলত জমিদার আচার্য্য চৌধুরীর বংশের পূর্বপুরুষদের মাধ্যমেই মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন। তৎকালীন সময়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন এই বাড়ির জমিদার বাবুরা। তারাই ১৬ হিস্যার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এই বাড়ির জমিদার বাবুরা জ্ঞান চর্চায়ও ছিলেন বেশ আগ্রহী। ময়মনসিংহের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই তাদের বেশ অনুদান রয়েছে। মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ির লাইব্রেরির অনেক দুর্লভ বই বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে সংরক্ষিত রয়েছে। রাজবাড়ির মূল ফটকের সামনেই রয়েছে সাত ঘাটের বিশাল পুকুর। প্রতিটি ঘাটই বাঁধানো। পুকুরের পাশেই দুর্লভ প্রজাতির নাগলিঙ্গম/নেগুরা বৃক্ষ রয়েছে। সেই গাছে এখনো ফুল ফুটে আগন্তুকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ঘাটে বসে বি-মুগ্ধ নয়নে পুকুরের সৌন্দর্য দেখি আর কল্পনাতে ফিরে যাই সেই জমিদারির আমলে। যখন তাদের সম্মানে বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে আর ছাতা টাঙিয়ে কোনো প্রজা হেঁটে যেত না। সময়ের আবর্তনে আজ সবকিছুরই বিবর্তন।

হারিয়ে যায় সবচেয়ে যায় ইতিহাস। মুক্তাগাছার শেষ জমিদার ছিলেন রাজা জীবেন্দ্র কিশোর আচার্য্য চৌধুরী। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরে তিনি ভারতে চলে যান। ঘুরাঘুরি শেষে আমরাও মুক্তাগাছার মন্ডা খেয়ে ফিরতি পথ ধরি। তাহলে বন্ধুরা আর দেরি কেন? ছুটিতে ছুটে যান, ধান-নদী-মহিষের সিং এই তিন মিলে গড়া ময়মনসিংহ। 

যোগাযোগ: ঢাকা মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস ময়মনসিংহ চলাচল করে। এ ছাড়া সরাসরি মুক্তাগাছা পর্যন্তও চলাচল করে তবে ময়মনসিংহ শহরে গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি করে গেলে পর্যটকদের জন্য সুবিধা বেশি হবে। 
থাকা-খাওয়া: সাধ্যের মধ্যেই ময়মনসিংহ শহরে মানভেদে অনেক আবাসিক হোটেল ও খাবার রেস্টুরেন্ট রয়েছে। 

/রোদসী 

 

বিমানবাহিনী জাদুঘরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০২:৩২ পিএম
বিমানবাহিনী জাদুঘরে

আকাশে ওড়ার স্বপ্ন কমবেশি আমাদের সবারই আছে। পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়াতে না পারলেও এখন উড়োজাহাজে করে মানুষ আকাশে উড়তে পারে। স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন দেখতে কার না ভালো লাগে। সেটা যদি হয় ‘যুদ্ধবিমান’ বিষয়ক কোনো নিদর্শন–তাহলে কৌতূহলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তেমনই কৌতূহলের এক জাদুঘর ‘বাংলাদেশ বিমান জাদুঘর’। 

যেখানে রয়েছে ডাকোটা বিমানসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে যাচ্ছিলাম বিমান বাহিনী জাদুঘর ঘুরতে যাব। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে হয়ে উঠছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি আর পৃথু বের হলাম ভ্রমণ গন্তব্যের পানে। শুক্রবার বলে রাস্তায় তেমন যানজট নেই বললেই চলে। 

প্রায় ৩৯ মিনিটেই আমরা এসে উপস্থিত হলাম জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে। শুরুতেই কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিলাম। জাদুঘরের বাইরে দিকটা দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ছোটখাটো একটি পরিসরের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর বুঝতে পারলাম এটি আয়তনের দিক থেকে বেশ বড়।

জাদুঘরটি বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত এবং এখানে একটি ছোটখাটো বিনোদনকেন্দ্রও আছে। নরম ঘাসের ওপর দিয়ে পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। অন্য সব জাদুঘর থেকে এ জাদুঘরটি আলাদা। এটি কোনো বদ্ধ ঘরে নয়। 

খোলামেলা সবুজ প্রান্তরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে এ ঐতিহাসিক জাদুঘর। জাদুঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে চোখে পড়ল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিমান বাহিনীর গৌরবের জঙ্গিবিমান, হেলিকপ্টার ও রাডার। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা দর্শনীর বিনিময়ে চেপে বসলাম হেলিকপ্টারে। ছোটবেলায় খুব আগ্রহ ছিল কীভাবে বিমান আকাশে ঘুরে বেড়ায়। 

একজন আমাদের বলছিলেন কীভাবে হেলিকপ্টার আকাশে ডানা মেলে। আজ নিজের চোখে দেখতে পেলাম। মোট ১৯টি বিমান এবং ৩টি রাডার রয়েছে এ জাদুঘরে। যুদ্ধবিমান ডাকোটার পাশাপাশি রয়েছে ‘অ্যালিউট’ হেলিকপ্টার। এটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর সেনানিবাসে আঘাত হানা হয়েছিল। মূল গেট থেকে খানিক এগোলে চোখে পড়ল বিশাল একটি বিমান।

 

