ব্যস্ত নগরজীবনে রুটিনমাফিক কাজকর্মের চাপে যখন পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি, ঠিক তখনই ভাবলাম ঢাকার আশপাশের কোনো দর্শনীয় স্থান ঘুরে আসতে পারি। এতে করে একঘেয়েমি দূর হওয়ার পাশাপাশি ইতিহাস-ঐতিহ্যের সান্নিধ্য পাব খুব কাছ থেকে। ঢাকার কাছাকাছি পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জায়গার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর।
সহধর্মিণী সানন্দাকে বললাম, চলো ঘুরে আসি সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর থেকে। ভ্রমণসঙ্গীও এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। আমারা দুজনই চাকরিজীবী, তাই ভরসা শুক্রবার। ওই দিন সকালবেলা বের হয়ে পড়লাম গন্তব্যপথে। বিভিন্ন পথেই যাওয়া যায় সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর। আমরা চার চাকার গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম গন্তব্যপথে। আমি, সানন্দার সঙ্গে যুক্ত হলো অনিক ভ্রমণ গন্তব্যের পথে। গুলিস্তান থেকে ফ্লাইওভার দিয়ে কাঁচপুর ব্রিজ পাড় হয়ে চলে গেলাম সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১১টা বাজি বাজি। টিকিট কাউন্টার থেকে জনপ্রতি ৩০ টাকা করে টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম লোকশিল্প জাদুঘরে। সূর্যদেবের প্রখরতা বেশ মানবকুলের ওপর পড়েছে, সবাই কমবেশি ক্লান্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি না দেওয়ার পরও। আবহমান গ্রামবাংলার লোক-সাংস্কৃতিক ধারাকে বিকশিত করার উদ্যোগে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ১২ মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক পানাম নগরীর একটি পুরোনো বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন।
পরে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ১৫০ বিঘা আয়তনের কমপ্লেক্সে খোলা আকাশের নিচে বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশে গ্রামীণ রূপকেন্দ্রিক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের পরিচয় তুলে ধরতে শিল্পী জয়নুল আবেদিন এ জাদুঘর উন্মুক্ত পরিবেশে গড়ে তোলার প্রয়াস নেন এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কমপ্লেক্সটি প্রায় ১০০ বছর পুরাতন সর্দার বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। আমরা পদব্রজে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
প্রথমেই দেখা পেলাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত তৈল চিত্রের আদলে সংগ্রাম ভাস্কর্যের মডেল। একটু সামনে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পিতলের আবক্ষ ভাস্কর্য। আমরা প্রবেশ করলাম জাদুঘরে।
সর্দার বাড়িতে মোট ১০টি গ্যালারি রয়েছে। গ্যালারিগুলোতে কাঠ খোদাই, কারুশিল্প, পটচিত্র ও মুখোশ, আদিবাসী জীবনভিত্তিক নিদর্শন, গ্রামীণ লোকজীবনের পরিবেশ, লোকজ বাদ্যযন্ত্র ও পোড়ামাটির নিদর্শন, তামা-কাসা-পিতলের নিদর্শন, লোহার তৈরি নিদর্শন, লোকজ অলংকারসহ রয়েছে বহু কিছু। ভবনটির সামান্য পুবে রয়েছে লোকজ স্থাপত্যকলায় সমৃদ্ধ আধুনিক এক ইমারতে প্রতিষ্ঠিত জয়নুল আবেদীন স্মৃতি জাদুঘর। এ ভবনটিতে মাত্র দুটি গ্যালারি।
এ দুটি গ্যালারির মধ্যে একটি গ্যালারি কাঠের তৈরি, যা প্রাচীন ও আধুনিককালের নিদর্শনসমৃদ্ধ। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রাকৃতিক, বৈশিষ্ট্য কাঠ এবং কাঠ থেকে বিভিন্ন কারুপণ্য তৈরি এবং সর্বশেষ বিক্রির সামগ্রিক প্রক্রিয়া, অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে সুন্দর মডেল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমরা গ্যালারি ঘুরে এগিয়ে গেলাম কারুমঞ্চ পানে। পথে দেখতে পেলাম শেখ রাসেলের ভাস্কর্য।
আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম দেখতে পেলাম গ্রাম বাংলার মেলার আদলে নাগর দোলা আর চরকার। পুরো এলাকাজুড়ে জলরাশিপূর্ণ সুবিশাল লেক এ নৌকার ঘাট বৈচিত্র্যময় নৌকার সঙ্গে সঙ্গে বাঘ, হরিণ, বকের রেপ্লিকা আমাদের মুগ্ধ করল। আমরা নৌকা করে কিছু সময় লেকের জলে ভেসে বেড়ালাম।
এরপর আমরা গেলাম কারুপল্লীতে, এখানে বৈচিত্র্যময় দোচালা, চৌচালা ও উপজাতীয়দের আদলে তৈরি ঘরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অজানা, অচেনা, আর্থিকভাবে অবহেলিত অথচ দক্ষ কারুশিল্পী তাদের হাতের তৈরি বাঁশ-বেত, কাঠ খোদাই, মাটি, জামদানি, নকশিকাঁথা, একতারা, পাট, শঙ্খ, মৃৎশিল্প, ঝিনুকের সামগ্রী ইত্যাদি কারুপণ্যের প্রদর্শনী করছেন গ্রামবাংলার শিল্পীরা।
এখান থেকে আপনার পছন্দের পণ্যটি কিনতে পারবেন। তাছাড়া জাদুঘর প্রাঙ্গণে আমগাছ, লেচু গাছসহ নানা ধরনের ফলজ ও বনজ গাছ জাদুঘরের সৌন্দর্য ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। দেখতে দেখতে কীভাবে যে তিনটি ঘণ্টা পার করে দিলাম জাদুঘরে তার টেরই পেলাম না।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার গুলিস্তান থেকে স্বদেশ পরিবহনে উঠে নামবেন মোরগাপাড়া চৌরাস্তা, ভাড়া ৪০ টাকা। সময় লাগতে পারে ১ ঘণ্টা, তবে শুক্রবার ছাড়া অন্যদিন হলে ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা হাতে নিয়ে বেরোতে হবে। মোরগাপাড়া চৌরাস্তায় নেমে দেখবেন অটো দাঁড়ানো আছে। শেয়ারে জাদুঘর যাবে ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা।
অথবা গুলিস্তান থেকে চিটাগাং রোডের বাসে করে চিটাগাং রোড যাবেন। সেখান থেকে সিএনজিতে করে যেতে পারেন, সর্বোচ্চ ১২০ টাকা ভাড়া। আবার বাসে করেও যেতে পারেন। বাসে গেলে নামতে হবে পানাম নগর বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে রিকশায় সোনারগাঁ জাদুঘর। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৩০ টাকা। প্রতি বুধ এবং বৃহস্পতিবার জাদুঘর বন্ধ থাকে।
/এমটি

.jpg)