জলবায়ুর ক্ষতি করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ে এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে বলেও রায় দিয়েছেন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)।
এছাড়া, যেসব দেশ তাপ নির্গমনের মাধ্যমে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণ হয়েছে, সেসব দেশেড় সরকারকে অন্যান্য জাতি্কে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য আইনত দায়ী করা হবে।
ডুবন্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর দায়ের করা একটি যুগান্তকারী মামলায়, আইসিজে-র ১৫ জন বিচারক সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, জলবায়ু রক্ষা করা এখন থেকে সব দেশের সরকারের আইনি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব লঙ্ঘন করলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।
লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের জলবায়ু মামলা বিশেষজ্ঞ জোয়ানা সেটজার বলেন, ‘প্রথমবারের মতো, বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, রাষ্ট্রগুলোর কেবল জলবায়ু ক্ষতি রোধ করাই নয় - বরং এটি সম্পূর্ণরূপে মেরামত করাও আইনি দায়িত্ব।’
বুধবার (২৩ জুলাই) এক ঐতিহাসিক রায়ে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিজে এই রায়ে বলা হয়, অতীতের কার্বন নিঃসরণসহ জলবায়ু-সংকটে দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিচারযোগ্য হলেও কোন দেশ কতটা দায়ী, তা নিরূপণ করা কঠিন।
এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আদালতের রায়টি বাধ্যতামূলক না হলেও আইনি বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, বৈশ্বিক পরিবেশনীতিতে এই রায়ের ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।এটিকে জলবায়ু ঝুঁকির সম্মুখীন ছোট দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় জয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এরকম কিছু দেশ দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক জলবায়ু পদক্ষেপের কোনো অগ্রগতি না দেখে হতাশ ছিল।
নজিরবিহীন এই মামলার নেপথ্যে ছিলেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিম্নভূমির দ্বীপাঞ্চলের একদল তরুণ আইন শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালে তারা এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। রায়ের পর ভানুয়াতুর অধিবাসী ফ্লোরা ভানো জানান, আজ রাতে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব। আমাদের যন্ত্রণা, আমাদের টিকে থাকার লড়াই এবং ভবিষ্যতের অধিকার আইসিজে স্বীকার করেছে।
জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও পরিবেশ আইনজীবীরা আশা করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে যেসব দেশ অতীতে ব্যাপক হারে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়েছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ সুগম হবে।
এদিকে শুনানিতে যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ এই মামলার বিরোধিতা করে বলেছে, জলবায়ু নিয়ে বিদ্যমান চুক্তি (২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি) যথেষ্ট। কিন্তু আদালত তাদের এই যুক্তি খারিজ করে দেন।
বিচারপতি ইওয়াসাওয়া ইউজি বলেন, যদি কোনো দেশ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা না করে, তবে তা প্যারিস চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এমন দেশগুলোও পরিবেশ রক্ষা করতে বাধ্য, যারা প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বা ভবিষ্যতে তা থেকে সরে যেতে চায়।
আদালতের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে। যদি কোনো অঞ্চল পুনরুদ্ধার সম্ভব না হয় তাহলে সেই দেশের সরকার ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে।
তবে কোনও ক্ষতির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনই যে দায়ী তা যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে। যদিও এখনই নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়—একটি দেশকে ঠিক কত ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। তবে আগে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ১ দশমিক ৬ কোটি ডলার।
রায়ের বিষয়ে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল লর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জোয়ি চৌধুরী জানান, আজকের এই রায় একটি যুগান্তকারী আইনগত মুহূর্ত। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
আইসিজে হচ্ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালত, যার সিদ্ধান্ত অনেক সময় জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের সরকারগুলোও বাস্তবায়ন করে থাকে। আইনজীবীরা মনে করছেন, এই রায়ের প্রয়োগ খুব শিগগির শুরু হতে পারে।
সুলতানা দিনা/