রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে একদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। সেখানে গেলে পদ্মার সৌন্দর্য যেমন আপনাকে মোহিত করবে, তেমনি খেতে পাবেন পদ্মার তাজা ইলিশ। আমরা সাধারণত পরিচিত জায়গা ছাড়া ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। নিরাপত্তার কারণেও আমরা অনেক জায়গায় যেতে চাই না।
যান্ত্রিক নগরী ঢাকার আশপাশে ঘোরার জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেকে ছুটির দিনগুলো ঘুমিয়েই কাটান। অনেকের আবার ঘুরতে যাওয়ার আগে কত কিছু চিন্তা করতে হয়! সময়, পর্যাপ্ত অর্থ এবং ভালো ভ্রমণ সঙ্গী নিয়ে একটা চিন্তা থেকেই যায়।
হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় নেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার, অথচ নিজেকে প্রাণবন্ত করার জন্য একটু নান্দনিক এবং মনোরম পরিবেশের প্রয়োজন। তাই হন্যে হয়ে খুঁজছেন ঢাকার আশপাশেই কোনো মনোরম পরিবেশ।
এমন সবকিছুর সমাধান দিতে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। আমি খুব ঘুমপ্রিয় মানুষ, তাই শুক্রবার এলেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। কয়েক দিন ধরে চিন্টু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছিল ওকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
গত শুক্রবারও ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ার জন্য কোথাও যেতে পারিনি আর সেই ধারাবাহিকতায় আজও দেরি করে উঠেছি ঘুম থেকে। এদিকে চিন্টুর মন খুব খারাপ, আজও যেতে পারল না কোথাও।
আমি মনে মনে ভাবলাম ছোট মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে, তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া উচিত। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকের কল্যাণে মৈনট ঘাটের নাম শুনছিলাম। তাই ভাবলাম দূরত্ব কম যেহেতু তাই বিকেল বেলাতেই চিন্টুকে নিয়ে বের হব। এখন আর কিছু না বলে চিন্টুকে সারপ্রাইজে দেব।
কাল বেলা ব্যাংকের কিছু কাজ ছিল তা শেষ করলাম দুপুর হতেই চিন্টুকে বললাম বিকেল ৩টার মধ্যে রেডি থাকিস। ঠিক বিকেল ৩টায় আমরা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে মৈনট ঘাটের উদ্দেশে বাসে রওনা হলাম।
শুক্রবার তাই যান্ত্রিক শহরের কোলাহল কিছুটা হলেও কম আমাদের ফিটনেসবিহীন বাস এগিয়ে চলছে গন্তব্যস্থলে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম মৈনট ঘাটে। চিন্টু তো মৈনট ঘাটে এসে খুব খুশি দোহারের কার্তিকপুরের যে জায়গাটি পদ্মাপাড়ে গিয়ে মিশেছে তার নাম মৈনট ঘাট। এখানে ডানে-বাঁয়ে বালু চিকচিক করা স্থলভূমি থাকলেও সামনে শুধু রুপার মতো চকচকে পানি।
মৈনট পদ্মাপাড়ের একটি খেয়াঘাট। এখান থেকে প্রতিদিন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। খেয়া পারাপারের জন্য জায়গাটির পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। তবে এখন সেটা জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হিসেবেও।
এত দিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনট ঘাট। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মৈনট ঘাটের নতুন নাম হলো–মিনি কক্সবাজার! বিস্তীর্ণ জলরাশির ঢেউ আর সঙ্গে শরতের নির্মল আকাশ–এ এক অনবদ্য কাব্য। ছুটির দিন তাই অনেক মানুষের পদচারণে মুখর মৈনট ঘাট। জন মানবের পদচারণা দেখে মনে হলো নগরবাসীর কাছে নতুন এক নির্মল বিনোদনের স্থান।
মিনি কক্সবাজারের তীরে আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি। খানিক পরপর মাছ ধরার ট্রলার ছুটে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা দেখে মাছ কেনার জন্য এগোচ্ছেন। দরদাম ঠিক থাকলে অনেক ভ্রমণপিপাসু মাছ কিনে নিচ্ছেন। পুরো নদীর তীর ও তার আশপাশের এলাকা সমুদ্রসৈকতের মতো করে সাজানো। হঠাৎ চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে দেখে খুব খারাপ লাগল, আমরাই আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছি।
পদ্মা এত বিশাল যে, ওপারের কিছুই দেখা যায় না, দেখা যায় না ডান-বাঁয়ের কোনো বসতি। নদীর পারে ট্রলার ও স্পিডবোটের মহাজনদের মেলা। আপনি চাইলে ট্রলারে চেপে ওপারের চরভদ্রাসন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঘণ্টা চুক্তিতে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন।
যা-ই করেন এখানে সময়টা কিন্তু বেশ কাটবে। আমরা ট্রলারে চেপে বসলাম ঘুরে বেড়ালাম প্রমত্ত পদ্মায়। আমাদের ট্রলারের মাঝি রহিম মিয়া বললেন এখানে সকালবেলাটা খুব ভালো কাটে, দুপুর কিছুটা মন্থর, তবে বিকেলবেলা অনেক বেশি জমজমাট।
সোনা রোদের গোধূলিবেলার তো কোনো তুলনাই চলে না। নদীতে পাল তোলা নৌকার ঘুরে বেড়ানো আবার কখন উথাল-পাতাল ঢেউ–এ এক অন্য রকম অনুভূতি। দেখতে দেখতে সূর্য দেবের বিদায়বেলা চলে এল, সূর্য দেবের বিদায়বেলায় প্রকৃতি অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। নদীতে ভ্রমণ শেষে চিন্টু ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার বায়না ধরল। তাই তাকে নিয়ে ঘাটে অবস্থিত একটি হোটেলে গেলাম। সেখানে ইলিশ মাছ ভাজা খেলাম—কী অসাধারণ স্বাদ। এখানে ইলিশ ১৩০ থেকে ১৯০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে আপনাকে।
কীভাবে আসবেন
ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাস।
৯০ টাকা ভাড়া আর দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে।
সচেতনতা
মৈনট ঘাটে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যদি আশপাশে ময়লা দেখতে পান তাহলে নিশ্চয় আপনার ভালো লাগবে না। তাই পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেখানে-সেখানে পানির বোতল, চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটসহ কোনো ময়লা ফেলা যাবে না। আপনি নিজে যেমন ফেলবেন না, তেমনি কাউকে ফেলতে দেখলে তাকে নিরুৎসাহিত করাটাও আপনার দায়িত্ব। আরেকটি কথা সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পদ্মার বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো।
/এমটি

.jpg)