পবিত্র হজ শেষে চিরাচরিত নেশায় ঘুরে বেড়াই নানা দর্শনীয় জায়গায়। ভ্রমণ যেহেতু রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে সেহেতু সুযোগমতো ঘুরতেই হবে। তা ছাড়া ভ্রমণ করাও সুন্নত। আর সেই রাসুল (সা.)-এর দেশে গিয়েই গুটিয়ে থাকব তা কী করে হয়। ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি চলল ঘোরাঘুরি। মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার সময় পথের যে দৃশ্য তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়, তবুও চেষ্টা করছি আধুনিকতার মিশেলে তৈরি প্রশস্ত সড়কে গাড়ি যখন চলে, তখন এমনিতেই অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করেছে মনে। গাড়ি যতই এগিয়ে যায় ততই যেন সৌন্দর্যের ঘোরে নিমজ্জিত হতে থাকি।
সারি সারি পাহাড়মালা, দৃষ্টিনন্দন সব ইমারত, আইল্যান্ডের মাঝে সারিবদ্ধ খেজুর গাছ দেখতে দেখতে একসময় চোখে ধরা দেবে জনমানবহীন ধু-ধু মরুভূমি আর বিরাট আকৃতির নানান রঙের পাহাড়। তপ্ত মরুভূমির বুকে মাথা উঁচু করে থাকা বাবলা গাছগুলো দেখে মনে হবে, এ যেন বিশাল শূন্যতার মাঝে একখণ্ড সবুজ। কোথাও কোনো মানুষের দেখা না পেলেও মরুভূমির জাহাজ নামে খ্যাত শত শত উট আর দুম্বার বিচরণ দেখেছি। সেসব দৃশ্যও ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে অন্যরকম ভালো লাগার স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। মক্কা থেকে মদিনায় বাসে যাত্রা সময় প্রায় ছয় ঘণ্টা।
কিন্তু এই দীর্ঘ সময় যেন খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে। আমাদেরও ফুরাল। বাস এসে থামল মদিনা শহরের বাঙালি পট্টির বাংলাদেশ হজ মিশনের পাশে। এখানকারই এক আবাসিক হোটেলে আমাদের থাকার জায়গা ঠিক রাখা ছিল। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই সোজা আমি ও রুমমেট মন্টু কাকা এবং সৌদি অবস্থানকালীন আমাকে আপন চাচির মতো স্নেহ করা বেগম সামসুন্নাহারসহ চলে যাই হোটেল থেকে অনতি দূরে মসজিদে নববি। নববির প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
এখানে পুরুষ-নারীদের জন্য নামাজের স্থান পৃথক রাখা হয়েছে। চাচিকে নারীদের জায়গায় রেখে আমরা দুজন চলে যাই বাবে জিবরিল গেটের দিকে। এই গেট দিয়েই রাসুল (সা.) নিকট জিবরাইল (আ.) ওহি নিয়ে প্রবেশ করতেন। ভাবতেই অন্যরকম লাগে। আমি এখন সেখানেই দাঁড়িয়ে। আজান পড়ে। মাগরিবের নামাজ আদায় করি। দুনিয়ার বুকে যতগুলো মসজিদ রয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বের দিক থেকে মসজিদে নববির স্থান তৃতীয়। আর বরকতের দিক থেকে মসজিদুল হারামের পরেই মসজিদে নববির স্থান। এই মসজিদে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে মুসলিম বিশ্বাস মতে তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যায়। এরকম একটা মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারাটা ভ্রমণ জিন্দেগিতে এক অবিস্মরণীয় ব্যাপার।
মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) মসজিদে নববিকে ‘আমার মসজিদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হুজুর (সা.) বলেছেন নববির পরিধি যদি সাফা পর্যন্তও হয় তবুও তা আমার মসজিদ হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহু আকবার, মসজিদটি যে কতটা বরকতময় তা রাসুল (সা.)-এর কথা থেকে স্পষ্ট। এর নির্মাণের সময় তিনি নিজে সাহাবিদের সঙ্গে কাজ করেছেন। মদিনা হিজরতের পর হুজুর (সা.) সর্ব প্রথম ইসলামের কর্মকেন্দ্র হিসেবে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজন বোধ করেন। তখন তিনি হজরত আবু আনসারির বাড়ির সামনের এই খালি জায়গাটি পছন্দ করেন। জায়গার মালিক ছিল অল্প বয়সের এতিম দুই ভাই।
