পৃথিবীজুড়েই মানুষ কম-বেশি এক ধাঁচেই তার নিজের জীবনকে আবদ্ধ করে ফেলেছে। তা সে নিজের ইচ্ছা বা অনিচ্ছাতেই করুক বা বেঁচে থাকার তাগিদেই করে থাকুক না কেন পুনরাবৃত্তির এক ভীষণ আবর্তে আজ ঘূর্ণায়মান বেশির ভাগ মানুষের জীবন। ছুটে চলাই হলো এখন জীবনের মূল মন্ত্র। থামলে কিন্তু চলবে না। আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিষেধ আছে। এর নিজের কোনো সীমানা নেই। অসীমের দিকে তার চোখ। প্রতিদিনের জীবনের বিপরীতে ভ্রমণ এক জাদুময় অবস্থা সৃষ্টি করে, ঠিক জাদুঘরের মতো।
জাদুঘর বা শিল্প প্রদর্শনী যেমনটা আটপৌরে-সাধারণ-সামান্য কোনো ধারণা বা বস্তুকে তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিত থেকে তুলে নিয়ে এসে এক নতুন অবস্থায় পরিবেশন করে। সব শিল্পকর্মই এই কাজটি করে। আটপৌরে-সাধারণ বস্তু তার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্যুত হয়ে আমাদের চোখে নতুন রূপে ধরা দেয়। এমনভাবে ধরা দেয় যে তা দেখে মনে হয় যেন প্রথমবার দেখছি। তখন সেই ধারণা বা বস্তুটিকে তার গতানুগতিক-স্বভাবসিদ্ধ আবরণ ও প্রেক্ষাপটের অনুপস্থিতে দেখার সুযোগ হয়। বেশ কিছুদিন হলো ভ্রমণে বের হইনি, তাই দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তাই হুট করে ঠিক করি রাতের বাসে করে চট্টগ্রাম যাব।
সেখানে থেকে যাব সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাপ্তাই লেকের পাড়ে ছোট ছোট টিলা ঘেরা একটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পেই গড়ে তোলা লেক ভিউ আইল্যান্ড। শুনেছি পাশাপাশি দুটি টিলার চার একরের অধিক এলাকা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে পর্যটন এলাকাটি। নির্ধারিত সময়েই আমাদের বাস ছাড়ল গন্তব্য পানে। সারা দিন অফিসে কাজের খুব চাপে ছিলাম তাই খুব ক্লান্ত। কোন সময় যে গভীর ঘুমে পতিত হয়েছি টের পাইনি। বাসের সুপারভাইজার সাহেবের বিরতির ঘোষণায় ঘুম ভেঙে গেল। অনিচ্ছা সত্ত্বে নিদ্রা ভঙ্গ করে বাস থেকে নেমে ফ্রেশ হলাম। বিরতির পরে বাস ছুটে চলল রাতের আঁধারে। আর আমি আবারও চলে গেলাম নিদ্রা দেবীর আবেশে।
ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৭টা আমরা এসে উপস্থিত হলাম চট্টগ্রাম শহরে। রাতের পরে আর পেটে দানাপানি পড়েনি, তাই ঢুকে পড়লাম মেজবান রেস্টুরেন্টে। গরম গরম পরোটা সঙ্গে সবজি, অসাধারণ স্বাদ। সকালের নাশতা শেষ করে আমরা চলে গেলাম বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল পানে। কাপ্তাই যাওয়ার বাসে উঠার নিমিত্তে। আমরা পাহাড়িকা বাসে চেপে বসলাম। দিনের আলোতে সূর্যদেবের প্রভা গায়ে মেখে আমরা চলছি এগিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাপ্তাই বাঁধের সংরক্ষিত এলাকার সামনে আমরা নেমে পড়লাম।
এরপর সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে আমাদের গন্তব্য পানে এগিয়ে চললাম। মাত্র ১০ মিনিটের মাঝেই আমরা এসে উপস্থিত হলাম প্রবেশদ্বারে। টিকিট কেটে পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও এয়ার কমান্ডারের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে যাত্রা শুরু করে ‘লেক ভিউ আইল্যান্ড’।
রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের জন্য বিনোদনের সেরা স্পট হতে পারে লেক ভিউ আইল্যান্ড। শারীরিক নানা কসরতের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি এখানে আছে হাইকিং, ক্যাম্পফায়ার, জেট স্কুটার, ইডিং রুফ, হ্যাংগিং টায়ার, ঝুলন্ত ব্রিজ, হ্যাংগিং চেইন, স্টিল ওয়্যার বার ও চেইন পাতাটন দোলনা। শিশু ও বড়দের জন্য আছে আলাদা ব্যবস্থা বলছিলেন মামুন ভাই। দুপাশে চিরহরিৎ গাছপালায় বেষ্টিত চোখধাঁধানো সবুজ পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে হ্রদ। চারপাশ জুড়ে শুধু বিমুগ্ধ হওয়ার মতো দৃশ্য! প্রকৃতি কতটা অকৃপণ হাতে তার রূপসুধা ঢেলে দিয়েছে তা দেখতে ও অনুধাবন করে হারিয়ে যেতে কাপ্তাই লেকের তুলনা হয় না। বিস্তীর্ণ জলরাশি, নীল আকাশ আর ছোট ছোট পাহাড়, লেকের মাঝে ছোট ছোট টিলায় বাড়িগুলো মিশে তৈরি করছে শিল্পীর আঁকা যেন একটি ছবি।