বাংলাদেশের প্রথম পরিবহন উড়োজাহাজ এটি। রাশিয়ার তৈরি এন-২৪ বিমানটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে ১৯৭৩ সালে ‘বলাকা’ নামে সংযোজিত হয়। বিমানটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪৪ জন। বলাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। বলাকা ছাড়াও আরও তিনটি বিমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। বিমানগুলোয় প্রবেশের জন্য টিকিট মূল্য ৩০ টাকা। বিমানগুলোয় প্রবেশ করলে প্রদর্শন করা হয় বিমান বাহিনীর ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। দেখা পেলাম হান্টার বিমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিমানটি দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর হামলা চালানো হতো। ওই সময়ে এটি খুবই শক্তিশালী এবং নির্ভরশীল বিমান ছিল। 

বিমান বাহিনীতে ১৯৮৯ সালে চীনের তৈরি ‘এফটি-৭ বিমান’ যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রথম সংযোজিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৮৬ যুদ্ধবিমানটি ব্যবহার করে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়ে বিমানটিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে বিমান বাহিনীর প্রকৌশল কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানরা বিমানটি মেরামত করেন এবং ১৯৭২ সালে সফলভাবে উড্ডয়ন করান। বিমানটি ১৯৪৭ সালের তৈরি। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীর বৈমানিকরা কানাডায় নির্মিত অটার-৭২১ বিমান দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। সেটিও আছে এই জাদুঘরে। রয়েছে মিগ-২১ এফএল বিমান। বিমানটি প্রধানত আকাশ প্রতিরক্ষা ও ভূমি পাহারার জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ বিমানটি আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ‘ন্যাট-৯১৬ বিমান’ জঙ্গিবিমানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক হালকা এবং আয়তনে ছোট।

১৯৫০ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। সে সময়ে ন্যাট বিমান আকাশযুদ্ধে অত্যন্ত চৌকস বিমান হিসেবে পরিচিতি ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তিনটি ন্যাট বিমান পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট (এফ-৮৬) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর বগুড়ায় আকাশযুদ্ধে এ বিমানটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। জাদুঘরে স্থাপিত প্রতিটি নিদর্শনের সঙ্গে আছে তথ্যাবলি। আগ্রহীরা তা থেকে জেনে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় তথ্য। 

মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর শহিদদের স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে শহিদ কর্নার। জাদুঘরে দর্শনার্থীদের খাবারের সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ফুড কোর্ট। এছাড়া বিমান বাহিনীর বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিয়ে সজ্জিত হয়েছে স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’। শিশুদের মনোরঞ্জন ও উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য শিশু পার্কের পাশাপাশি ফুটপাথের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, হরিণ ইত্যাদি নানা রকম পশুপাখির প্রতিকৃতি। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’। রয়েছে পানির ফোয়ারাও। এছাড়া পাহাড়ের আদলে তৈরি হচ্ছে ‘থিম পার্ক’।

বিমান জাদুঘরের সময়সূচি
বিমান বাহিনী জাদুঘর সোম থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্র থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি।


বিমান জাদুঘরের টিকিট মূল্য
৫০ টাকা মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। মাত্র ৩০ টাকায় বিমান ভ্রমণ! এখানে ৩০-১০০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ভেতরের হেলিকপ্টার বা বিমানে ওঠা যায়।

কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আগারগাঁও চলে আসুন। রাজধানীর গুলিস্তান থেকে বিহঙ্গ, হিমাচল, স্বাধীন, হাজি ট্রান্সপোর্ট, ইটিসি ট্রান্সপোর্টসহ অনেক বাসে আগারগাঁও যেতে পারবেন। বিমান বাহিনী জাদুঘর বললেই নামিয়ে দেবে। এছাড়া রামপুরা থেকে হিমাচল, আলিফ পরিবহনেও যেতে পারবেন। কিংবা নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি নিয়ে ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সহজে যেতে পারবেন।

/এমটি

পদ্মার জলের হাতছানি...

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
আপডেট: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
পদ্মার জলের হাতছানি...

রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে একদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। সেখানে গেলে পদ্মার সৌন্দর্য যেমন আপনাকে মোহিত করবে, তেমনি খেতে পাবেন পদ্মার তাজা ইলিশ। আমরা সাধারণত পরিচিত জায়গা ছাড়া ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। নিরাপত্তার কারণেও আমরা অনেক জায়গায় যেতে চাই না। 

যান্ত্রিক নগরী ঢাকার আশপাশে ঘোরার জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেকে ছুটির দিনগুলো ঘুমিয়েই কাটান। অনেকের আবার ঘুরতে যাওয়ার আগে কত কিছু চিন্তা করতে হয়! সময়, পর্যাপ্ত অর্থ এবং ভালো ভ্রমণ সঙ্গী নিয়ে একটা চিন্তা থেকেই যায়।

হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় নেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার, অথচ নিজেকে প্রাণবন্ত করার জন্য একটু নান্দনিক এবং মনোরম পরিবেশের প্রয়োজন। তাই হন্যে হয়ে খুঁজছেন ঢাকার আশপাশেই কোনো মনোরম পরিবেশ।

এমন সবকিছুর সমাধান দিতে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। আমি খুব ঘুমপ্রিয় মানুষ, তাই শুক্রবার এলেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। কয়েক দিন ধরে চিন্টু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছিল ওকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

গত শুক্রবারও ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ার জন্য কোথাও যেতে পারিনি আর সেই ধারাবাহিকতায় আজও দেরি করে উঠেছি ঘুম থেকে। এদিকে চিন্টুর মন খুব খারাপ, আজও যেতে পারল না কোথাও। 