তাদের কাছে জমিটি হুজুর (সা.) কেনার ইচ্ছে ব্যক্ত করলেন কিন্তু তারা বিনামূল্যেই দিতে চাইলেন। হুজুর (সা.) দুই ভাইয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বিনামূল্যে না নিয়ে তৎকালীন বাজারমূল্য দশ দিনার দিয়ে কেনেন। মসজিদে নববির প্রথম ভিত্তিও স্থাপন করেন আখেরি নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)। নির্মাণকালীন এর দরজা ছিল মোট তিনটি। যা এই সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে প্রধান ফটক ৪১টিসহ মোট ৮৩টি। আজকের আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দন মসজিদে নববি- মদিনার কেন্দ্র স্থলে অবস্থিত। প্রথম হিজরি ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণকাল। বর্তমানে ছয় লাখ মুসল্লি ধারণক্ষমতা, তবে হজ মৌসুমে ১০ লাখ পর্যন্ত নামাজ আদায় করতে পারা- মসজিদে নববির বর্তমান মিনার রয়েছে ১০টি। নজরকাড়া প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ৩৪৪ ফুট।
এর ভেতরের দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য ও আলোকসজ্জা চোখধাধিয়ে যায়। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে সমগ্র আরব উপদ্বীপের মধ্যে এখানেই সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। নববির পুরোনো অভিজ্ঞ বাঙালি খাদেম খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল প্রতিদিন ফজরের পর বিশাল আকৃতির ২৭টি গম্বুজ বৈদ্যুতিক সাহায্যে সরে যাওয়ার পর সরাসরি বাইরের আলো মসজিদের মেঝে পর্যন্ত পড়ে। আমি নিজেও একদিন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে অবাক হয়েছি। নববির ভিতরেই রয়েছে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) রওজা শরিফ। তার পাশেই হজরত আবুবকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.) কবর মোবারক। মসজিদে নববির মিম্বার থেকে রওজা পর্যন্ত স্থানটিকে বলা হয় রিয়াদুল জান্নাত বা জান্নাতের বাগান। এখানে ইবাদতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রয়েছে জান্নাতুল বাকি নামক কবর স্থান। হজরত ওসমান (রা.) ও ফাতিমা (রা.)-সহ ১০ হাজার সাহাবির কবর রয়েছে। জান্নাতুল বাকিতে সর্বপ্রথম হজরত আসাদ বিন জারারা (রা.)-কে সমাধি করা হয়। মসজিদে নববির ৫ ও ৮ নম্বর গেটের সামনে রয়েছে কোরআন এক্সিবিশন সেন্টার ও রাসুল (সা.) জীবনীর এক্সিবিশন সেন্টার। সেখানে রক্ষিত রয়েছে হাতে লেখা এ যাবৎ পাওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোরআন শরিফসহ হাজার বছর আগের বিভিন্ন সাইজের হস্ত লিখা কোরআন শরিফ। আরও রয়েছে কাবা ঘরের পূর্ব অবস্থা, মসজিদে নববির প্রথম আকৃতির প্রতিকৃতি।
দেয়ালে লাগানো রাসুল (সা.) শিশুকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনীসহ নানা নিদর্শন। ইংরেজি ও আরবিতে লিখা রাসুল (সা.) জীবনী ধৈর্য সহকারে পড়লে হাজি ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বেশ শিক্ষণীয় হয়ে রবে। মসজিদে নববির ২১ ও ২২ নম্বর গেটের কিছুটা সামনে রয়েছে সুদৃশ্য একটি ঘড়ি। যা আগন্তুকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। তার পাশেই রয়েছে শত শত জালালি কবুতরের অবাধ বিচরণ। যা আপনাকে তপ্ত গরমেও জালালির উড়াউড়ি চোখে-মুখে প্রশান্তি এনে দেবে। এবার বিদায় ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম মসজিদে নববি থেকে, যেখান থেকে সারা দুনিয়ার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা শাসন করা হতো ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। তাহলে বন্ধুরা আজ এই পর্যন্তই, ইনশাআল্লাহ পরবর্তী কোনো সংখ্যায় মদিনা ভ্রমণের আরও গল্প নিয়ে হাজির হব।
যোগাযোগ: হজ ও ওমরাহ ভিসায় যাওয়ার জন্য মতিঝিল ও পুরানা পল্টনসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকা প্রথম শ্রেণির ট্রাভেলসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। তারাই সব ব্যবস্থা করে দেবে।
খরচ: হজ ভিসা ৩ থেকে ৫ লাখ ও ওমরাহ ভিসা ১ থেকে ২ লাখ টাকা মাত্র। শিগগিরই সৌদি সরকার ভ্রমণ ভিসাও চালু করতে যাচ্ছে।
/রোদসী

.jpg)