এই সৌন্দর্য আপনাকেই মুগ্ধ করবেই প্রকৃতির আপন মহিমায়। চোখের সামনে বিশালাকৃতির কাপ্তাই লেক সৃষ্টির ইতিহাসটা অনেকের মতো আমারও জানা ছিল না। উইকিপিডিয়ার সাহায্যে জানতে পারলাম সেটা। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত এ লেকটি সৃষ্টি হয় ১৯৫৬ সালে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হলে রাঙামাটি জেলার ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে গিয়ে এ হ্রদ সৃষ্টি হয়। এতে মানুষের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ধীরে ধীরে জায়গাটি পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। বর্তমানে লেকের মাঝে থাকা ছোট দ্বীপগুলো লেকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ।
তাই ঘুরতে এলে দর্শনার্থীরা এসব দ্বীপে নেমে কেউ ছবি তোলেন আবার কেউ গোসলও সেরে নেন। লেক ভিউ আইল্যান্ডকে হলুদ ও কমলা নামে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দুই ভাগের জন্য আলাদা টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে। হলুদ এলাকায় রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট, কিডস কর্নার ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা আছে। আর কমলা এলাকায় আছে অ্যাডভেঞ্চারের ব্যবস্থা। লেকের স্বচ্ছ পানির ওপর ভাসছে বোট হাউস ‘নীলকৌড়ি’। বেত ও কাঠের কারুকাজে লোকজ নকশায় তৈরি এ বোট হাউসে রাতে পরিবার নিয়ে থাকার ব্যবস্থা আছে। রাতে নীরব লেকের ভিউ উপভোগ করার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো ব্যবস্থা হয় না। বোটের ছাদে শুয়ে কবি মন জেগে উঠলে অস্বাভাবিক লাগবে না। নীলকৌড়ির ভেতরে আছে দুটি ডাবল বেড ও শীতাতপ ব্যবস্থা। বিকেল ৪টা থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত এ বোটে থাকা যাবে। দেখতে পেলাম লেকের স্বচ্ছ পানির ওপর ভাসছে বোট হাউস নীলকৌড়ি, সাম্পান ও জলকৌড়ি। মামুন ভাই বললেন দাদা আপনি চাইলে ইঞ্জিন বোটে করে লেক ভ্রমণ করতে পারবেন। এ জন্য প্রতি ঘণ্টায় প্রতি পরিবারকে ৫০০ টাকা হারে ভাড়া দিতে হবে। শিশুদের জন্য বিশেষ বিনোদনের ব্যবস্থা আছে লেক ভিউ আইল্যান্ডে।
একটি মিনি পার্ক ছাড়াও হরেক রকমের খেলনা গাড়িতে খেলতে পারবে শিশুরা। নিরাপত্তার জন্য আছে সার্বক্ষণিক সিসি টিভি ব্যবস্থা। যারা সাঁতার জানেন না বা লেকে সাঁতার কাটতে পারবেন না বলে আক্ষেপ আছে, তাদের জন্য একটি মিনি সুইমিংপুল আছে এখানে। এ সুবিধা নিতে হলে জনপ্রতি ঘণ্টায় ১০০ টাকা দিতে হবে। ‘হিল টপ’ রিসোর্টে পুলটি অবস্থিত। আমরা পদব্রজে পুরো রিসোর্ট ঘুরে দেখলাম। এবার ফেরার পালা। বিকেল ও গোধূলিবেলায় আধো আধো আলোয় কাপ্তাই হ্রদের কী যে দৃশ্য! ভুলে যাওয়ার নয়। মাঝপথেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। ফিরে আসার সময় দৃশ্যও মনোরম। পাহাড়গায়ে ঢলে পড়ছে লাল সূর্য। পাখি ও পোকামাকড় নীড়ে ফিরছে। পর্যটকরাও ফিরছে তাদের পরবর্তী গন্তব্য পানে।
কীভাবে যাবেন
লেকভিউ আইল্যান্ড রিসোর্টে আসতে হলে প্রথমে আপনাকে আসতে হবে চট্টগ্রাম শহরে। তারপর যেতে হবে কাপ্তাই। চট্টগ্রাম থেকে ৫৮ কিলোমিটার দূরে কাপ্তাই যেতে হলে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বাসে উঠতে হবে। সময় লাগবে দুই ঘণ্টা থেকে সোয়া দুই ঘণ্টা। সিএনজি অটোরিকশা, নিজস্ব কার, মাইক্রোবাস কিংবা কাপ্তাই লাইনের বাসে যেতে পারেন। কাপ্তাই বাঁধের সংরক্ষিত এলাকার সামনে নামতে হবে। এরপর সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে হিলটপ অবকাশকেন্দ্রে যেতে সময় লাগবে ১০ মিনিট।
/রোদসী

.jpg)