আমাদের রাহাত ভাইয়ের পঙ্খীরাজে করে এগিয়ে চলছি নতুন গন্তব্য পানে। বাগানের রাস্তা কোথাও পিচঢালা, কোথাও মাটির। চা বাগানের চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের।
তিনি বললেন গেলে পরে দেখবেন। আমরা চলছি নতুন পথে সূর্যদেব গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছেন। কিছু সময় পর আঁকাবাঁকা পথ আমাদের শরীরের কলকব্জা অচল করে দেওয়ার উপক্রম। ও বলাই হলো না আমরা আজ আছি সিলেটের শমসেরনগরে।
সঙ্গে আছেন সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত আর সিএনজি চালক রাহাত ভাই। যাইহোক অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছালাম অসাধারণ এক লেকের ধারে। দেখে মন জুড়িয়ে গেল। নাম জানতে চাইলে রুহেল ভাই বললেন চা বাগানের শ্রমিকদের কাছে এই লেকের নাম বিসলার বান। তবে প্রকৃত নাম ক্যামেলিয়া লেক।
তিনি আরও বললেন, এই জায়গায় আসতে হলে অনেক আগেই নেমে পদব্রজে আসতে হয়। কিন্তু তিনি এই এলাকার লোক তাই এই চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমি মনে মনে ভাবলাম মা আজ ভ্রমণ সঙ্গী থাকলে এই পথ পাড়ি দিতে চাইতেন না।
তবে এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে যে প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখের সামনে ধরা দেয় তা সব ক্লান্তি দূর করে দেবে যে কারও। চারপাশে যত দূর চোখ যায় ছোট-বড় পাহাড়ি টিলাঢাকা চা বাগান। মাথার ওপরে নীল আকাশ।
আকাশে আর লেকের পানিতে ঝাঁকবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখি। এরই মধ্যে টলটলে পানির অপরূপ লেক। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চলছি সম্মুখ পানে। চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ ছায়া দিচ্ছে। আর ওপরে উদাস আকাশ। পাশেই টিলার মাঝে চা গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। চা গাছের ছায়া পড়েছে লেকের জলে।
দেখে মনে হয় লেকের পানির সঙ্গে মিতালি গড়েছে চা গাছগুলো। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখতে পেলাম লেকের পাশে বসার জন্য ছাউনি আছে।
আমরা গিয়ে কিছু সময় বসলাম। চারপাশে পাখির কলতান আমাদের নিয়ে গিয়েছিল মুগ্ধতার রাজ্যে। আমরা লেকে পা ভেজালাম।
রাহাত ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম এই লেকের উৎপত্তিস্থল।
তিনি বললেন, এই বাগানের আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৩২৬ দশমিক ৪৭ একর। আমাদের দেশের চা বাগানগুলোয় সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য বাগানের মধ্যে ছোট-বড় লেক দেখতে পাওয়া যায়। এই লেকগুলো সাধারণত চা বাগানের নিচু জমিতে বা পাহাড়ি টিলার পাদদেশে থাকে। কিন্তু ক্যামেলিয়া লেকের বৈশিষ্ট্য হলো এই লেক বাগানের প্রায় শেষ প্রান্ত টিলার ওপর অংশ জুড়ে।
ডানকান ব্রাদার্সের মাদার কোম্পানি ক্যামেলিয়া পিএলসির নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়। ক্যামেলিয়া পিএলসি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীজুড়ে তাদের কর্মীর সংখ্যা ৭৩ হাজারের অধিক। আর বাংলাদেশে আছে ১৮ হাজার কর্মী।
সহধর্মিণী বায়না ধরলেন চা বাগানে ভেতরে গিয়ে ছবি তুলবেন, নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এগিয়ে গেলাম চা বাগানের দিকে। হঠাৎ দেখা পেলাম একদল বানর এই গাছ থেকে অন্য গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সুনছড়া চা বাগান থেকে ক্যামেলিয়া লেকের সৌন্দর্য মুগ্ধতা জাগানিয়া। যদিও চা বাগান কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক এ লেকটিতে কিছুটা কৃত্রিমতা জুড়ে দিয়েছেন। ইট-সিমেন্টের কিছু কৃত্রিম কাজ লেকটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লেকের ওপরে একটি পাটাতন তৈরি করা হয়েছে।
এখন ‘বিসলার বান’ বা ‘ক্যামেলিয়া লেক’ হয়ে উঠেছে অসাধারণ এক পর্যটন স্পট। লেকটির পাশে রয়েছে একটি ঘর। যেটি স্থানীয় চা শ্রমিকদের কাছে ‘ক্লাব ঘর’ নামে পরিচিত। এ ঘরে বা গাছের ছায়ায় পর্যাপ্ত সময় কাটানো সম্ভব। পাইলট আমাদের দুজনের ছবিও তুলে দিলেন।
ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে এই জায়গাটি এখনো অজানা, তাই লোকসমাগম নেই বললেই চলে। তাই পরিবেশ তার আপন ধারায় প্রবহমান। এর প্রকৃতির রূপ বিচিত্র যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
কীভাবে যাবেন
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে মৌলভীবাজার যাওয়া যাবে। রেলপথে এলে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে করে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ বা শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে। সব আন্তঃনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও ভানুগাছ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে সব আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। ফলে আগেই জেনে নিতে হবে
কোথায় নামতে হবে
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নামলে সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। শমসেরনগর পর্যন্ত বাসে যাওয়ার পর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই লেকটিতে পৌঁছানো সম্ভব। যাদের প্রচুর হাঁটার অভ্যাস আছে তারা শমসেরনগর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটেও যেতে পারেন।
আর ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে আসতে চাইলে মৌলভীবাজারগামী বাসে ওঠে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে একইভাবে লেকটিতে যাওয়া যায়। এছাড়া বিমানে এলে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নেমে বাস বা ট্রেনে আসা যাবে শমসেরনগর।

.jpg)