ঘুম ভেঙেছে সেই কখন, এরপরও ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করছে না। শুক্রবার বলে আরও উঠতে মন চাচ্ছে না। এদিকে হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই ওপর পাশ থেকে তানভীর ভাইয়ের গলার ভেসে এল। সুমন্ত আর কত ঘুমাবে উঠে তৈরি হয়ে নাও। আমি ঝটপট ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। হাতের কাজ শেষ করে নিলাম দ্রুত। ঘড়ির কাঁটাতে সকাল ৮টা বাজতেই তানভীর ভাইয়ের ফোন, নিচে নেমে পড়ো আমি তোমার বাসার নিচে আছি।
আগে থেকে গাড়ির পাইলটকে বলে রেখেছিলাম সেও সঠিক সময়ে উপস্থিত। আমরা বেরিয়ে পড়লাম নতুন গন্তব্যের পানে। শুক্রবার বলে রাস্তায় তেমন একটা যানজট ছিল না। তবে সূর্যদেবের উজ্জ্বল হাসিরও দেখা নেই। তার মাঝেই আমরা এগিয়ে চলছি। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। ও বলাই হলো না আমরা সিলেট শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে সালুটিকরের ছালিয়া গ্রামে অবস্থিত পাখি বাড়িতে যাচ্ছি।
শহরের আবহাওয়া ছেড়ে লাক্কাতুরা চা বাগানের দিকে ঢুকতেই বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করলাম। এয়ারপোর্ট পেরিয়ে যেই ধুপাগুলের দিকে প্রবেশ করেছি, সেখানে পৌঁছে মনে হলো—আগে এই জায়গায় আসতে ভয় হতো ভাঙা রাস্তার জন্য। কিন্তু এখন রাস্তা অনেক ভালো হয়েছে। আমরা সালুটিকর এলাকায় এসে পৌঁছালাম। এরপর তানভীর ভাই বললেন, পাখি বাগানের ব্যাপারে কোনো লোককে জিজ্ঞেস করতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ, একজন দেখিয়ে দিলেন পাখি বাগানের পথ।
আমরা উপস্থিত হলাম পাখি বাগানের সামনে। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলাম পাখি বাগানের ভেতর। দেখা পেলাম হরেক রকমের পাখির। পাখির ডাকে চারপাশ মুখরিত। আমাদের মতো অনেকেই এখানে ঘুরতে এসেছে। এখানকার স্থানীয় রহিম মিয়ার সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন বাজারে গেলেই পাখি কিনতেন। কখনো এক জোড়া, কখনো চার-পাঁচ জোড়া। বাড়িতে এনে সেগুলোকে ছেড়ে দিতেন। বলতেন, ‘পাখির জায়গা খাঁচায় না, আকাশে।’
কিছু পাখি তার তিন একর বাড়ির গাছগাছালিতে থেকে যেত। তাদের দেখাদেখি আরও পাখি আসতে থাকে। বাড়ি থেকে পাখিদের জন্য খাবারও দেওয়া হয়। কেউ সে বাড়িতে পাখি শিকার করতে আসে না এবং বাড়ির কেউই পাখিও শিকার করে না। তাদের ধারণা, কেউ এ পাখি শিকার করলে বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। নুরুদ্দিন সাহেব বর্তমানে বেঁচে নেই। কিন্তু তার অমর হয়ে যাওয়ার অনেক কাজ তিনি করে গেছেন। বাড়িকে বানিয়ে গেছেন পাখিদের নিরাপদ অভয়াশ্রম।
নুরুদ্দিন সাহেবের ছেলে বাড়ির দেখভাল করেন। আমি মনে মনে নুরুদ্দিন সাহেবের ছেলেকে খুঁজছিলাম কিন্তু ভাগ্য খারাপ তিনি বিশেষ কাজে ঢাকায় গেছেন। আমরা পুরো বাড়ি ঘুরে দেখতে লাগলাম। একেকটি গাছে প্রায় ২০-২৫টি পাখি নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে বাসা। কোনো বাসাতে দেখা মিলছে নীল ও সাদা রঙের ডিম। কোনো বাসাতে ছোট-বড় আকারের ফুটফুটে বাচ্চা। মায়াবী সন্তানের মুখে সরু ঠোঁটের আদর মাখা খাবার তুলে দিচ্ছে পাখিরা। সবাই নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে সবই দেশীয় প্রজাতির পাখি।
আকাশের মন ভালো নেই, তাই ছবি তুলতেও বেশ কষ্ট হচ্ছিল। সবুজ পাতা ও বাঁশঝাড়ের ফাঁকে খড়কুটো দিয়ে আপন মনে ঘর সাজিয়ে বসবাস করছে বক, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন জাতের ডানামেলা পাখির দল। রহিম মিয়া বলছিলেন, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গেই দলবদ্ধ হয়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে পাখিরা। সূর্যাস্তের আগেই বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে নীড়ে ফিরে আসে তারা।
লতাপাতা আর খড়কুটো দিয়ে গাছের মগডালে তৈরি করা অস্থায়ী বাসায় বংশবিস্তারে বৈশাখ থেকে শুরু করে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বসবাস থাকে। নিজেদের মতো করে বোনা বাসায় ডিম পাড়া, বাচ্চাদের যত্নসহকারে লালন করার কাজগুলো অভয়ে নিজের মতো করে যাচ্ছে তারা। পালাবদল করে ডিমে তা দেওয়া ও বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো কাজ সাধারণভাবে মানিয়ে বসবাস করছে পাখিগুলো। তাই নানা বর্ণের পাখির কলকাকলিতে মুখরিত বাড়িটিতে প্রতিদিন পাখিপ্রেমী মানুষের ভিড় লেগেই থাকে।
যাত্রাপথের ঠিকানা: সিলেট শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ছালিয়া গ্রামে এই পাখি বাড়ির অবস্থান। সিলেটের আম্বরখানা ইস্টার্ন প্লাজার সামনে থেকে সিএনজি অটোরিকশা করে সে বাড়িতে যাওয়া যায়। রাস্তার ডানদিকে আলিশান একটি বাড়ি যা পাখি বাড়ি নামেই পরিচিত। সালুটিকর পাগলা বাজারের কিলোমিটার খানেক আগেই এই বাড়িটি পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা।
/রোদসী

.jpg)