আমি মনে মনে ভাবলাম ছোট মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে, তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া উচিত। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকের কল্যাণে মৈনট ঘাটের নাম শুনছিলাম। তাই ভাবলাম দূরত্ব কম যেহেতু তাই বিকেল বেলাতেই চিন্টুকে নিয়ে বের হব। এখন আর কিছু না বলে চিন্টুকে সারপ্রাইজে দেব। 

কাল বেলা ব্যাংকের কিছু কাজ ছিল তা শেষ করলাম দুপুর হতেই চিন্টুকে বললাম বিকেল ৩টার মধ্যে রেডি থাকিস। ঠিক বিকেল ৩টায় আমরা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে মৈনট ঘাটের উদ্দেশে বাসে রওনা হলাম।

শুক্রবার তাই যান্ত্রিক শহরের কোলাহল কিছুটা হলেও কম আমাদের ফিটনেসবিহীন বাস এগিয়ে চলছে গন্তব্যস্থলে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম মৈনট ঘাটে। চিন্টু তো মৈনট ঘাটে এসে খুব খুশি দোহারের কার্তিকপুরের যে জায়গাটি পদ্মাপাড়ে গিয়ে মিশেছে তার নাম মৈনট ঘাট। এখানে ডানে-বাঁয়ে বালু চিকচিক করা স্থলভূমি থাকলেও সামনে শুধু রুপার মতো চকচকে পানি।

মৈনট পদ্মাপাড়ের একটি খেয়াঘাট। এখান থেকে প্রতিদিন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। খেয়া পারাপারের জন্য জায়গাটির পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। তবে এখন সেটা জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হিসেবেও।

এত দিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনট ঘাট। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মৈনট ঘাটের নতুন নাম হলো–মিনি কক্সবাজার! বিস্তীর্ণ জলরাশির ঢেউ আর সঙ্গে শরতের নির্মল আকাশ–এ এক অনবদ্য কাব্য। ছুটির দিন তাই অনেক মানুষের পদচারণে মুখর মৈনট ঘাট। জন মানবের পদচারণা দেখে মনে হলো নগরবাসীর কাছে নতুন এক নির্মল বিনোদনের স্থান। 

মিনি কক্সবাজারের তীরে আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি। খানিক পরপর মাছ ধরার ট্রলার ছুটে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা দেখে মাছ কেনার জন্য এগোচ্ছেন। দরদাম ঠিক থাকলে অনেক ভ্রমণপিপাসু মাছ কিনে নিচ্ছেন। পুরো নদীর তীর ও তার আশপাশের এলাকা সমুদ্রসৈকতের মতো করে সাজানো। হঠাৎ চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে দেখে খুব খারাপ লাগল, আমরাই আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছি। 

পদ্মা এত বিশাল যে, ওপারের কিছুই দেখা যায় না, দেখা যায় না ডান-বাঁয়ের কোনো বসতি। নদীর পারে ট্রলার ও স্পিডবোটের মহাজনদের মেলা। আপনি চাইলে ট্রলারে চেপে ওপারের চরভদ্রাসন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঘণ্টা চুক্তিতে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন। 

যা-ই করেন এখানে সময়টা কিন্তু বেশ কাটবে। আমরা ট্রলারে চেপে বসলাম ঘুরে বেড়ালাম প্রমত্ত পদ্মায়। আমাদের ট্রলারের মাঝি রহিম মিয়া বললেন এখানে সকালবেলাটা খুব ভালো কাটে, দুপুর কিছুটা মন্থর, তবে বিকেলবেলা অনেক বেশি জমজমাট। 

সোনা রোদের গোধূলিবেলার তো কোনো তুলনাই চলে না। নদীতে পাল তোলা নৌকার ঘুরে বেড়ানো আবার কখন উথাল-পাতাল ঢেউ–এ এক অন্য রকম অনুভূতি। দেখতে দেখতে সূর্য দেবের বিদায়বেলা চলে এল, সূর্য দেবের বিদায়বেলায় প্রকৃতি অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। নদীতে ভ্রমণ শেষে চিন্টু ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার বায়না ধরল। তাই তাকে নিয়ে ঘাটে অবস্থিত একটি হোটেলে গেলাম। সেখানে ইলিশ মাছ ভাজা খেলাম—কী অসাধারণ স্বাদ। এখানে ইলিশ ১৩০ থেকে ১৯০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে আপনাকে। 

কীভাবে আসবেন
ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাস। 
৯০ টাকা ভাড়া আর দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে।
 
সচেতনতা 
মৈনট ঘাটে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যদি আশপাশে ময়লা দেখতে পান তাহলে নিশ্চয় আপনার ভালো লাগবে না। তাই পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেখানে-সেখানে পানির বোতল, চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটসহ কোনো ময়লা ফেলা যাবে না। আপনি নিজে যেমন ফেলবেন না, তেমনি কাউকে ফেলতে দেখলে তাকে নিরুৎসাহিত করাটাও আপনার দায়িত্ব। আরেকটি কথা সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পদ্মার বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো।

/এমটি

ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

বেরিয়ে পড়েছি কেন্টের উদ্দেশে। কেন্ট হাসপাতালের প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. শাহাদত হোসেন ও ভাবির আমন্ত্রণে আমরা ছয়জন ছুটছি লন্ডন ছেড়ে কেন্টের উদ্দেশে। সম্পর্কে চিকিৎসক সাহেব আমার ভাসুর। গাড়ি চালাচ্ছে আমার সহোদর ব্যারিস্টার মুয়ীদ খান, আইন পেশায় সেন্ট্রাল লন্ডনে তার দীর্ঘ প্রবাসজীবনে দুবার নিজের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছেন লন্ডন ও ওয়েলসের ২০ হাজার আইনজীবীর মধ্যে নির্বাচিত ‘বেস্ট হিউম্যান রাইটস ল’ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। আগেই পরিকল্পনা করা হয়, আমরা গ্রিনিচ শহর দেখতে দেখতে কেন্ট শহরে ঢুকব। 

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহরের নাম গ্রিনিচ। এটি লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস জাংকশন থেকে ৫ দশমিক ৫ মাইল পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। কয়েক শ’ বছর ধরে এটি কেন্ট প্রদেশের একটি শহর ছিল এবং প্রদেশটি ভেঙে গেলে পরবর্তী সময়ে গ্রেটার লন্ডনের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল হয়। গ্রিনিচের সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত ইতিহাস, অসংখ্য ‘টিউডর’ রাজবংশের জন্মস্থান এবং গ্রিনিচ মানমন্দিরের জন্য এ শহরটি বিখ্যাত। ১৮ শতকে এটি ভ্রমণকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হওয়ায় এখানে অনেকগুলো ম্যানসনের মতো বড় বড় বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রিনিচের সঙ্গে সম্পর্কিত সমুদ্র সংযোগগুলো বিংশ শতাব্দীতে উদযাপিত হয়। এই স্থানের ওপর দিয়ে মূল মধ্য রেখা অতিক্রম করেছে। এখানে পৃথিবীর স্ট্যান্ডার্ড সময় গণনা করার মান মন্দির অবস্থিত।

আমরা নামলাম হক্সমুরের নকশায় সেন্ট আলফেজ চার্চটি দেখতে। ঐতিহাসিক স্থাপনা এটি। গ্রিনিচের টাউন সেন্টারের পশ্চিমে যা ১৭১৪ সালে নির্মাণ করা শুরু হয়ে ১৭১৮ সালে সম্পন্ন হয়। একটি নারকীয় ও জঘন্যতম হত্যার শিকার হন সেন্ট আলফেজ। জানা যায়, অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিখ্যাত একটি জাতির নাম ভাইকিং যারা দক্ষিণ স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আগত এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, ভিনল্যান্ড পর্যন্ত এরা জলদস্যুতা, লুটতরাজ ও কিছু কিছু সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চালনা করত।

সামরিক শাসনামলে কেন্ট প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এই ভাইকিং বাহিনীর বিশাল শিবির স্থাপিত হয় এবং এ বাহিনী এক সময় কেন্ট আক্রমণ করে। ১০১২ সালে তারা কান্টারবেরি শহর দখল করে এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতের কান্টারবেরির একজন বিখ্যাত বিশপ আলফেজকে বন্দি করে নিয়ে যায় যাকে গ্রিনিচের সেনাশিবিরে প্রায় সাত মাস ধরে বন্দি করে রাখা হয় (সে সময় গ্রিনিচ কেন্ট প্রদেশের অংশ ছিল)। আলফেজের কাছ থেকে তারা মুক্তিপণ হিসেবে বিরাট অঙ্কের পাউন্ড দাবি করে কিন্তু আলফেজ তা দিতে রাজি হননি।

ফলে ইস্টার সানডের যে আট দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় তাদের মধ্যে একটি শনিবারে মৃত্যুদণ্ড হিসেবে আলফেজের গায়ে তারা পশুর হাড় ও মাথা নিক্ষেপ করতে শুরু করে, একপর্যায়ে কুঁড়ালে গাঁথা এরকম একটি হাড় তার মাথার খুলি ফুটো করে ঢুকে যায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করার পরও শেষ হাড়টি তার রক্তে না ভেজা পর্যন্ত তারা তাকে আঘাত করে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর আলফেজকে সেন্ট উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং ১২ শতকে প্যারিশ চার্চ তার নামে উৎসর্গ করা হয়।

গ্রিনিচ ও এর আশপাশের নদীগুলো বেশ গভীর। গ্রিনিচের দক্ষিণ দিকের অঞ্চলটি গ্রিনিচ পার্ক থেকে ব্ল্যাকহেথ পর্যন্ত খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ১০০ ফিট। দেখতে পাচ্ছি এখানকার উচ্চতর এলাকাগুলো এক ধরনের পাথুরে পাললিক মাটির স্তর দিয়ে গঠিত। এই মাটিকে ব্ল্যাকহেথ বেড বলা হয়। আসলে টেমস নদীর অববাহিকার দক্ষিণদিকের একটি প্রশস্ত প্ল্যাটফর্মের ওপর গ্রিনিচ অবস্থিত। গ্রিনিচ মূলত শীতপ্রধান এলাকা।

গ্রিনিচ মানমন্দির (Royal Observatory, Greenwich) ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনিচ পার্কের চূড়ায় অবস্থিত। এটি একটি ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটির দ্রাঘিমাগত মান ০° অর্থাৎ এর ওপর মূলমধ্যরেখা গেছে। দিক নির্ণয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্থান। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। গ্রিনিচের মান মন্দির (রয়্যাল অবজারভেটরি), ন্যাশনাল মেরিটাইম জাদুঘর, রানির বাড়ি ও ক্যাটি সার্ক একত্রে রয়্যাল মিউজিয়াম গ্রিনিচ নামে পরিচিত। 

প্রাইম মেরিডিয়ান ও জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ পৃথিবীর সময় অঞ্চল এবং মানচিত্র তৈরিতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। এটির সময়কে প্রমাণ ধরে অন্যান্য জায়গার সময় নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়। এটির সাহায্যে অন্যান্য স্থানের দ্রাঘিমাগত মান নির্ণয় করা যায়। ১৬৭৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রিনিচ মানমন্দিরটি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সময় গণনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকেই পৃথিবীর সময় অঞ্চলগুলোর জন্য আদর্শ সময় বা গ্রিনিচ মান সময় (Greenwich Mean Time - GMT) নির্ধারণ করা হয়।

এই মানমন্দিরের মধ্যে প্রাইম মেরিডিয়ান অবস্থিত, যা পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করেছে। জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ হিসেবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই স্থানটি বর্তমানে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। গ্রিনিচ মান ০° অবস্থিত ধরে বাংলাদেশের অবস্থান ৯০° পূর্বে অর্থাৎ বাংলাদেশের সময় ৯০×৪ = ৩৬০ মিনিট বা ৬ ঘণ্টা আগে। তাই বলা যায় গ্রিনিচ সময়ের সঙ্গে ছয় ঘণ্টা যোগ করলে বাংলাদেশের সময় হয়।

প্রাইম মেরিডিয়ান পৃথিবীর দ্রাঘিমাংশের (longitude) জন্য জিরো ডিগ্রি রেখা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবীর ভূভাগকে পূর্ব গোলার্ধ ও পশ্চিম গোলার্ধ এই দুই ভাগে ভাগ করে। গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে ১৮৮৪ সালে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। মজার বিষয় হলো, মেরিডিয়ান রেখা একটি সরলরেখা হলেও প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে পাঠানোর সময় কিছুটা ঝিকঝাক রয়েছে। এর মূল কারণ, সময় অঞ্চলের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার (International Date Line) সংযোগ নিশ্চিত করা।

প্রাইম মেরিডিয়ানের বিপরীত দিকে ১৮০° দ্রাঘিমাংশে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অবস্থিত। এটি দিন এবং সময়ের হিসাব নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারিখ রেখা অতিক্রম করলে সময় এক দিন যোগ বা বিয়োগ হয়। পৃথিবী ঘুরতে ২৪ ঘণ্টা সময় নেয় এবং এই ২৪ ঘণ্টা ৩৬০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ডিগ্রি অতিক্রম করতে সময় লাগে চার মিনিট। তাই, পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানে সূর্য ওঠা এবং অস্ত যাওয়ার সময় আলাদা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরে প্রবেশ করতেই দেখতে পাই একটি সুন্দর বাগান। বাগানের কেন্দ্রে দুটো ডলফিনের মূর্তি রয়েছে, যা একটি সূর্য ঘড়ি। এই সূর্য ঘড়ির সাহায্যে প্রাকৃতিক সূর্যালোকের ভিত্তিতে সময় নির্ণয় করা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর টেলিস্কোপ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম। এখানে দুটি প্রাথমিক টেলিস্কোপ রয়েছে, যা ১৭ ও ১৮ শতকে ব্যবহৃত হতো। এই টেলিস্কোপগুলো বসিয়েছিলেন প্রথম জ্যোতির্বিদ জন ফ্ল্যামস্টিড। গ্রিনিচ মানমন্দিরে একটি ক্যামেরা অবস্কিওরা রয়েছে, যা প্রথম দিকের জ্যোতির্বিদ্যার এক অনন্য উদ্ভাবন। এটি সূর্যের প্রতিবিম্ব এবং কুইন্স হাউসের পিলারগুলোর প্রতিফলন পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

প্রাইম মেরিডিয়ানে দাঁড়ানো একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। মাটিতে তামার পাতের মাধ্যমে চিহ্নিত জিরো ডিগ্রি রেখা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। কেউ যদি ডান পা তামার পাতের পূর্ব দিকে এবং বাম পা তামার পাতের পশ্চিম দিকে রাখেন, তাহলে একসঙ্গে দুই গোলার্ধে দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা লাভ করবেন। আমার দুই ছেলে খুব মজা পেল এই অভিজ্ঞতা নিতে গিয়ে। পা পাল্টে পাল্টে তারা মজা নেয় এবং ছবি তুলে স্মৃতিবন্দি করে আনন্দমুহূর্তগুলো। 

এই স্থান ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম উইলিয়ামের সময়কাল থেকে। গ্রিনিচ প্রাসাদ, যেটি বর্তমানে মেরিটাইম জাদুঘর; রাজা অষ্টম হেনরি ও তার কন্যা প্রথম মেরির জন্মস্থান। প্রথম এলিজাবেথ ও ট্যুডররা গ্রিনিচ প্রাসাদ তাদের হান্টিং লজ হিসেবে ব্যবহার  করতেন। গ্রিনিচের এই প্রাসাদ দুর্গটি রাজা অষ্টম হেনরির বিশেষ প্রিয় ছিল। তার উপপত্নীদের আবাসস্থল ছিল এটি। মূল প্রাসাদ থেকে এখানে তিনি সহজেই যাতায়াত করতে পারতেন বলে এটি তার বিশেষ প্রিয় জায়গা ছিল।

১৮৮৪ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে ২৫টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা স্থলে স্থির হয়ে যে লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের ওপর দিয়ে যে দ্রাঘিমা রেখা গেছে সেটাই হবে মূল দ্রাঘিমারেখা মূল মধ্যরেখা। তৎকালীন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বৈশ্বিক প্রভাব ছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ নাবিক এবং মানচিত্র গ্রিনিচকে সময়ের জন্য ব্যবহার করছিল।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নত কেন্দ্র হিসেবে গ্রিনিচের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রিনিচ পরিদর্শনের একটি আকর্ষণীয় উপায় হলো লন্ডনের ক্যাবল কারে চড়া। এটি টেমস নদীর ওপর দিয়ে চলে এবং দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নদী পারাপারের সময় লন্ডনের নানা মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের উপরিভাগ থেকে লন্ডনের স্কাইলাইন অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এখান থেকে ক্যানারি ওয়ার্ফ, লন্ডন আই এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। ভবনটিকে সহসাই ‘ফ্ল্যামস্টিড হাউস’ নামেই ডাকা হতো। বর্তমান সময়ে সায়েন্টিফিক কাজকর্মগুলো অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তাই গ্রিনিচের এই ভবনটি এখন মূলত জাদুঘর হিসেবেই বিবেচ্য হচ্ছে। স্থানটি ভ্রমণপিপাসীদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান বটে। হাজার হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে ও দেখতে আসেন। মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক বিবেচনায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। পর্যটকদের জন্য গ্রিনিচ একটি অনন্য গন্তব্য, যেখানে ঐতিহ্য, বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন ঘটে।

/এস লুপিন

বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম
আপডেট: ০৯ মে ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ
ছবি: সংগৃহীত

সেশেলেস (Seychelles) বিশ্ব ভ্রমণে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আমার ১৫৯তম দেশ। সেশেলস–১১৫টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দেশ। প্রথমে আমি এই দেশের নাম শুনে ভেবেছিলাম, এটা বুঝি কোনো বড় ফ্রেঞ্চ কলোনি। কিন্তু পরে জানতে পারি, এটি ১৯৭৬ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও তার আগে বহু বছর ফরাসিদের শাসনে ছিল। তাই এখানকার প্রধানত ভাষা ফরাসি, পাশাপাশি ইংরেজি ও ক্রেওলও প্রচলিত।

বাংলাদেশ থেকে যখন বের হয়েছিলাম তখনই ইচ্ছা ছিল আলজেরিয়ায় যাব, কিন্তু হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে থাকার সময় ইরান যুদ্ধ বেধে গেল, সেজন্য ইমিরেটস কিংবা কাতার এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করা দুষ্কর হয়ে গেল। 

তখনই মাথায় এল সেশেলেস দেশটি, যা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। যখনই চিন্তা সঙ্গে সঙ্গেই টিকিট কাটব, তারপর হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের বাংলাদেশ থেকে এর আগে কে ভ্রমণ করেছে? ফেসবুক ঘেঁটে দেখলাম, Flyer ট্রাভেল এক্সপ্রেসের সুমন বাহাদুর ভাই বেড়াতে গিয়েছিলেন। তার কাছ ফোন করলেই টিকিট কাটার আগেই তিনি বললেন, ১০ ইউরোতে একটি অন অ্যারাইভাল পারমিট নিতে হয়। 

তারপর আমি অনলাইনে টিকিট কেটে ব্যাংকক থেকে ইন্ডিগোয় চেপে বসলাম এই নতুন দেশের উদ্দেশে। ফ্লাইটে ভাড়া অবশ্য খুব বেশি নয়, আফ্রিকার কোনো দেশে যাওয়ার জন্য। 

তারপর ২৪ মার্চ চলে এলাম এই দেশে। এয়ারপোর্টে নেমেই অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করল। সিকিউরিটির লোকরা হোটেলগুলো একটু যাচাই-বাছাই করে নিল। তারপর সহজেই চলে গেলাম মাহি এয়ারপোর্ট দিয়ে। হোটেল থেকে আগে থেকেই ট্রান্সপোর্ট বলা ছিল ৭৫ ইউরো, যা আমার জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। নীল সমুদ্রের সুন্দর রিসোর্টে চলে গেলাম। থাকা হলো প্রায় ১১ দিন।

এই দেশটি আফ্রিকার অনেক দেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নয়–এটি আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি। এখানকার ট্যুরিজম মন্ত্রণালয় ও লেবার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।

দেশটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য–নীল সমুদ্র, বিশাল পাথরের গঠন, সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সাদা বালুর সৈকত আর সারি সারি পাম গাছ চোখধাঁধিয়ে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কচ্ছপগুলোরও দেখা মেলে এখানে, যা সত্যিই অসাধারণ।

সেশেলসের রাজধানী ভিক্টোরিয়া–বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাজধানীগুলোর একটি। মাহে (Mahé) দ্বীপে এয়ারপোর্টটি অবস্থিত, যদিও এটি আকারে ছোট। আমি যতগুলো আফ্রিকার দেশ ভ্রমণ করেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ধনী বলে মনে হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য যাচাই করেও দেখা যায়, এটি আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে উন্নত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার স্থানীয় এবং বাকিরা প্রবাসী কর্মী।

এখানকার গড় বেতন প্রায় ৬২০ ইউরো, যা ইউরোপের কিছু দেশের সমতুল্য। মজার বিষয় হলো, এখানে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, একটি পুরুষ ও তিনটি নারী এবং তারা আধুনিক, আত্মনির্ভরশীল ও শিক্ষিত। তারা খুবই উদার, আনন্দপ্রিয় ও সহজ-সরল। অনেক সময় মনে হয় না যে আমি আফ্রিকায় আছি—বরং ইউরোপের কোনো দ্বীপে আছি।

এখানকার প্রায় সব পণ্যই আমদানি করা হয়, তাই জীবনযাত্রার খরচ একটু বেশি। যেমন–একটি টমেটোর দামই প্রায় ১৪০ টাকা! শ্রমিকের সংকট থাকায় সবকিছুর দামই তুলনামূলক বেশি। তবু দেশের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা খুব ভালো।

বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে এখানে শ্রমবাজারে ভালো সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর হানিমুনের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি গন্তব্য। অনেকেই মালদ্বীপ ঘুরে ফেলেছেন–তাদের জন্য সেশেলস হতে পারে চমৎকার বিকল্প।

এখানে বেশির ভাগ হোটেলে সেলফ-ক্যাটারিং সুবিধা আছে, অর্থাৎ আপনি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে নিজেই রান্না করতে পারেন। অনেক হোটেলেই হালাল খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা লাগে না–শুধু হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং অনলাইনে আগমনী কার্ড পূরণ করলেই হয়।

তবে বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য এটি সাশ্রয়ী নয়। সেলফ-ক্যাটারিং হোটেলের খরচ প্রতিদিন ১২০ থেকে ২০০ ইউরো (দুজনের জন্য)। আর বিলাসবহুল হোটেলগুলোর দাম ৪৫০ ইউরো থেকে শুরু করে ৪০০০ ইউরোরও বেশি হতে পারে। খাবারে প্রায় ২৫ ইউরো (প্রতি ব্যক্তি) খরচ হয়।

আমি এখানে কয়েকটি দ্বীপে ঘুরেছি–প্রাসলিন আইল্যান্ড ছিল দারুণ সুন্দর। Les Ducs Resort এবং Paradise Sun হোটেলগুলো বেশ ভালো লেগেছে, তুলনামূলক কম খরচে ভালো সেবা দেয়। প্রথমে আমি থেকেছিলাম টাকামাকা বিচে, মাহে দ্বীপে–সেটিও অসাধারণ। বোভালন সৈকত খুবই আকর্ষণীয়, যেখানে বিচ শ্যাক ও বোট হাউস রেস্টুরেন্টে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং সন্ধ্যাটা খুব সুন্দরভাবে কাটানো যায়। এখানে জাতীয় ফল কিংবা জাতীয় প্রতীক কোকো।

যে গাছটি চমৎকার, ছেলে ও মেয়ে দুটি গাছের সমন্বয় এখানে ফল ধারণ করে। মেয়ে গাছটির ফলের গঠন মেয়েদের শরীরের নিম্নাংশের মতো, যা একটি নারী গোপন অংশের মতো দেখতে আর ছেলে গাছটির লিঙ্গটি দেখতে ঠিক পুরুষের লিঙ্গের মতো। এই গাছটির ফল ধরে সবুজ রঙের একটি লেজার আছে, তার মাধ্যমে সে ছেলে গাছটির কাছ থেকে এক ধরনের সাদা পাউডার খেয়ে মেয়ে গাছটির কাছে গিয়ে তার গোপন অংশের চেটে পাউডার ছড়ায়, তারপর সেখানে ফল ধরে। এই গাছটি পৃথিবীতে অনন্য হওয়ায় একে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

এখানে বেশ কিছু ক্যাসিনো রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং পরিবেশও উপভোগ্য–খেলার জন্য নয়, বরং সময় কাটানোর জন্য। তবে অবাক হয়েছি ক্যাসিনোগুলোয় বাংলাদেশি শ্রমিকে ভর্তি, বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার রাতে। তাছাড়া মাছ ধরার বড় বড় ট্যুর রয়েছে, যারা সমুদ্রে বড় মাছ ধরতে চান তাদের জন্য এটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে পারে। সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল ফ্রুট ব্যাট খাওয়া–৪৫ ইউরো দিয়ে খেয়েছিলাম। মাংসের স্বাদটা একটু মিষ্টি, আর রান্নাটাও ছিল চমৎকার। যারা ভিন্নধর্মী খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

এখানে বড় কোনো শপিং মল নেই, তাই শপিংয়ের ঝামেলা ছাড়া নিরিবিলিতে হানিমুন বা পারিবারিক সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ। আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই অসাধারণ যে ছবি তুলতে তুলতে হাতই ব্যথা হয়ে যেতে পারে! সব মিলিয়ে, যারা বাংলাদেশি পাসপোর্টে সহজে ভ্রমণ করতে চান, তাদের জন্য সেশেলস একটি অসাধারণ গন্তব্য হতে পারে। আমার এই দুই সপ্তাহের ভ্রমণ ছিল সত্যিই স্মরণীয়।

/এমটি

প্রশান্তির খোঁজে ক্যামেলিয়া লেক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
প্রশান্তির খোঁজে ক্যামেলিয়া লেক

আমাদের রাহাত ভাইয়ের পঙ্খীরাজে করে এগিয়ে চলছি নতুন গন্তব্য পানে। বাগানের রাস্তা কোথাও পিচঢালা, কোথাও মাটির। চা বাগানের চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। 

তিনি বললেন গেলে পরে দেখবেন। আমরা চলছি নতুন পথে সূর্যদেব গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছেন। কিছু সময় পর আঁকাবাঁকা পথ আমাদের শরীরের কলকব্জা অচল করে দেওয়ার উপক্রম। ও বলাই হলো না আমরা আজ আছি সিলেটের শমসেরনগরে। 

সঙ্গে আছেন সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত আর সিএনজি চালক রাহাত ভাই। যাইহোক অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছালাম অসাধারণ এক লেকের ধারে। দেখে মন জুড়িয়ে গেল। নাম জানতে চাইলে রুহেল ভাই বললেন চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে এই লেকের নাম বিসলার বান। তবে প্রকৃত নাম ক্যামেলিয়া লেক। 

তিনি আরও বললেন, এই জায়গায় আসতে হলে অনেক আগেই নেমে পদব্রজে আসতে হয়। কিন্তু তিনি এই এলাকার লোক তাই এই চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমি মনে মনে ভাবলাম মা আজ ভ্রমণ সঙ্গী থাকলে এই পথ পাড়ি দিতে চাইতেন না। 

তবে এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে যে প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখের সামনে ধরা দেয় তা সব ক্লান্তি দূর করে দেবে যে কারও। চারপাশে যত দূর চোখ যায় ছোট-বড় পাহাড়ি টিলাঢাকা চা বাগান। মাথার ওপরে নীল আকাশ। 

আকাশে আর লেকের পানিতে ঝাঁকবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখি। এরই মধ্যে টলটলে পানির অপরূপ লেক। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি সম্মুখ পানে। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ ছায়া দিচ্ছে। আর ওপরে উদাস আকাশ। পাশেই টিলার মাঝে চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। চা গাছের ছায়া পড়েছে লেকের জলে। 

দেখে মনে হয় লেকের পানির সঙ্গে মিতালি গড়েছে চা গাছগুলো। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখতে পেলাম লেকের পাশে বসার জন্য ছাউনি আছে। 

আমরা গিয়ে কিছু সময় বসলাম। চারপাশে পাখির কলতান আমাদের নিয়ে গিয়েছিল মুগ্ধতার রাজ্যে। আমরা লেকে পা ভেজালাম। 
রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম এই লেকের উৎপত্তিস্থল।

তিনি বললেন, এই বাগানের আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৩২৬ দশমিক ৪৭ একর। আমাদের দেশের চা বাগানগুলোয় সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য বাগানের মধ্যে ছোট-বড় লেক দেখতে পাওয়া যায়। এই লেকগুলো সাধারণত চা বাগানের নিচু জমিতে বা পাহাড়ি টিলার পাদদেশে থাকে। কিন্তু ক্যামেলিয়া লেকের বৈশিষ্ট্য হলো এই লেক বাগানের প্রায় শেষ প্রান্ত টিলার ওপর অংশ জুড়ে। 

ডানকান ব্রাদার্সের মাদার কোম্পানি ক্যামেলিয়া পিএলসির নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়। ক্যামেলিয়া পিএলসি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীজুড়ে তাদের কর্মীর সংখ্যা ৭৩ হাজারের অধিক। আর বাংলাদেশে আছে ১৮ হাজার কর্মী। 
সহধর্মিণী বায়না ধরলেন চা বাগানে ভেতরে গিয়ে ছবি তুলবেন, নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এগিয়ে গেলাম চা বাগানের দিকে। হঠাৎ দেখা পেলাম একদল বানর এই গাছ থেকে অন্য গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সুনছড়া চা বাগান থেকে ক্যামেলিয়া লেকের সৌন্দর্য মুগ্ধতা জাগানিয়া। যদিও চা বাগান কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক এ লেকটিতে কিছুটা কৃত্রিমতা জুড়ে দিয়েছেন। ইট-সিমেন্টের কিছু কৃত্রিম কাজ লেকটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লেকের ওপরে একটি পাটাতন তৈরি করা হয়েছে। 

এখন ‘বিসলার বান’ বা ‘ক্যামেলিয়া লেক’ হয়ে উঠেছে অসাধারণ এক পর্যটন স্পট। লেকটির পাশে রয়েছে একটি ঘর। যেটি স্থানীয় চা শ্রমিকদের কাছে ‘ক্লাব ঘর’ নামে পরিচিত। এ ঘরে বা গাছের ছায়ায় পর্যাপ্ত সময় কাটানো সম্ভব। পাইলট আমাদের দুজনের ছবিও তুলে দিলেন। 

ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে এই জায়গাটি এখনো অজানা, তাই লোকসমাগম নেই বললেই চলে। তাই পরিবেশ তার আপন ধারায় প্রবহমান। এর প্রকৃতির রূপ বিচিত্র যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

কীভাবে যাবেন
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে মৌলভীবাজার যাওয়া যাবে। রেলপথে এলে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে করে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ বা শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে। সব আন্তঃনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও ভানুগাছ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে সব আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। ফলে আগেই জেনে নিতে হবে

কোথায় নামতে হবে 
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নামলে সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। শমসেরনগর পর্যন্ত বাসে যাওয়ার পর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই লেকটিতে পৌঁছানো সম্ভব। যাদের প্রচুর হাঁটার অভ্যাস আছে তারা শমসেরনগর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটেও যেতে পারেন। 

আর ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে আসতে চাইলে মৌলভীবাজারগামী বাসে ওঠে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে একইভাবে লেকটিতে যাওয়া যায়। এছাড়া বিমানে এলে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নেমে বাস বা ট্রেনে আসা যাবে শমসেরনগর।